কিন্তু এসব কি আমি ভাবছি? আমি হোটেলের রিসেপশনিস্ট। আমার, এখন অনেক কাজ আছে। ক্লান্ত নর্তকী যখন কিছুক্ষণের বিশ্রামের জন্য জনচক্ষুর অন্তরালে গিয়েছেন, তখন আবার বিশ্রামের সময় নয়। তখন দাঁড়িয়ে চিন্তা করবার জন্যে হোটেল আমাকে মাইনে দিয়ে রাখেনি। এখনই আমার মাইকের সামনে গিয়ে দাঁড়ানো উচিত। বিনয়ে বিগলিত হয়ে উপস্থিত ভদ্রমহোদয় এবং ভদ্রমহিলাদের জানানো উচিত, কনি দি উয়োম্যান এখনই আসবেন। মাত্র কিছুক্ষণ আপনারা ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করুন। আমাদের বেয়ারাদের হুকুম দিয়ে মদিরা আনুন। তারপর আবার সে আসছে।
এখানেই শেষ নয়। আরও আছে। শাজাহান হোটেলের ক্যাবারে অ্যানাউন্সার, আমার আরও কাজ আছে। সেই কাজ এখন আমাকে ধীর মস্তিষ্কে, সার্কাস পার্টির ক্লাউনদের মতো নিপুণভাবে করতে হবে। সেই সব কাজ কেমনভাবে আমি করতে পারি, তার উপরই আমার চাকরির ভবিষ্যৎ। তার উপর নির্ভর করবে, শাজাহান হোটেলের বিনামূল্যে বিতরিত অন্ন আমার টেবিলে কতদিন এসে হাজির হবে।
মাইকে প্রয়োজনীয় ঘোষণা করে আমি স্টেজ থেকে ফ্লোরে নেমে এলাম। এবার অতিথিদের সুখস্বাচ্ছন্দ্যের তদারক।
একটা পরিচিত কণ্ঠস্বর আমাকে ডাকলেন, হ্যালো, স্যর, একটু শুনুন। ফোকলা চ্যাটার্জির টেবিলের কাছে এগিয়ে গেলাম। তিনি বললেন, না-হয় সামনের টেবিলে বসিনি। তাই বলে একটু আমাদের কমফর্টের দিকে নজর দেবেন না!
আমি বললাম, সে কী! আপনাদের হুকুম তামিল করবার জন্যেই তো আমরা রয়েছি।
ফোকলা বললেন, দেখুন না, ভাগনেকে নিয়ে কী বিপদে পড়েছি। শুধু বলছে, ফিরে চলল, ফিরে চলো।
মাস্টার পাকড়াশীর দিকে তাকালাম। বেচারার চোখে ঘুম জড়ো হয়ে রয়েছে। মিস্টার চ্যাটার্জি বললেন, ভাগনেটাকে হাতেখড়ি দিতে নিয়ে এলাম, একটু আদর-আপ্যায়ন করুন-না-হলে শাজাহান হোটেল সম্বন্ধে ওর খারাপ ওপিনিয়ন হয়ে যাবে।
আমি জুনিয়র পাকড়াশীকে নমস্কার করে বললাম, আপনার কোনো অসুবিধে হচ্ছে না তো? আপনার মামার সঙ্গে আমাদের অনেক দিনের সম্পর্ক, নিজের মনে করে শাজাহান হোটেলকে ব্যবহার করবেন।
মামা এবার ভাগনেকে বললেন, হ্যাঁ ব্রাদার, স্পোর্টিং স্পিরিটে লাইফ এনজয় করবে। কতক্ষণের জন্যেই আর আমরা এই পৃথিবীতে ব্যাটিং করতে এসেছি। যতক্ষণ ক্রিজে থাকবে, উইকেটের চারদিকে পিটিয়ে খেলে যাও।
শ্রীমান পাকড়াশী ক্রিকেটের উপমায় একটু হেসে ফেললে। মামা বললেন, তোমার বাবার সমালোচনা করা উচিত নয়। কিন্তু ওঁর নজর শুধু বিজনেসের দিকে। উইকেটের চারদিকে পিটিয়ে খেলবার চেষ্টা করলেন না। শূন্য গেলাসের দিকে নজর দিয়ে মামা এবার বললেন, গেলাসে যে কিছুই নেই। তাই বলি, কথাবার্তায় ফ্লো আসছে না কেন। পেট্রল ট্যাঙ্ক খালি থাকলে গাড়ি চলবে কী করে? কিছু একটা কুইকলি সাজেস্ট করুন।
