নূরীর হৃদয়ে এক অভূতপূর্ব শিহরণ বয়ে যায়। আজ পর্যন্ত বনহুর নূরীকে কোনদিন এভাবে আকর্ষণ করেনি। আনন্দ আপ্লুত নূরীর দু’চোখ ছাপিয়ে পানি আসে।
বনহুর স্নেহ-বিজড়িত কণ্ঠে বলে–এ ড্রেসে কোথায় যাচ্ছো নূরী?
ডাক্তার ডাকতে।
কিন্তু ডাক্তার এখানে এসে ফিরে যেতে পারবে?
ভয় নেই, তোমার আস্তানার সন্ধান সে জানতে পারবে না। ছেড়ে দাও হুর, দেরী হয়ে গেল।
বনহুর ওকে ছেড়ে দেয়। দ্রুত বেরিয়ে যায় নূরী। বাইরে গিয়ে দেখতে পায় রহমান দুটো অশ্ব নিয়ে অপেক্ষা করছে।
নূরী রহমানকে লক্ষ্য করে বলে–রহমান, খুব দ্রুত কাজ করতে হবে। রাত ভোর হবার পূর্বেই ডাক্তার যেন তার নিজ বাড়ি ফিরে যেতে পারে।
আচ্ছা, তাই হবে।
দুটি অশ্বে দুজন চড়ে বসে। অন্ধকারে অশ্ব দুটি ছুটতে শুরু করে।
পথিমধ্যে রহমান ভেবে নেয় কোন ডাক্তারকে হলে তাদের ভালো হয়। তাই বিলম্ব হয় না। শহরের বিশিষ্ট ডাক্তার জয়ন্ত সেনের নিকটে যাওয়াই ঠিক করলো।
বনের শেষ প্রান্তে তাদের মোটর গাড়ি প্রতীক্ষা করছিল। ঘোড়া দুটি গোপন স্থানে বেঁধে রেখে গাড়িতে উঠে বসে ওরা দুজন।
অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই তাদের গাড়ি ডাক্তার সেনের গাড়ি বারান্দায় গিয়ে পৌঁছল। রহমানই ড্রাইভ করছিল, রহমানের শরীরেও ছিল ড্রাইভারের ড্রেস। রহমান গাড়ি থেকে নেমে দরজার পাশে গিয়ে কলিং বেলে হাত রাখলো। অল্পক্ষণের মধ্যেই দরজা খুলে সম্মুখে এসে দাঁড়াল একটি লোক। হয়তো বাড়ির চাকর-বাকর হবে। লোকটা জিজ্ঞাসা করলো–আপনারা কাকে চান?
নূরী ব্যস্তকণ্ঠে বললো–ডাক্তার বাবুকে ডেকে দাও। একটু তাড়াতাড়ি, বুঝলে?
কিন্তু তিনি তো রাতে কোন রোগী দেখেন না। লোকটি বললো।
ডাক্তার বাবুকে ডেকে দাও, তিনি যা করেন–করবেন।
কি বলবো? আপনারা কোথা থেকে এসেছেন?
কিছু বলতে হবে না; শুধু বলবে, একটি যুবক আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চান।
এবার লোকটা একবার যুবকের মুখে আর একবার তার গাড়িখানার দিকে তাকিয়ে চলে যায়।
অল্পক্ষণেই পুনরায় লোকটি ফিরে এসে বলে–আসুন, ভিতরে এসে বসুন।
নূরী লোকটার পিছু পিছু হলঘরে গিয়ে দাঁড়ায়, তারপর করুণ কণ্ঠে বলে–দেখ, একটু তাড়াতাড়ি ডাক্তার বাবুকে ডেকে দাও।
এই যে এলেন বলে–আপনি বসুন। তারপর নিজ মনেই বলে চলে লোকটা-এই রাত দুপুরে রোগী। বাপরে বাপ, রাতেও একটু নিশ্চিন্তে ঘুমোতে দেবে না বাবা।
ততক্ষণে কক্ষে প্রবেশ করেন ডাক্তার সেন। মধ্যবয়স্ক গম্ভীর প্রকৃতির লোকটি। স্লিপিং গাউনের বেল্ট বাঁধতে বাঁধতে এসেছেন তিনি। নূরীকে দেখে বলেন–যুবক, তুমি কি জানো না
আমি রাতে রোগী দেখি না?
