সুভাষিণী জানে যাকে নাকি ধ্যান করা যায়, একদিন না একদিন তার দর্শনলাভ ঘটে। সুভাষিণী কিছু চায় না, শুধু আর একটি দিন তার দেখা পাবে, এই আশায় বুক বেঁধে প্রতীক্ষা করছে সে। সুভাষিণী বলেছিল, আবার কবে আপনার দেখা পাব? জবাবে বলেছিল বনহুর ঈশ্বর
করুন আবার যদি এমনি কোন বিপদে পড়েন তখন ..মুহূর্তে সুভাষিণীর মুখমণ্ডল উজ্জ্বল দীপ্ত হয়ে উঠে। বিপদই তাকে বেছে নিতে হবে। পালাবে সুভাষিণী। যেদিকে তার দুচোখ যায় পালাবে সে। তাহলে এ বিয়ে থেকে ও পরিত্রাণ পাবে। …
সুভাষিণী বিছানা ছেড়ে উঠে পড়লো। ঘরের দরজা খুলে বেরিয়ে এলো বাইরে। দুর্ভেদ্য অন্ধকার গোটা পৃথিবীটাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। আকাশে মেঘ জমাট বেঁধে রয়েছে–এই বুঝি আকাশটা ভেংগে বৃষ্টি নামবে।
সুভাষিণী বেরিয়ে পড়লো। কোনদিকে তার ভ্রূক্ষেপ নেই। দ্রুত এগিয়ে চললো সে। ভোর হবার পূর্বেই পিতার জমিদারী ছেড়ে পালাতে হবে, নইলে তার রেহাই নেই।
কিন্তু অল্পক্ষণের মধ্যেই শুরু হলো অবিরাম বৃষ্টি। বড় বড় বৃষ্টির ফোঁটাগুলো সুভাষিণীর শরীরে সঁচের মত বিধতে লাগলো। মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। সুভাষিণী দু’হাতে বুক চেপে ধরে ছুটতে লাগলো।
জমিদারের আদুরে কন্যা সুভাষিণী কোনদিন এতোটুকু দুঃখ সহ্য করেনি। এই রাতদুপুরে দুর্যোগপূর্ণ মুহূর্তে সব দুঃখ ভুলে ছুটে চলেছে সে। কতদূর এসেছে কোন দিকে চলেছে, কোথায় চলেছে, কিছুই জানে না সুভাষিণী। বার বার হোঁচট খেয়ে পড়ে যাচ্ছে সে। আবার উঠছে, আবার ছুটছে; ভাবছে কই সে যে বলেছিল, বিপদমুহূর্তে আবার তুমি আমার দেখা পাবে। কই-কই সে, কোথায় তার দেখা পাব।
কতদূর যে এসে পড়েছে সুভাষিণী নিজেই জানে না। বৃষ্টি থেমে গেছে। আকাশ পরিষ্কার। হয়ে এসেছে। সুভাষিণী ক্লান্ত শরীরটা নিয়ে একটা গাছের তলায় বসে পড়ে। অতি পরিশ্রমে বৃষ্টি আর ঝড়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছুটে দেহটা তার অবশ হয়ে এসেছিল, অল্পক্ষণেই জ্ঞান হারিয়ে ফেললো সুভাষিণী।
যখন জ্ঞান ফিরলো চোখ মেলে দেখলো সে একটি বেডে শুয়ে আছে। পাশে দাঁড়িয়ে একটি নারী ও একটি পুরুষ কি সব কথাবার্তা বলছে। তাকে চোখ মেলতে দেখে মেয়েটা বলে উঠল– ডক্টর ওর জ্ঞান ফিরে এসেছে।
এবার সুভাষিণী বুঝতে পারে–সে যেখানে এখন শুয়ে রয়েছে, সেটা একটা হসপিটাল। মেয়েটার শরীরে নার্সের ড্রেস আর ভদ্রলোকটি ডাক্তার, এ কথা সে একটু পূর্বেই নার্সের মুখের কথায় জানতে পেরেছে।
সুভাষিণী খুশি হতে পারলো না। সে তো বাঁচতে চায়নি চেয়েছিল মরতে, কিন্তু এখানে সে এলো কি করে!
