কক্ষের সবাই উদ্বিগ্নচিত্তে প্রৌঢ় ভদ্রলোকের কথা শুনছেন। সকলেরই চোখেমুখে বিস্ময়। মিঃ রাও বলেন–বলুন, তারপর কি হলো?
দেখলাম পাথরটা সরে গিয়ে তার মধ্য থেকে বেরিয়ে এলো এক সুড়ঙ্গপথ।
সেই পথের ভেতরে প্রবেশ করলেন বুঝি?
হ্যাঁ, তবে ভেতরে প্রবেশ করে স্তম্ভিত হলাম। তাদের কথাবার্তায় বুঝতে পারলাম-তারা স্বাভাবিক লোক নয়। এই যে দেশময় রাহাজানি আর লুটতরাজ চলছে, নারীহরণ চলছে, এর পেছনে রয়েছে সেই লোকগুলো। আসল কথা, তারা ডাকাতের দল এবং ওটা তাদের আস্তানা।
আশ্চর্য! অস্কুটধ্বনি করে ওঠেন মিঃ হারুন।
ভদ্রলোক আবার বলেন–আমি তাদের কথাবার্তায় আরও বুঝতে পেরেছি-সেই পর্বতটার নাম জম্বুর পর্বত এবং ঐ জায়গাটা পর্বতের দক্ষিণ কোণে। ইন্সপেক্টর সাহেব, আপনার কাছে আমার বিশেষ অনুরোধ, আপনি পুলিশ ফোর্স নিয়ে সেখানে যান। তারপর পকেট হাতড়ে একটি কাগজ বের করে এগিয়ে দেন এই নিন, আমি সেই পর্বতের গুপ্ত দরজার ছবি তৈয়ার করে এসেছি, এতে পথ-ঘাটের ছবি সুন্দর করে আঁকা রয়েছে।
মিঃ হোসেন বলে ওঠেন-কি রোগী দেখলেন তা তো বললেন না?
হাঁ বলছি, একটু থেমে বলেন প্রৌঢ় ভদ্রলোক-রোগীর কোন অসুখ নয়, শরীরে ভীষণ বেদনা আর জখম। হয়তো কোথাও মারধোর খেয়েছে। আমি তাড়াতাড়ি ঔষুধপত্র দিয়ে বিদায় হলাম। ওরাই আবার আমাকে রেখে গেল। কিন্তু বাড়িতে নয়-একটা নির্জন পথের ধারে আমাকে নামিয়ে দিয়ে চলে গেলো ওরা। এই তো ভোরবেলার কথা। আমি বাড়িতে গিয়েই ওষুধের বাক্সটা রেখে ছুটে এসেছি। ইন্সপেক্টর, আপনি ওদের পাকড়াও করার ব্যবস্থা করুন। আপনি পুলিশ ফোর্স পাঠাবার ব্যবস্থা করুন সেখানে, নইলে পালাবে ওরা।
মিঃ হারুন বলেন–আপনাকেও যেতে হবে পথ দেখিয়ে দেবার জন্য!
আমি-আমি যে বুড়ো মানুষ।
তবে বলতে এলেন কেন? জানেন এটা পুলিশ অফিস–
আমি এতটুকুও মিথ্যা বলিনি। কিন্তু রাত শেষ প্রহরে যাবেন, তার পূর্বে নয়।
আপনি যেতে পারবেন না?
আমার শরীর ভাল নয়, এইটুকু পথ এসেই হাঁপিয়ে পড়েছি।
শংকর রাও বলেন–মিঃ হারুন, ইনি যা বলছেন তা সত্য। আপনি এর কথামতই কাজ করুন, কারণ আমার মনে হয় সেই দুষ্ট শয়তানের দল পালিয়ে জম্বুর পর্বতে আশ্রয় নিয়েছে।
মিঃ হোসেন মিঃ শংকর রাওয়ের কথায় যোগ দেন–হ্যাঁ,আমারও সেই রকমই মনে হয়।
ভদ্রলোক তার পুরা নাম ঠিকানা দিয়ে বিদায় গ্রহণ করলেন।
ভদ্রলোক চলে যেতেই শংকর রাও বলেন–মিঃ হারুন, আপনি কি মনে করছেন?