জানি, কিন্তু এক্সিডেন্ট হয়েছে….
এক্সিডেন্ট! যুবক, তুমি তো দিব্যি দাঁড়িয়ে আছ– তোমার কি হয়েছে?
ডাক্তারবাবু, আমার নয়-আমার বড় ভাই এক্সিডেন্ট হয়েছে। না গেলেই নয়, দয়া করে একটিবার চলুন-চলুন ডাক্তার বাবু…নূরীর গণ্ড বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে।
কি বললে, তোমার এক্সিডেন্ট নয়? তোমার ভাই-এর-আমি যাব এই রাতদুপুরে বাইরে রোগী দেখতে!
নূরী ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে ডাক্তার বাবু, না গেলেই নয়। নইলে ওকে বাঁচানো যাবে না। ডাক্তার বাবু চলুন, দয়া করে চলুন। ডাক্তার বাবু…
অসম্ভব। রাতে আমি কোথাও যাই না।
আপনার পায়ে পড়ি ডাক্তার বাবু, চলুন…নূরী কাঁদতে থাকে। ডাক্তারের মনে হয়তো মায়ার উদ্রেক হয়। দেয়াল ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে বলেন–এখন রাত চারটে; আর ঘণ্টা দুই কিংবা তিন পরে গেলে চলবে না?
না, ডাক্তার বাবু না, আপনি দয়া করে এক্ষুণি চলুন। আপনার পায়ে পড়ি ডাক্তার বাবু।
ডাক্তার সেন দেখলেন না গেলেই নয়, যুবকটি নাছোড়বান্দা হয়ে ধরেছে। এবার বলেন তিনি-রাতে কোথাও রোগী দেখি না বা কলে যাই না। ফি কিন্তু ডবল দিতে হবে।
তাই দেব, তাই দেব ডাক্তার বাবু, কত চান আপনি?
দু’শো টাকা দিতে হবে।
বেশ, তাই পাবেন।
ডাক্তার সেন বলেন, রোগীর শরীর থেকে প্রচুর রক্তপাত হয়েছে?
হ্যাঁ ডাক্তার বাবু, রোগীর শরীর থেকে প্রচুর রক্তপাত হয়েছে।
তাহলে তো রক্তের প্রয়োজন?
রক্ত-সে চিন্তা করবেন না ডাক্তার বাবু, আমি-আমিই দেব রক্ত।
কিন্তু রোগীকে এখানে আনতে পারলে সব বিষয়ে সুবিধা হতো।
না না, সে রকম কোন উপায়ই নেই। রোগী অত্যন্ত কঠিন। যা-যা প্রয়োজন নিয়ে চলুন। ডাক্তার বাবু, আমার গাড়িতেই আপনাকে পৌঁছে দেব।
বেশ, তাই হবে। কিন্তু অনেক কিছু নিতে হচ্ছে।
তাই নিন, কোন অসুবিধা হবে না।
ডাক্তার সেন তাঁর প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র এবং ঔষধাদি নিয়ে নূরীর গাড়িতে চড়ে বসলেন।
ডাক্তার সেনকে নিয়ে নূরীর গাড়ি ডবল স্পীডে ছুটে চলেছে। রহমান গাড়ি চালাচ্ছে।
ডাক্তার সেন বললেন-কত দূর হবে?
নূরী জবাব দিল-একটু দূরেই হবে ডাক্তার বাবু। আপনি নিশ্চিন্ত হউন, কোন ভয় নেই।
ডাক্তার সেন একটি সিগারেটে অগ্নিসংযোগ করে ভালোভাবে ঠেস দিয়ে বসেন।
গাড়ি তখন আঁকাবাঁকা পথ ধরে ছুটে চলেছে।
নূরী ধীরে ধীরে প্যান্টের পকেটে হাত দিয়ে রিভলবার খানা বের করে নেয়। তারপর হঠাৎ অতর্কিতভাবে চেপে ধরলো ডাক্তার সেনের পাঁজরে-ডাক্তার বাবু, ভয় নেই, কিন্তু এবার আপনার চোখে রুমাল বাধতে হবে।
ডাক্তার সেনের হাত থেকে অর্ধদগ্ধ সিগারেটটা খসে পড়লো। দুহাত তুলে ধরলো উপরের দিকে। ভয়াতুর চোখে তাকালেন নূরীর মুখের দিকে, ঢোক গিলে বলেন–যুবক, তোমার মতলব?