আদি অকৃত্রিম হুইস্কি। ওর মতো জিনিস নেই। আমি বললাম।
ফোকলা চ্যাটার্জি সন্তুষ্ট হলেন না। রুললেন, মশাই, প্লেন অ্যান্ড সিম হুইস্কি তো সেই অ-আ-ক-খ পড়বার সময় থেকে চালিয়ে আসছি। স্পেশাল ককটেল কিছু সাজেস্ট করুন।
বললাম, পিঙ্ক লেডি।
জিনের সঙ্গে ডিমের সাদাটা মিশিয়ে যা তৈরি হয় তো? না মশাই, ওটা আমার মোটেই ভালো লাগে না।
তা হলে হোয়াইট লেডি।
জিন আর লাইমের ভদ্র নাম। না মশাই। আপনার ইমাজিনেশন এমন পুওর হয়ে যাচ্ছে কেন? জিন ছাড়া কিছুই ভাবতে পারছেন না। আমাদের বন্ধু স্যাটা বোসকে ডাকুন।
সত্যসুন্দরদা আমার ইঙ্গিতে দ্রুতবেগে এগিয়ে এলেন। ফোকলা চ্যাটার্জি হাসতে হাসতে বললেন, যেমন আমার ভাগনে তেমন আপনার এই শিষ্যটি। এখনও নভিস। একটা সুটে ড্রিঙ্কের বুদ্ধি দিতে পারছে না। শ্রীমানের কাছে মামার প্রেস্টিজ আর থাকবে না।
সত্যসুন্দরদার চোখ দুটো বুদ্ধির দীপ্তিতে নেচে উঠল। অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে বললেন, এই সব ছেলেছোকরারা নতুন আইডিয়া নিয়ে আসছে। আর আমরা আপনারা সেকেলে হয়ে পড়ছি। সেইজন্যে আমি যে ড্রিঙ্ক সাজেস্ট করছি তার নাম ওল্ড ফ্যাশন্ড। ক্যানাডার হুইস্কির সঙ্গে প্রচুর পরিমাণে ফুট সোডা।
ফোকলা বললেন, চমৎকার। বোসদা বললেন, মার্জনা করবেন, এই ড্রিঙ্ক আপনার পছন্দ না হলে আমি যা সাজেস্ট করতাম তার নাম মস্কো মিউল।
অ্যাঁ! এই বুড়ো বয়সে মিউল। ছি ছি লোকে বলবে কী! ফোকলা চ্যাটার্জি হা-হা করতে লাগলেন।
শ্রীমান পাকড়াশী এবার আস্তে আস্তে বললে, আমি কিন্তু মামা আর খাব না। ফোকলা বিরক্ত হয়ে উত্তর দিলেন, কি মুশকিলেই যে পড়া গেল। ওরে, তুই আর খোকাটি নেই! বাড়িতে ফিরে গিয়ে তোর ব্যর্থ সার্টিফিকেটটা একবার এঞ্জামিন করে দেখিস। সেই তো সেবার ভূমিকম্পের বছরে তোর জন্ম হল। তোর বাবার তখন ঘোর দুর্দিন। ডিপ্রেসনে সব যেতে বসেছে। তুই হয়েছিস খবর পেয়ে পাকড়াশী সায়েবকে কংগ্রাচুলেশন জানিয়ে বিলেত থেকে চিঠি পাঠালাম। তা তোর বাবা আমাকে কী লিখে পাঠালে জানিস? হা-হা-হা। ফোকলা চ্যাটার্জি যেন অট্টহাসিতে ভেঙে পড়লেন।
পাকড়াশী-জুনিয়র মামার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। হাসির ঝড়টা কোনোরকমে সামলে নিয়ে ফোকলা বললেন, তোর বাবা লিখলে, কী করে সংসার চলবে জানি না। বোঝ, মাধব পাকড়াশী নিজের হাতে লিখছে, সে একটা ছেলে অ্যাফোর্ড করতে পারে না। সেই সব চিঠি ছিড়ে ফেলে দিয়ে কি বোকামিই যে করেছি! বোস সায়েব আমাকে সেকেন্ড ড্রিঙ্কটাই দাও। আমি ও ফ্যাশন্ড নই। মস্কো মিউল ছাড়া আমাকে কিছুই মানায় না। ক্যালকাটা ডক্তি বলে যদি কিছু থাকে তাও দিতে পারো।
