তুমি যা ভেবেছিলে তাই হলো। ঘুঘুটাকে ফাঁদ থেকে বের করাই ভুল হয়েছিল। তাই সে বেঁচে গেল।
নাথুরামের চোখ দুটো ধক করে জ্বলে ওঠে। দাঁতে দাঁত পিষে বলে–ঘুঘুটার কোন দোষ নেই হুজুর। ওকে আমি যেভাবে পিছমোড়া করে বেঁধে গাড়ির পেছনে মেঝেতে শুইয়ে রেখেছিলাম কোন ব্যাটাই ধরতে পারতো না। যদি ঐ পাজিটা আমার গাড়িখানাকে ফলো না করত।
সে কে তাকে তুমি চিনতে পেরেছিলে নাথুরাম?
তাকে চিনতে না পারলেও অনুমানে বুঝতে পেরেছি সে দস্যু বনহুর ছাড়া আর কেউ নয়।
আমারও তাই মনে হয় নাথু, নাহলে তোমার মত বলবান বীর পুরুষকে কাবু করতে পারে, এমন লোক আছে?
মনিরার হৃদয়ে এক অনাবিল শান্তির প্রলেপ ছোঁয়া দিয়ে যায়। মনির তাহলে মিঃ রাওকে উদ্ধার করে নিতে পেরেছে। সে তাহলে নীরব নেই। তাকেই খুঁজে ফিরছে সে। হয়তো তার কথা স্মরণ করে চোখের পানি ফেলছে। মনির ভাবছে মনিরার কথা–এ যে মনিরার কত বড় সৌভাগ্য মনির–তার মনির না জানি এখন কোথায় কি করছে। মনিরা নিজের জন্য দুঃখ করে না। যত ভাবনা ওর জন্য। তাকে খুঁজতে গিয়ে হঠাৎ কোন বিপদে না পড়ে। খোদা, তুমি ওকে বাঁচিয়ে নিও।
নাথুরামের কথায় মনিরার চিন্তাস্রোতে বাধা পড়ে। নাথুরাম বলছে–মিস মনিরা দাও ওটা লিখে দাও।
মুরাদ কাগজ দু’খানা আর কলমটা মনিরার হাতে গুঁজে দিল।–এ কথাগুলো ঐ সাদা কাগজখানায় লিখে দাও।
মনিরা কাগজখানায় দৃষ্টি বুলিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দেয়–না আমি কিছুতেই একথা লিখবো না।
মুহূর্তে মুরাদ গর্জে ওঠে–কি বললে, তুমি লিখবে না?
না!
দাঁতে দাঁত পিষে বলে মুরাদ–তোমাকে লিখতে হবে।
কখনো না।
মুরাদ এবার নাথুরামের দিকে তাকালো নাথুরাম, আমি আদেশ দিলাম, তুমি যেমন করে পারো ওর কাছ থেকে লিখিয়ে নাও।
হুজুর, আপনি একটু বাইরে যান।
বেশ, আমি যাচ্ছি। মুরাদ গুহায় দরজার দিকে পা বাড়ায়।
মনিরার বুক থর থর করে কেঁপে ওঠে। শিউরে ওঠে তার শরীর। মুরাদের চেয়েও মনিরা নাথুরামকে বেশি ভয় করে। মুরাদ বেরিয়ে গেলে নাথুরাম কি করে বসবে ভাবতে পারে না মনিরা।
দুহাতে মাথার চুল টানতে থাকে মনিরা। নাথুরাম তার ভয়ংকর বলিষ্ঠ বাহু দুটি মেলে এগিয়ে যায় তার দিকে লিখবে না তুমি? বেশ! নাথুরাম এগুতে থাকে, মনিরা নাথুরামের কদাকার ভয়ংকর মুখখানার দিকে তাকিয়ে ভীতভাবে কাগজ দু’খানা হাতে তুলে নেয়।
কলমটা ছিটকে দূরে পড়ে গিয়েছিল, ওঠা মনিরার হাতে তুলে দেয় নাথুরাম লক্ষ্মী মেয়ের মত চট করে লিখে ফেলো।
মনিরা কাগজ নিয়ে লিখতে বসে। লেখা শেষ করে উঠে দাঁড়ায়।
নাথুরাম ডাকে–হুজুর, এবার ভেতরে আসুন।
মুরাদ হাসতে হাসতে গুহায় প্রবেশ করে–হয়েছে?
