ডাক্তার চন্দ্রাদেবীকে নিপ দেখে জকুঞ্চিত করে বলেন–কি ভাবছেন? দেখুন, আমার নিকটে কিছু গোপন করতে চাইলে ভুল করবেন।
না না, আমি কিছু গোপন করব না–সব বলছি।
বসুন, একটা চেয়ার দেখিয়ে বলেন ডাক্তার–বসুন, এইখানে বসে বলুন।
ডাক্তার নিজেও বসেন একটা চেয়ারে। ওপাশে তাকিয়ে দেখলেন তিনি সুভাষিণী পূর্বের ন্যায় চোখে মুখে কাপড় ঢাকা দিয়ে পাশ ফিরে শুয়ে আছে। এবার প্রশ্ন ভরা দৃষ্টি মেলে তাকালেন চন্দ্রাদেবীর মুখের দিকে, একি! চন্দ্রাদেবীর ললাটে বিন্দু বিন্দু ঘাম চক চক করছে তাকে দেখে মনে হচ্ছে, সে যেন বেশ ঘাবড়ে গেছে। হেসে বলেন ডাক্তার–আপনি স্বচ্ছন্দে বলুন, ঘাবড়াবার কোন কারণ নেই।
বলছি, দেখুন ডাক্তার বাবু, আমার মনে হয় সুভা তাকে ভালবেসে ফেলেছে।
স্বচ্ছ হাস্যোজ্জ্বল মুখে বলেন ডাক্তার–কাকে?
একটা ঢোক গিলে বলে চন্দ্রাদেবী–যিনি সেদিন সুভাকে ডাকাতের হাত থেকে বাঁচিয়ে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে গিয়েছিলেন।
মুহূর্তে ডাক্তারের হাস্যোজ্জ্বল মুখমণ্ডল গম্ভীর হয়ে গেল। চমকে উঠলেন ডাক্তার। স্থিরকণ্ঠে পুনরায় জিজ্ঞাসা করলেন কাকে ভালবেসে ফেলেছে সুভাষিণী?
ঐ যে বললাম, সেদিন যে ভদ্রলোক ওকে ডাকাতের হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন তাকে।
এ কথা আপনি কেমন করে জানলেন?
আমাকে সুভা বলেছিল।
চন্দ্রাদেবী, সুভাষিণী আপনাকে যা বলেছে খুলে বলুন দেখি?
বলতে পারি কিন্তু …
কিন্তু নয়–বলুন, কিছু গোপন করবেন না।
চন্দ্রাদেবী একবার দরজার দিকে তাকিয়ে দেখে নিল। তারপর গলার স্বর খাটো করে নিয়ে বলতে শুরু করলো–ডাক্তার বাবু সুভা বলেছে যাকে সে ভালবাসে সে স্বাভাবিক লোক নয়। সে নাকি থেমে যায় চন্দ্রাদেবী।
ডাক্তার ব্যাকণ্ঠে জিজ্ঞাসা করেন–বলুন বলুন?
সে নাকি দস্যু বনহুর।
ডাক্তারের দৃষ্টি ধীরে ধীরে নত হয়ে যায়।
চন্দ্রাদেবী বলে কি, এও কি সম্ভব। অস্ফুট কন্ঠে বলে ওঠেন ডাক্তার-না না, এ হতে পারে না–দস্যু বনহুরকে ভালবাসা অসম্ভব।
চন্দ্রাদেবী ডাক্তারের কণ্ঠস্বরে চমকে ওঠে–বিস্ময়ভরা নয়নে তাকায় তার দিকে তারপর বলে সে–ডাক্তার বাবু আমিও ওকে একথা বারবার বলেছি যা সম্ভব নয়, তা চিন্তা করাও উচিত নয়। কিন্তু কিছুতেই সুভা তাকে ভুলতে পারছে না। ওর গোটা অন্তর জুড়ে ঐ একটি ছবি আঁকা রয়েছে–সে ঐ বনহুর। জেগেও সে তাকে স্বপ্নে দেখে। অস্ফুট স্বরে তারই নাম উচ্চারণ করে। ডাক্তার বাবু, আমি এতদিন সকলের কাছে কথাটা গোপন রেখেছিলাম কিন্তু আজ আপনার কাছে না বলে পারলাম না। আপনি যদি দয়া করে কিছু করতে পারেন।
অন্যমনস্কভাবে ডাক্তার বলেন–হুঁ।
চন্দ্রাদেবী তখন বলে চলে–ডাক্তার বাবু সুভার মনের যে অবস্থা, তাতে মনে হয় ও আর বাঁচবে না।
ডাক্তার এবার দৃষ্টি তুলে ধরেন চন্দ্রাদেবীর মুখের দিকে। গভীরভাবে কি যেন চিন্তা করেন। তিনি। তারপর উঠে দাঁড়ান। আচ্ছা, আজকের মত তাহলে চলি।
ততক্ষণে ব্রজবিহারী রায় কক্ষে প্রবেশ করেন সব শুনেছেন তো?
