মুরাদ সন্ন্যাসী বাবাজীকে লক্ষ্য করে বললো–এই সেই মনিরা।
সন্ন্যাসী বাবাজী অস্কুটস্বরে বলেন–হু।
মুরাদ ভক্তিভরে মাথা নত করে বললো–বাবাজী, সব আমি আপনাকে বলেছি, আর…..
থাক, আর বলতে হবে না। তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে মনিরার দিকে তাকালেন সন্ন্যাসী বাবাজী। তারপর বলেন “তুমি বাইরে যাও, তোমায় যখন ডাকবো তখন ভেতরে এসো-সাধনা শুরু হবে।
মুরাদ খুশিমনে বেরিয়ে গেল।
সন্ন্যাসী মনিরার দিকে এগুলেন। মশালের আলোতে নিপুণ দৃষ্টি মেলে দেখতে লাগলেন। তারপর বলেন–এসো, তোমার মাথায় ফুঁ দিই।
না। দৃঢ় কণ্ঠস্বর মনিরার।
যুবতী, তোমাকে সে চায়–কেন ওকে তুমি পায়ে ঠেলছো?
রুদ্ধকণ্ঠে বলে মনিরা–ওকে আমি চাই না। প্রাণ যদি যায় তবুও না!
কিন্তু আমি এমন মন্ত্র পাঠ করে তোমায় ফুঁ দেবো তখন দেখবে সে–ই তোমার প্রিয়জন হয়ে দাঁড়াবে।
মনিরা আকুলভাবে কেঁদে উঠলো-না না সন্ন্যাসী, আপনি আমার সর্বনাশ করবেন না। তার চেয়ে আমাকে হত্যা করুন।
তা হয় না। সে আমাকে অনেক অনুনয় বিনয় করে তবেই এখানে এনেছে। আমি তাকে ফাঁকি দিতে পারি না।
আপনি সংসারত্যাগী মহাপুরুষ, আপনি একজন মহান ব্যক্তি, একটি নারীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে তার সর্বনাশ করতে পারবেন? আপনার হৃদয় কি এতটুকু কাঁপবে না?
যুবতী, আমি সকলেরই মঙ্গলাকাঙ্খী। তুমি কি চাও-বলতে পার?
মনিরা যেন অন্ধকারে আলোর সন্ধান পায়। ব্যাকুলকণ্ঠে বলে–আপনি আমাকে বাঁচান…..
সন্ন্যাসী গম্ভীরকণ্ঠে বলেন–বুঝেছি, তুমি একজনকে ভালবাস।
হ্যাঁ বাসি।
কে সে?
না না, তা বলতে পারি না।
পারতে হবে। আমি তাহলে তোমাকে তার নিকট পৌঁছে দেব।
সত্যি?
হ্যাঁ, বল তার নাম কি? অবশ্য তুমি না বললেও আমি যোগবলে জানতে পেরেছি। যাকে তুমি ভালবাস-সে দস্যু বনহুর।
মনিরা অস্কুটধ্বনি করে ওঠে-সন্ন্যাসী, আপনি সবই জানেন। আমাকে এই লম্পট শয়তানের হাত থেকে বাঁচান-বাঁচান-আকুলভাবে কেঁদে ওঠে মনিরা।
সন্ন্যাসী মনিরার মাথায় হাত রেখে সান্ত্বনার সুরে বলেন–ক্ষান্ত হও। যদি আমাকে বিশ্বাস করো তবে তোমাকে তোমার প্রিয়ের নিকট পৌঁছে দিতে পারি!
সত্যি?
হ্যাঁ, তুমি মুরাদের সঙ্গে আমার আস্তানায় যেও, আমি তোমাকে ঠিক জায়গায় পৌঁছে দেব। আর যা বলি সেইমত কাজ করো-মুরাদের হাতে হাত রাখতে বললে রাখবে, তোমার আঁচল বিছিয়ে ওকে বসতে দেবে।
আচ্ছা।
মনে থাকবে সব কথা?
থাকবে।
সন্ন্যাসী এবার হাতে তালি দিলেন।
সঙ্গে সঙ্গে কক্ষে প্রবেশ করলো মুরাদ–বাবাজী আমাকে ডাকছেন?
