একদিন দু’দিন করে যখন প্রায় সপ্তাহ কেটে গেল, তখন মনিরার অবস্থা মর্মান্তিক হয়ে পড়লো। নাওয়া খাওয়া নেই। পাগলিনীর মত হয়ে পড়লো মনিরা। চৌধুরী সাহেব এবং মরিয়ম বেগম চিন্তিত হলেন। যদিও তাঁদের মনেও দারুণ অশান্তি ছিলো, তবু মনিরার জন্য আরও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লেন।
মনিরা দিন দিন অসুস্থ হয়ে পড়লো। ওর মনে সদা ভয়–আর সে বেঁচে নেই। বেঁচে থাকলে নিশ্চয়ই আসতো কিংবা কোনো সংকেত জানিয়ে দিত–আমি ভাল আছি।
ক্রমে হতাশ হয়ে পড়লো মনিরা। সেই দিনের ফুলের মালাটা ছবির গলায় শুকিয়ে গেছে। ছবির দিকে তাকিয়ে মনিরার চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ে ফোঁটা ফোঁটা অশ্রু।
মনিরা ভাবে–শিশুকালে তার জীবন থেকে যে হারিয়ে গিয়েছিল, আবার কেনই বা সে ফিরে এসেছিল তাকে কি শুধু কাঁদাবার জন্যই এসেছিল ও!
এ কথা মিথ্যে নয়, যে নারী বনহুরকে ভালবেসেছে তাকেই কাঁদতে হয়েছে। কেউ ওকে ধরে রাখতে পারেনি কোন দিন। বনহুরকে কেউ মায়ার বন্ধনে বেঁধে রাখতে সক্ষম হয়নি। শুধু মনিরাই নয়, দস্যু বনহুরকে ভালবেসে অনেককেই কাঁদতে হয়েছে। কিন্তু বনহুরের মনে আজও কেউ রেখাপাত করতে পারেনি একমাত্র মনিরা ছাড়া।
তবু মনিরাকেও মাঝে মাঝে বিস্মৃত হয়ে যায় বনহুর। ভুলে যায় সে গোটা দুনিয়াকে, নিজের মধ্যে যখন চাড়া দিয়ে উঠে তার উন্মত্ত দস্যুভাব।
মনিরা যতই বনহুরের কথা চিন্তা করে চলে ততই সে অসুস্থ হয়ে পড়ে। জ্বর দেখা দেয় ওর শরীরে।
মরিয়ম বেগম স্বামীকে ডাক্তার ডাকতে বলেন। চৌধুরী সাহেব তাঁর বাল্যবন্ধু ডাক্তার সেনকে কল করলেন।
ডাক্তার সেন এলেন এবং মনিরাকে পরীক্ষা করে বললেন, অসুখ এর শরীরে নয়, মনে। কাজেই এর জ্বরটা স্বাভাবিক নয়। তবু আমি ঔষধপত্র দিচ্ছি। তাড়াতাড়ি প্রেসক্রিপশন করে উঠতে যান ডাক্তার সেন।
চৌধুরী সাহেব ডাক্তার সেনের তাড়াহুড়ো দেখে বলেন, এতো ব্যস্ত হচ্ছো কেন জয়ন্ত? অনেকদিন পর এসেছ, তবু স্বেচ্ছায় নয়, ডেকে এনেছি; অথচ চা না খেয়ে যেতে চাও?
না ভাই, আজ আমি বিলম্ব করতে পারছিনে, দেখছো তো সন্ধ্যা হয়ে এলো। আর একদিন সকাল সকাল আসবো।
হেসে বললেন চৌধুরী সাহেব, রাতকে এতো ভয় কেন ডাক্তার?
ডাক্তার সেন ভয়াতুর কণ্ঠে বলে উঠলেন–রাতকে আমি খুব ভয় করি।
তার মানে?
সেদিন যা এক বিভ্রাটে পড়েছিলুম।
কি হয়েছিল?
সাংঘাতিক এক কাণ্ড! শোন তবে বলছি–কিছুদিন আগে এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটে গেছে। রাতে খেয়ে দেয়ে ঘুমিয়েছি, হঠাৎ তিনটে কিংবা সাড়ে তিনটে হবে একটি যুবক গাড়ি নিয়ে হাজির। সাংঘাতিক এক্সিডেন্ট; এক্ষুণি যেতে হবে। জানোই তো, আমি রাতে কোথাও যাইনে। তবু যুবক নাছোড় বান্দা। বাধ্য হয়েই গেলুম। তারপর কি জানো, সে এক বিস্ময়কর ঘটনা।
চৌধুরী সাহেব বললেন–তোমার কাহিনীটা দেখছি বেশ রস পদ ধরনের। যাক চা খেতে খেতেই শোনা যাবে। চলো হল ঘরে যাই। তারপর বৃদ্ধ চাকর নকিবকে ডাকতে শুরু করেন তিনি–নকিব, নকিব…..