শুনেছি।
আমার কন্যা আরোগ্য লাভ করবে তো?
পরে জানাব। ডাক্তার দরজার দিকে পা বাড়ান।
ব্রজবিহারী রায় পেছন থেকে পুনরায় বলে ওঠেন–শুনুন ডাক্তার বাবু সুভাকে কেমন দেখলেন বললেন না তো।
থমকে দাঁড়িয়ে ফিরে তাকালেন ডাক্তার। তারপর ইতস্তত করে বলেন–পরে জানতে পারবেন।
আজ কিছুই বলবেন না?
না।
আবার কবে আসবেন? ব্যাকুল কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করেন ব্রজবিহারী রায়।
ডাক্তার আবার ফিরে এলেন চন্দ্রাদেবী আর ব্রজবিহারী রায়ের পাশে। স্থিরকণ্ঠে বললেন– সময় হলেই আবার আসব।
ব্রজবিহারী রায় পকেট থেকে একশ টাকার একখানা নোট বের করে বাড়িয়ে ধরলেন– এই নিন আপনার ফিস।
ডাক্তার হেসে বলেন–আজ কিছুই লাগবে না। আপনার কন্যাকে সুস্থ করতে পারলে দেবেন। কথাটা শেষ করে বেরিয়ে যান ডাক্তার।
ব্রজবিহারী রায় আশ্চর্য কণ্ঠে বলেন–অদ্ভুত লোক! ফিস পর্যন্ত নিল না।
চন্দ্রাদেবীও ডাক্তারের ব্যবহারে কম অবাক হয়নি। অন্যান্য ডাক্তারের চেয়ে এ ডাক্তার যেন আলাদা। ওর দৃষ্টির কাছে চন্দ্রাদেবী নিজকে সঙ্কোচিত মনে করছিল। কেন যেন একটা কথাও তার কাছে গোপন করতে পারল না। কথাটা বলা ঠিক হলো কিনা বুঝতে পারে না চন্দ্রাদেবী। শ্বশুরের কথায় কোন জবাব দিতে পারলো না সে।
.
মনিরা গভীরভাবে চিন্তা করে সন্ন্যাসী তাকে এভাবে এখানে আটকে রেখেছে কেন? এতে কি লাভ তার? এখানে তাকে আটকে রাখার উদ্দেশ্য কি?
মনিরা এখানে আসার পর এতটুকু অসুবিধা হয়নি তার। সে কিছু না চাইতেই হাতের কাছে সব পেয়েছে। এমনকি মনিরা বীণা বাজাতে পারত–একটা বীণাও সাজানো রয়েছে সেই কক্ষে। মনিরার মনে যখন অসহ্য ব্যথা জেগে উঠত তখন সে বীণা নিয়ে বসত।
প্রায়ই নিশীথ রাতে সে বীণায় ঝংকার তুলত। এক করুণ সুরে গোটা পোড়াবাড়ি আচ্ছন্ন হয়ে যেত গহন বনের পাতায় পাতায় ঝড়ে পড়া শিশির বিন্দুর টুপটাপ শব্দের সঙ্গে বীণার সুর মিশে এক অপরূপ মায়াময় পরিবেশের সৃষ্টি হত।
নিঃসঙ্গ জীবন মনিরার কাছে অসহনীয় হয়ে উঠল। নীরবে অশ্রু বিসর্জন করতে লাগল। যদিও এখানে তাকে কেউ বিরক্ত করতে আসত না। মুরাদের লালসাপূর্ণদৃষ্টি থেকে সে রক্ষা পেয়েছে, নাথুরামের কঠোর নির্যাতন থেকে অব্যাহতি পেয়েছে, তবু একটা ভয় ভীতি আর আশংকা মনিরার হৃদয়কে আচ্ছন্ন করে রেখেছে এখনও সে বন্দিনী। মামা মামীমার এবং আত্মীয় স্বজনের নিকটে এখনও সে অজ্ঞাত রয়েছে। কেউ তার সন্ধান জানে না।