ততক্ষণ ডাক্তার তাকে পরীক্ষা করে দেখতে শুরু করেছেন। পরীক্ষা শেষ করে বলেন– আর কোন ভয় নেই। আপনি ওকে গরম দুধ খেতে দিন।
নার্স গেলাসে খানিকটা গরম দুধ এনে সুভাষিণীকে খেতে দিল।
সুভাষিণী মুখ ফিরিয়ে নিলো না, আমি খাব না।
নার্স আশ্চর্য কণ্ঠে বললো–কেন খাবেন না?
না, আমি কিছু খাবো না।
নার্স হেসে বলে–ও বুঝতে পেরেছি। স্বামীর উপর অভিমান হয়েছে।
স্বামী!
হ্যাঁ, আপনার স্বামীই তো এখানে রেখে গেছেন আপনাকে।
সুভাষিণী অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে নার্সের মুখের দিকে।
নার্স বলে–আপনি দুধটুকু খেয়ে ফেলুন, কোন চিন্তা করবেন না। আপনার স্বামী এলে যাবেন।
এবার সুভাষিণী দুধটুকু এক নিঃশ্বাসে খেয়ে হাতের পিঠে মুখ মুছে বলে–আমি আপনার কথা বুঝতে পারছিনে।
সব বুঝতে পারবেন। আপনার স্বামী একটা চিঠি দিয়ে গেছেন আপনাকে দেবার জন্য। আপনি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠলে চিঠিটা দেব।
সুভাষিণী ব্যাকুল কণ্ঠে বলে–আমি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠেছি। কই চিঠি দিন।
এখন নয়, পরে পাবেন।
না, না এখনই দিন।
কিন্তু এখন তো দেওয়া চলবে না।
দিন আমার অনুরোধ, আপনি দিন…
বুঝেছি স্বামীর চিঠি কিনা….দাঁড়ান এনে দিচ্ছি।
নার্স চলে যায়। একটু পরে একটা গভীর সবুজ রং-এর মুখ আঁটা খাম এনে সুভাষিণীর হাতে দেয়।
দুরু দুরু বক্ষে সুভাষিণী খামখানার মুখ ছিঁড়ে চিঠিটা বের করে মেলে ধরলো চোখের সামনে। মাত্র দু’লাইনে লেখা সুভাষিনী এক নিঃশ্বাসে পড়ে ফেললো–
তোমাকে এভাবে দেখবো ভাবতে পারিনি। সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে যেও।
–দস্যু বনহুর।
সুভাষিণীর চোখ দুটো দীপ্ত উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। বার বার পড়ছে সে চিঠির দু’ছত্র লেখা। তার ডাকে এসেছিল সে। সাড়া দিয়েছিল..
নার্স বিস্ময় বিমুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে আছে। হেসে বললো– আপনার স্বামীর সঙ্গে রাগারাগি হয়েছে বুঝি?
সুভাষিণী নার্সের প্রশ্নে তাকালো তার মুখে। তারপর আনমনা হয়ে যায়।
নার্স হেসে বলে–সত্যি আপনার স্বামী-ভাগ্য। যেমন সুন্দর চেহারা, তেমন তার ব্যবহার।
অবিবাহিত নার্সের মনে হয়তো জানার বাসনা জাগে। জিজ্ঞাসা করে–চিঠিতে কি লিখেছেন উনি?
সুভাষিণী কাগজখানা ভাঁজ করে রেখে বলে–লিখেছেন, আসতে বিলম্ব হলে আমি যেন ঘাবড়ে না যাই।
অমন রাজপুত্রের মত স্বামী, একদণ্ড না দেখলে ঘাবড়াবার যে কথাই…
সুভাষিণী একটা দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করে বলে–হুঁ।
.
বনহুর এসে পৌঁছতেই নূরী তার পাশে গিয়ে দাঁড়াল–হুর, তুমি না বলেছিলে রাতেই ফিরে আসবে?
সে এক অদ্ভুত কাণ্ড নূরী! চলো বলছি।
কি এমন কাণ্ড হল? তোমার কাছে তো দিন-রাত অদ্ভুত কাণ্ডের সীমা নেই।
