অর্ধঘণ্টার মধ্যেই সশস্ত্র পুলিশ ফোর্স নিয়ে মিঃ হারুন উপস্থিত হলেন। অন্য পথে এসে হাজির হলেন পুলিশ সুপার স্বয়ং এবং মিঃ হোসেন। মুহূর্তে ডাক্তার সেনের বাড়ি এবং ল্যাবরেটরী পুলিশ বাহিনী ঘেরাও করে ফেলল।
পুলিশ সুপার এবং মিঃ হারুন গুলীভরা রিভলভার হস্তে ক্রুদ্ধ সিংহের ন্যায় ল্যাবরেটরীতে প্রবেশ করলেন। মিঃ আহম্মদ বললেন-কোথায় দস্যু বনহুর?
ডাক্তার সেন তো অবাক! তিনি হতভম্বের মত উঠে দাঁড়ালেন। সমস্ত বাড়ি এবং ল্যাবরেটরীর চারিদিকে পুলিশ বাহিনী দেখে থ’ মেরে দাঁড়িয়ে রইলেন।
মিঃ হারুন গম্ভীর কণ্ঠে গর্জে উঠলেন-দস্যু বনহুর কই?
ডাক্তার সেন উভয়ের উদ্যত রিভলবারের দিকে তাকিয়ে ঢোক গিলে বলেন–কে বললো এখানে দস্যু বনহুর আছে?
শঙ্কর রাও-ও এসেছিলেন মিঃ হারুনের সঙ্গে, তিনি বলেন–আপনার পুত্র মিঃ হেমন্ত সেন পুলিশ অফিসে ফোন করেছিলেন।
কিন্তু….কিন্তু এখানে তো দস্যু বনহুর আসেনি ইন্সপেক্টর।
মিঃ আহম্মদ বজ্রকঠিন স্বরে বলেন–সেকি!
স্যার, আপনারা বসুন, আমি সব বলছি।
আমরা বসতে আসিনি ডাক্তার সেন, বলুন কোথায় দস্যু বনহুর? রাগত কণ্ঠে কথাটা বলেন মিঃ আহম্মদ।
অবশ্য তার রাগ হবার কারণও আছে। তাঁর মত উচ্চপদস্থ অফিসার কোনদিন কোন দস্যুর পিছনে ধাওয়া করেছেন কিনা সন্দেহ। শুধু দস্যু বনহুর তাকে এভাবে ঘাবড়ে তুলেছে। ঐ শয়তানটাকে ধরার জন্য আজ তিনি নিজে নেমে পড়েছেন।
মিঃ আহম্মদের চোখ দিয়ে যেন অগ্নিস্ফুলিঙ্গ নির্গত হচ্ছে। ডাক্তার সেন ভড়কে গেলেন, কণ্ঠে মিনতি মেখে বলেন–বসুন, আমি সব খুলে বলছি।
মিঃ হারুন, মিঃ আহম্মদকে লক্ষ্য করে বলেন–স্যার, ব্যাপারটা রহস্যজনক মনে হচ্ছে।
মিঃ আহম্মদ আসন গ্রহণ করলেন। ডাক্তার সেনও আর একটি চেয়ারে বসে রুমালে মুখ মুছতে লাগলেন।
মিঃ হারুন, মিঃ হোসেন এবং অন্যান্য সকলে দাঁড়িয়ে রইলেন।
ডাক্তার সেন রাতের ঘটনা বিস্তারিত সব বলে গেলেন এবং দস্যু বনহুরের দেওয়া পাঁচ হাজার টাকা এবং সেই ছোট্ট কাগজের টুকরাখানা বের করে দেখালেন।
সব শুনে এবং দেখে বিস্ময়ে থ’ বনে গেলেন সবাই। মিঃ আহম্মদ বলেন–ডক্টর সেন, আপনি কোন ক্রমেই সেই পথ চিনে নিতে পারেন নি?
