নূরী বনহুরের পাশে গিয়ে বসে, তার জামার বোতাম খুলতে খুলতে বলে-মিছে কথা। আমি অন্ধ বুঝি?
নূরী, বনহুর কি মেয়েছেলে, তাই…..
হুর, আমি যে বড় একা। এ গহন বনে তুমি ছাড়া আর আমার কে আছে? নূরীর কষ্ঠে বেদনা ঝরে পড়ে।
বনহুর অবাক হয়ে তাকায় নূরীর মুখে।
নূরী বনহুরের চুলে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলে—এ বনে আসা অবধি আমি তোমাকে সাথীরূপে পেয়েছি, হুর। তুমিই যে আমার সব।
নূরী, তুমি আমাকে ধরে রাখতে চাও?
না, ধনে রাখতে চাইনে, কিন্তু…….
বুঝেছি, আবার যেন ফিরে আসি এ তো? হোঃ হোঃ করে হেসে ওঠে বনহুর—পাগলী আর কি!
না, আমি নই, তুমি পাগল। কিছু বুঝ না, বুঝতে চাও না। এখনও তোমার ছেলেমানুষি গেল না, হুর!
নূরী, এখন বিশ্রাম করবো। তুমি এখন যাও লক্ষ্মী মেয়ে।
বনহুরের কথায় নূরী অভিমানভরে উঠে দাঁড়ায়—আচ্ছা আমি যাচ্ছি। আর তোমাকে বিরক্ত করতে আসবো না।
খপ করে নূরীর হাত ধরে ফেলে বনহুর–রাগ হলো?
আমি রাগ করলে তাতে তোমার কি আসবে যাবে? ছেড়ে দাও আমার হাত।
নূরী, অভিমান করো না। একটু বিশ্রাম করেই আবার আমাকে বেরুতে হবে।
তার মানে, আবার এ রাতেই তুমি বেরুবে?
হ্যাঁ নূরী, আমার অনেক কাজ।
শুধু কাজ আর কাজ, আজ নাই-বা বেরুলে!
তা হয় না নূরী, বেরুতেই হবে।
নূরী ধীরে ধীরে বেরিয়ে গেল।
বনহুর হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে ছিল বিছানায়।
০৬.
গভীর রাত। তাজের পিঠে চড়ে বসলো বনহুর। আজ শরীরে স্বাভাবিক সু, প্যান্ট-কোট-টাই, মাথায় ক্যাপ। পকেটে কিন্তু গুলিভরা রিভলবার।
গহন বন বেয়ে, নিস্তব্ধ প্রান্তরের বুক চিরে ছুটে চললো বনহুরের অশ্ব। ওর পেরিয়ে এক পল্লীতে এসে পৌঁছল বনহুর। এবার গতি অতি মন্থর এর নিল সে। শস্যক্ষেত্রের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চললো। অদূরে দেখা যাচ্ছে ধবধবে সাদা রায়বাহাদুর শ্যামাচরণ মহাশয়ের বাড়ি।
বনহুর এ বাড়ির সামনে গিয়ে অশ্ব থেকে নেমে দাঁড়ালো।
মিঃ শঙ্কর রাও মাথায় হাত দিয়ে বসে ছিল। কি করতে কি ঘটে গেল! এত বড় ফন্দিটাও তার টিকলো না। বরং বেচারা রায়বাহাদূর শ্যামাচরণ এত বড় একটা ক্ষতিগ্রস্ত হলেন। লজ্জায় ক্ষোভে মরিয়া হয়ে উঠলেন শঙ্কর রাও।
পুলিশ মহলে আতঙ্কের সৃষ্টি হলো! মিঃ বশীর আহমদ পর্যন্ত বোকা বনে গেল: কারও মুখে যেন কোন কথা নেই।
সমস্ত পথে-ঘাটে-মাঠে, অলিগলিতে পুলিশ পাহারা রইলো। সন্দেহজনক কাউকে দেখলেই তারা তাকে গ্রেপ্তার করবে। পুলিশমহল থেকে ঘোষণা করে দেয়া হলো, যে দস্যু বনহুরকে জীবিত কিংবা মৃত অবস্থায় ধরে এনে দিতে পারবে, তাকে লাখ টাকা পুরস্কার দেওয়া হবে।
অর্থের লোভে যে যাকে সন্দেহ হলো, ধরে নিয়ে এলো থানায়। একদিন গভীর রাতে কয়েকজন পুলিশ রাস্তায় পাহারা দিচ্ছিলো, এমন সময় একটা পাগল ছেড়া জামাকাপড় পরে আবোল-তাবোল বকতে বকতে চলে যাচ্ছিলো। পুলিশের দৃষ্টি আড়াল হয়ে যাবে, এমন সময় দু’জন পুলিশ ধরে ফেললো তাকে-এ বেটা, কোথায় যাচ্ছিস?