হ্যাঁ, এই দেখুন। মনিরার লিখিত কাগজখানা নাথুরাম মুরাদের কাছে দেয়।
মুরাদ কাগজখানা পড়ে বলে–চমৎকার! নাথু, তোমার বুদ্ধির তারিফ না করে পারি না।
নাথুরাম মুরাদের হাত থেকে কাগজখানা নিয়ে ভাঁজ করে পকেটে রাখতে রাখতে বলে– এবার আপনি নিশ্চিন্ত হুজুর। এই চিঠি পেলে পুলিশ আর মনিরার সন্ধান নিয়ে উঠে পড়ে লাগবে না। ওর মামা মামী নিশ্চিন্তে হাঁফ ছেড়ে বাঁচবে। আমি তাহলে….
মুরাদ জড়িতকণ্ঠে হাই তুলে বলে–এসো।
মনিরা ক্ষিপ্তের ন্যায় বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে আছে মুরাদের দিকে। সে যদি মুনি ঋষি হতো তাহলে তার দৃষ্টিশক্তি দিয়ে ভস্ম করে দিত মুরাদকে।
মুরাদ মনিরার দিকে তাকিয়ে চমকে ওঠে। মনিরার দৃষ্টি তার শরীরে যেন তীর ফলকের মত গিয়ে বিধছে। গাটা যেন শির শির করে ওঠে তার। মনিরার একি মূর্তি? মুরাদ কেমন যেন। ভড়কে যায়। মদের নেশা ছুটে যায়। মনিরার নিঃশ্বাস যেন তার সমস্ত দেহে আগুন ধরিয়ে দেয়।
মুরাদ যেন আর এক মুহূর্ত এখানে থাকতে পারে না। অসহ্য লাগছে ওকে। কি হলো– হঠাৎ এমন বিশ্রী লাগছে কেন? আর স্থির থাকতে পারে না মুরাদ, ধীরে ধীরে সরে পড়ে।
মুরাদ বেরিয়ে যেতেই বিরাট পাথরের দরজাখানা গুহার মুখ বন্ধ করে ফেলে। হঠাৎ মুরাদের ভয় বা ভীতির কোন কারণ ছিল না, আসলে আজ তার মদের মাত্রা খুব বেশি হয়েছিল।
মুরাদ চলে যেতেই মনিরা লুটিয়ে পড়লো মেঝেতে। কাঁদতে লাগলো ছোট্ট বালিকার মত। মাথার চুল টেনে ছিঁড়ল। ঠোঁট কামড়ে রক্ত বের করলো তবু তার কান্নার বিরাম নেই।
কেঁদে কেঁদে এক সময় ঘুমিয়ে পড়লো মনিরা। স্বপ্ন দেখছে সে, মনিরা কাঁদছে–কেঁদে কেঁদে চোখ দুটো লাল হয়ে গেছে। আর কত কাঁদবে সে! হঠাৎ গুহার দরজা খুলে যায়। মনিরা চমকে উঠে বসলো। একি! গুহার দরজায় মনির দাঁড়িয়ে। তার চোখে মুখে ব্যাকুলতার ছাপ। মলিন বিষণ্ণ মুখমণ্ডল–ওষ্ঠদ্বয় শুষ্ক। তাকে দেখতে পেয়ে ওর চোখ দুটো খুশিতে দীপ্ত হয়ে ওঠে। অস্ফুট কন্ঠে ডেকে ওঠে সে–মনিরা তুমি এখানে। আর আমি তোমাকে গোটা পৃথিবী খুঁজে বেড়াচ্ছি। মনিরাও ওকে দেখতে পেয়ে আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়লো। উচ্ছলকন্ঠে বলল–মনির তুমি এসেছো। ছুটে ঝাঁপিয়ে পড়ে সে ওর বুকে। হঠাৎ মাটি আঁকড়ে চিৎকার করে ওঠে– মনির– মনির! ঘুম ভেঙে যায় মনিরার–তাকিয়ে দেখে কেউ নেই–কিছু নেই-শূন্য গুহার মেঝেতে সে একা শুয়ে আছে।
.
হতাশ হয়ে শয্যায় শুয়ে পড়লো বনহুর। আজ কতদিন তার এতটুকু বিশ্রাম হয় নি। অহরহ। মনিরার সন্ধানে সে উল্কার মত ছুটে বেড়িয়েছে। আহার ন্দ্রিা একেবারে পরিহার করেছে সে। নূরী জোর করে চারটি খাইয়ে দেয়, তাই সে বেঁচে আছে।