না, একে অন্ধকার রাত, তদুপরি আমার চোখ কালো কাপড়ে মজবুত করে বাঁধা ছিল। সে বাড়ি যে শহরের কোন প্রান্তে বা কোন স্থানে, আমি কিছুই বলতে পারবো না। গাড়ি থেকে নামিয়ে ওরা আমাকে ঘোড়ার পিঠে চাপিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। সে এক অদ্ভুত বাড়ি। বিরাট রাজপ্রাসাদের মত বাড়িটা। অমন সুন্দর বাড়ি আমি কোনদিন দেখিনি।
মিঃ আহম্মদ বলেন–ডক্টর সেন, দস্যু বনহুরের চিঠিতে জানতে পেরেছি, সে আপনার গাড়ি ফেরত দিতে আসবে।
শঙ্কর রাও বলে উঠেন-স্যার, সে তো নিজে আসবে না।
হ্যাঁ, সে নিজে আসবে না; আর আসবেই বা কেমন করে; সে তো আহত। নিশ্চয়ই তার কোন অনুচর আসবে।
শঙ্কর রাও পুনরায় বললেন-কৌশলে সেই অনুচরটিকে যদি বন্দী করা যায় তাহলে ওর মুখেই দস্যু বনহুরের আস্তানার খবর বের করে নেওয়া যাবে।
এমন সময় বাইরে মোটরের হর্ণ শোনা যায়।
অল্পক্ষণেই কক্ষে প্রবেশ করেন পুলিশ সাব-ইন্সপেক্টর মিঃ মাকসুদ। লম্বা সেলুট ঠুকে বললেন-স্যার, আপনি আমাকে ডেকেছেন?
মিঃ হারুন বললেন-না তো, আপনাকে ডাকা হয়নি!
তবে যে ডাক্তার সেনের ড্রাইভার তার গাড়ি নিয়ে আমাকে আনতে গিয়েছিল?
ডাক্তার সেন বিস্ময়ভরা চোখে নিজের পাশে তাকিয়ে বলেন–এই তো আমার ড্রাইভার রজত।
মিঃ আহম্মদ উঠে দাঁড়ান-দেখুন ইন্সপেক্টর, শীঘ্র গাড়ির ড্রাইভারকে গ্রেপ্তার করে ফেলুন। নিশ্চয়ই ড্রাইভারের ছদ্মবেশে দস্যু বনহুরের অনুচর।
সবাই ছুটলেন গাড়ির পাশে।
কিন্তু গাড়ির নিকটে পৌঁছে সবাই হতবাক, গাড়িতে কোন ড্রাইভার বা কোন লোক নেই।
কয়েকজন সশস্ত্র পুলিশ বাইরে তখনও গুলীভরা রাইফেল হস্তে দণ্ডায়মান ছিল। মিঃ হারুন তাদের জিজ্ঞাসা করলেন-এ গাড়ির ড্রাইভার কোথায় গেল দেখেছো তোমরা?
ওদের একজন বললো–হ্যাঁ হুজুর আভি থা, লেকেন ওধার গেয়া…পেসাব-ওসাব করনে কে লিয়ে….
কিন্তু কোথায় কে-সব জায়গা তন্নতন্ন করে খোঁজা হলো-কোথায় দস্যু বনহুরের অনুচর!
ডাক্তার সেন সকলের সঙ্গে বাইরে বেরিয়ে এসেছিলেন।
মিঃ হারুন জিজ্ঞাসা করলেন-এটাই আপনার গাড়ি?
ডাক্তার সেন স্থির স্বাভাবিক গলায় বললেন– হ্যাঁ, এটাই আমার গাড়ি।
সকলের মুখেই হতাশার ছায়া ফুটে উঠে।
দস্যু বনহুরের নিকটে এ একটি দারুণ পরাজয়।
মিঃ আহম্মদ নিজের গাড়িতে উঠে বসলেন।
মিঃ হারুন এবং মিঃ হোসেন তাঁদের নিজ নিজ গাড়িতে ফিরে চললেন। সকলের মুখই গম্ভীর থমথমে, আষাঢ়ে মেঘের মতই অন্ধকার।
এতোক্ষণে ডাক্তার সেনের মুখে হাসি ফুটলো। এক রাতেই পাঁচ হাজার টাকা আর গাড়িখানাও ফেরত পেলেন-এ কম কথা নয়!
.
অবসন্ন দেহে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিলো নূরী, খেয়াল নেই। চোখ মেলে তাকিয়ে আশ্চর্য হলো-বনহুরের বিছানা শূন্য; বিছানায় বনহুর নেই। নূরী চিন্তিত হলো, অসুস্থ অবস্থায় কোথায় গেল সে।
নূরী ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালো। মাথাটা কেমন ঝিমঝিম করছে। মন্থর গতিতে বেরিয়ে এলো বাইরে। মুক্ত আকাশের তলায় এসে দাঁড়ালো। হঠাৎ দেখতে পেলো বনহুর একটি পাথরখণ্ডে বসে রহমানের সঙ্গে কি সব আলোচনা করছে।