পাগল লোকটা মাথা চুলকাতে আরম্ভ করলো। পুলিশদের সন্দেহ আরও বাড়লো, একজন লাঠি উচিয়ে বসিয়ে দেবে আর কি, এমন সময় একটানে মুখ থেকে দাড়ি আর গোঁফ খুলে ফেলে বলেন পাগল লোকটা—আমি পুলিশ ইন্সপেক্টার মিঃ হারুন।
সঙ্গে সঙ্গে পুলিশরা ‘বেকুফ বনে গেল। লম্বা সেলুট ঠুকে সোজা হয়ে দাঁড়ালো সকলে। হৃৎপিণ্ড তখন ধক ধক করতে শুরু করেছে ওদের। না জানি এর জন্য কপালে কি আছে, এত কষ্টের পুলিশের চাকরিটা না খোয়া যায়।
মিঃ হারুন হেসে বলেন—হ্যাঁ, এই রকম সতর্ক থাকবে। পাগল কিংবা ভিখারী বলেও কাউকে খাতির করবে না। কথা ক’টি বলে চলে গেল ইন্সপেক্টার।
এতক্ষণে পুলিশগুলো হাফ ছেড়ে বাঁচলো।
নূরী একটা খবরের কাগজ হাতে নিয়ে চিন্তিত মনে বসে আছে।
এমন সময় বনহুর এসে দাঁড়ালো তার পাশে। নূরীকে বিষণ্ণ মুখে বসে থাকতে দেখে হেসে বলেন—কি এত ভাবছো বসে বসে?
তোমার যেন কোন ভাবনা নেই! এই দেখ দেখি। খবরের কাগজের একটা জায়গা মেলে ধরলো বনহুরের চোখের সম্মুখে—দেখেছো?
ওঃ তাই বুঝি এত ভাবনা? পরক্ষণেই হেসে ওঠে হাঃ হাঃ করে বনহুর, তারপর বসে পড় নূরীর পাশে।
নূরীর চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ে দু’ফোটা অশ্রু। বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে বলেন–তোমার কি জীবনের এতটুকু ভয় নেই?
ভয়! কিসের ভয় নূরী?
তোমাকে যে জর্বিত কি মৃত ধরে দিতে পারবে, সে লাখ টাকা পাবে।
নূরী, আমার ইচ্ছে হচ্ছে আমি নিজেকে নিজেই ধরিয়ে দিয়ে এক লাখ টাকা গ্রহণ করি।
ছি! তোমার এত টাকার মোহ? টাকা? বনহুর টাকার পাগল নয় নূরী! সে চায় দুনিয়াটাকে দেখতে।
বেশ হয়েছে, অনেক দেখেছো, এবার মানুষ হবার চেষ্টা কর। কেন, আমি কি মানুষ নই?
মানুষ যদি হতে তবে এমন, সব আজগুবি কথা বলতে না। থাক, চল দেখি এবার কিছু খাবে।
বনহুর উঠে দাঁড়ায়—উঁহু, কিছু খাবো না, নূরী। কোথায় যাবে এই ভর সন্ধ্যায়?
প্যান্টের পকেট থেকে কয়েক তোড়া নোট বের করে নূরীর সামনে ধরে—এগুলো মালিককে পৌঁছে দিতে।
তার মানে?
প্যান্টের পকেটে টাকার তোড়াগুলো রাখতে রাখতে বলে বনহুর-ঐ যে সেদিন রায় বাহাদুর শ্যামাচরণ মহাশয়ের নায়েবের কাছ থেকে টাকাগুলো নিয়ে এসেছিলাম তা এখনও মালিকের নিকটে পৌঁছে দেয়া হয়নি।
তুমি আশ্চর্য মানুষ।
কেন?
টাকা আনলেই বা কেন, আবার ফিরিয়ে দেবারই কি প্রয়োজন আছে?