হ্যাঁ, একবার যেতেই হবে সেখানে। লোকটার কথা বোধ হয় মিথ্যা নয়। তারপর ঐ ভদ্রলোকের দেয়া ম্যাপখানা মেলে ধরলেন টেবিলে।
মিঃ হারুন, মিঃ রাও এবং মিঃ হোসেনের মধ্যে ম্যাপ নিয়ে অনেকক্ষণ আলাপ-আলোচনা চলল, তারপর উঠে পড়লেন সকলে।
সন্ধ্যার পূর্বেই পুলিশ-ফোর্স নিয়ে তৈরি হয়ে নিলেন মিঃ হারুন। পুলিশদেরকে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে অতি গোপনে জন্ধুর পর্বতের দিকে রওনা দিতে নির্দেশ দিলেন। বহু দূরের পথ এই জম্বুর পর্বত। বহু বন, ঝোঁপঝাড়, ছোট ছোট পাহাড় টিলা পার হয়ে তবেই তারা পৌঁছবে সেই পর্বতে।
মিঃ হারুন আর মিঃ হোসেনের সঙ্গে শংকর রাও-ও চললেন। মিঃ হারুন টর্চলাইট ধরে পথ চিনে নিচ্ছিলেন। ম্যাপখানা এত সুন্দরভাবে আঁকা হয়েছিল যে, পথ চিনে নিতে এতটুকু কষ্ট হচ্ছিল না তাদের।
জম্বুর পর্বতের পাদমূলে পৌঁছে রেডিয়াম হাতঘড়ির দিকে তাকালেন মিঃ হারুন। রাত তখন। তিনটে, অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে তাঁরা এই পথ ধরে এসেছেন।
টর্চের আলো ফেলে আর একবার ম্যাপ দেখে নিলেন মিঃ হারুন এবং মিঃ হোসেন। খুশিতে তারা আত্মহারা হলেন-ঠিক জায়গায় পৌঁছতে তাঁরা সক্ষম হয়েছেন! ম্যাপ ধরে আরও কিছুটা দক্ষিণে এগুলেন, কিন্তু কই, এখানে তো কোন সুড়ঙ্গ বা পথের চিহ্ন নেই। শুধু পাথর আর পাথরে পর্বতের গা ঢাকা রয়েছে। স্থানে স্থানে ছোট ছোট আগাছা আর ঝোঁপঝাড়। আর রয়েছে অশ্বথ বৃক্ষ ও নাম না জানা কত বড় বড় গাছ।
মিঃ হারুন পর্বতের পাশে দাঁড়িয়ে চারদিকে তাকালেন-হা, তাঁর পুলিশ ফোর্স এসে পৌঁছে গেছে। এক-একজন এক একটা গাছের গুঁড়ির আড়ালে লুকিয়ে পড়েছে।
মিঃ হোসেন এবং শংকর রাও গুলীভরা রিভলবার হাতে মিঃ হারুনের পেছনে একটা ঝোঁপের মধ্যে লুকিয়ে রইলেন।
মিঃ হারুন মুখের মধ্যে দুটি আংগুল দিয়ে খুব জোরে শিস দিলেন-একবার দু’বার তিন বার। হঠাৎ একটা হুড় হুড় শব্দ কানে এলো তাদের। মিঃ হারুন আশ্চর্য হয়ে দেখলেন-তাঁর সামনে পর্বতের গা থেকে একটি বিরাট পাথর একদিকে সরে যাচ্ছে। আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠলো তার মুখমণ্ডল। তিনি স্পষ্ট দেখলেন-পর্বতের গায়ে একটি সুড়ঙ্গপথ বেরিয়ে এসেছে।
মিঃ হারুন সুড়ঙ্গপথে গিয়ে দাঁড়ালেন, সঙ্গে সঙ্গে বাঁশিতে ফুঁ দিলেন। অমনি পুলিশ ফোর্স এবং মিঃ হোসেন ও শংকর রাও সুড়ঙ্গ পথে প্রবেশ করলেন।
মিঃ হারুন এবং পুলিশ ফোর্স ভেতরে প্রবেশ করতেই দু’জন মশালধারী মশাল দূরে নিক্ষেপ করে ছুটে পালাল।
মিঃ হারুন এবং মিঃ হোসেন মশাল দু’টি কুড়িয়ে নিয়ে রিভলবার উদ্যত করে দ্রুতগতিতে এগুলেন, পেছনের পুলিশ ফোর্স ছড়িয়ে পড়ল সুড়ঙ্গের ভেতরে।
অল্পক্ষণের মধ্যে দশজন ডাকাতকে তাঁরা পাকড়াও করতে সক্ষম হলেন। কিন্তু নাথুরামকে। তারা ধরতে পারলেন না। নাথুরাম একটি গুপ্তগর্তে আত্মগোপন করে রইলো।