একটা কম্বল মুড়ি দিয়ে নকিব এসে দাঁড়ালো।
চৌধুরী সাহেব ওর দিকে তাকিয়ে প্রথম আশ্চর্য কণ্ঠে বললেন–সেকি, এই গরমের দিনে কম্বল কেন গায়ে দিয়েছিস?
কাঁপা গলায় বললো নকিব–জ্বর হয়েছে।
তবে তুই এলি কেন?
আপনি যে ডাকলেন!
শোন, বাবুর্চিকে বল হলঘরে দুকাপ চা আর নাস্তা পাঠিয়ে দিতে। আর শোন এই ঔষধটা দেখছিস-এটা এক্ষুণি মনিরাকে এক দাগ খাইয়ে দে।
আচ্ছা।
চৌধুরী সাহেব আর ডাক্তার সেন মনিরার কক্ষ থেকে বেরিয়ে যান।
বৃদ্ধ নকিব এবার টেবিল থেকে ঔষধের শিশি আর ছোট্ট গেলাসটা হাতে তুলে নিয়ে মনিরার পাশে গিয়ে দাঁড়ায়।
মনিরা খেঁকিয়ে উঠে–ভাগ হতভাগা, ঔষধ আমি খাব না।
নকিব দাঁড়ি নেড়ে বললো–খেতেই হবে তোমাকে।
আবার কথা বলছিস…
নকিব তবু গেলাসে ঔষধ ঢাললো।
মনিরা ওর হাত থেকে ঔষধ নিয়ে ঢেলে ফেললো পাশের ফুলদানিতে; তারপর বললো– আমি বলছি আমার কোন অসুখ হয়নি, তবু ঔষধ খেতে হবে।
নকিব এক নজরে তাকিয়ে ছিল মনিরার মুখের দিকে।
মনিরা বলে উঠে–অমন হা করে আমার মুখে কি দেখছিস শুনি?
তোমায় দেখছি আপামনি…
বের হয়ে যা বলছি …
যাচ্ছি যাচ্ছি আপামনি, কিন্তু …
আর কিন্তু নয়, শীগগির বের হয়ে যা।
নকিব বেরিয়ে যায়, যাবার আগে আর একবার মনিরার দিকে ফিরে তাকায়।
নকিব বেরিয়ে যেতেই, মনিরা শয্যা ত্যাগ করে চুপি চুপি সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে আসে, তারপর সন্ধ্যার আধো অন্ধকারে গা ঢাকা দিয়ে দাঁড়াল দরজার আড়ালে।
ডাক্তার সেন বলছেন–গাড়িখানা আমাকে নিয়ে শহরের এক গলিপথে গিয়ে পড়লো। ঠিক সেই মুহূর্তে পিঠে একটা ঠান্ডা কিছু অনুভব করলুম; ফিরে দেখি, যুবকটা আমার পিঠে রিভলবার চেপে ধরেছে।
চৌধুরী সাহেব ভয়ার্ত কণ্ঠে প্রতিধ্বনি করে উঠেন বল কি?
এমন সময় নকিব চায়ের ট্রে হস্তে মনিরার পিছনে এসে দাঁড়ায়-দরজা ছাড়ুন আপামনি, চা নাস্তা নিয়ে যাব।
চমকে সরে দাঁড়ায় মনিরা, ঠোঁটের উপর আংগুল চাপা দিয়ে বলে–চুপ! খবরদার, আমার কথা বলবিনে।
না গো না, বলবো না। কিন্তু এখানে লুকিয়ে কি শুনছো?
সে তুই বুঝবিনে, তুই যা।
নকিব একবার আড়নয়নে মনিরার দিকে তাকিয়ে কক্ষে প্রবেশ করে।
ডাক্তার সেন বলে চলেছেন–আমি বিবর্ণ হয়ে গেলাম। তখন আমার মনের অবস্থা তোমাকে বুঝিয়ে বলতে পারব না। ধীরে ধীরে হাত তুলে বসলাম। যুবক এবার আমার চোখে একটা কালো রুমাল দিয়ে পট্টি বেঁধে দিল। আরও কিছুক্ষণ গাড়ি চলার পর আমাকে গাড়ি থেকে নামিয়ে নেওয়া হল। আমি ভয়ানক ঘাবড়ে গেছি দেখে যুবক আমাকে অভয় দিচ্ছিলো, ভয় নেই, আমি আপনার কোন ক্ষতি করব না।