হ্যাঁ বৎস, সময় সংকীর্ণ। আমাকে শীঘ্র যেতে হবে। তার পূর্বে আমি তোমার সাধনা শেষ করতে চাই। দেখো বৎস, ওকে আমি মন্ত্রে বশীভূত করে ফেলেছি। হাত পাতো–
মুরাদ দক্ষিণ হাত প্রসারিত করলো।
মনিরাকে ইঙ্গিত করলো সন্ন্যাসী তার হাতের ওপর হাত রাখতে।
মনিরা ধীরপদে এগিয়ে এসে মুরাদের হাতের ওপর দক্ষিণ হাতখানা রাখলো।
সন্ন্যাসী বিড়বিড় করে মন্ত্রপাঠ করতে লাগলেন।
মুরাদের মুখে হাসি ফুটে ওঠে। এত অল্প সময়ে মনিরা এতখানি বশীভূত হয়েছে–বড় আনন্দের কথা!
এবার সন্ন্যাসী মনিরাকে আঁচল পেতে বসতে বলে। মনিরা আঁচল পেতে বসলো। মুরাদকে বললো–বৎস, ওর আঁচলে বসো।
মুরাদ গুরুদেবের আদেশ পালন করলো।
কিছুক্ষণ স্ন্যাসী মন্ত্র পাঠ করার পর বলে উঠলেন–আজ সাধনা শেষ হলো না, কিছু বাকি রইলো। তুমি কাল মনিরাকে নিয়ে আমার আস্তানায় এসো, বাকিটুকু শেষ করবো। সাবধান, সাধনা শেষ হবার পূর্বে যেন মনিরাকে স্পর্শ করো না, তাহলে সব পণ্ড হয়ে যাবে–আজ সময় সংকীর্ণ-আমি চললাম।
বাবাজী, আমি আপনাকে পৌঁছে দেব?
দরকার হবে না।
মুরাদ সন্ন্যাসী বাবাজীকে গুপ্ত গুহার বাইরে পৌঁছে দেয়। বিদায়কালে বার দুই সন্ন্যাসীর চরণধূলি গ্রহণ করে সে।
মনিরার নিখোঁজের পর চৌধুরী সাহেব এবং তার স্ত্রী মরিয়ম বেগমের অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয় হয়ে পড়েছে। অবিরত কাদা কাটি করে চলেছেন তাঁরা। চৌধুরী সাহেব একে ভাগনী মনিরার জন্য গভীরভাবে শোকাভিভূত হয়ে পড়েছেন, তদুপরি স্ত্রীর জন্য তিনি বিশেষ চিন্তিত হয়ে পড়েছেন।
সেদিন দ্বিপ্রহরে চৌধুরী সাহেব স্ত্রীর শিয়রে বসে তাঁকে সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন, এমন সময় বয় এসে জানালো-স্যার, ইন্সপেক্টর সাহেব এসেছেন, আপনার সঙ্গে জরুরি দরকার আছে।
চমকে উঠলেন চৌধুরী সাহেব, হঠাৎ এ সময়ে–কোন সন্ধান পেয়েছে কি তারা?
মরিয়ম বেগমও উদ্বিগ্ন হলেন, বলেন–”ওগো, দেরী করো না-যাও, দেখো কি সংবাদ তাঁরা এনেছেন।
যাচ্ছি।
চৌধুরী সাহেব ড্রইংরুমে প্রবেশ করতেই দেখতে পেলেন মিঃ হারুন এবং মিঃ হোসেন বসে আছেন। উভয়ের মুখমণ্ডলেই বেশ চঞ্চলতা ফুটে উঠেছে। চৌধুরী সাহেবকে দেখেই সালাম জানালেন। তারপর মিঃ হারুন বলেন–চৌধুরী সাহেব, অসময়ে আপনাকে বিরক্ত করতে বাধ্য হচ্ছি। আপনার ভাগনী মিস মনিরার একটি চিঠি আমাদের হস্তগত হয়েছে।
মনিরা চিঠি লিখেছে-কই-কই সে চিঠি? ব্যস্তভাবে চৌধুরী সাহেব এগিয়ে গেলেন মিঃ হারুনের দিকে।
বসুন আমি দেখাচ্ছি। পকেট থেকে একটি ভাঁজকরা কাগজ বের করে বলেন–এই নিন।
চৌধুরী সাহেব সোফায় বসে কাগজটা চোখের সামনে মেলে ধরেন। ধীরে ধীরে তার মুখমণ্ডল স্বাভাবিক হয়ে এলো!
মিঃ হারুন এবং মিঃ হোসেন এতক্ষণ তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে চৌধুরী সাহেবের মুখমণ্ডল লক্ষ্য করছিলেন। এবার মিঃ হারুন জিজ্ঞাসা করলেন-চৌধুরী সাহেব, এই চিঠিখানা তাহলে সত্যিই আপনার ভাগনী মিস মনিরার হতের লেখা?
