মেয়েরা সবাই মৃদু হেসে বেরিয়ে গেল।
চাচীমা দরদভরা গলায় বললেন–আহা, মার আমার মুখখানা শুকিয়ে গেছে। সেই সাত সকালে বজরায় চেপেছে। চলো মা, চলো, গোসল করে চারটা খাবে চল।
আমার ক্ষিদে নেই, গোসল করতে হবে না। গম্ভীর কণ্ঠে বলল মনিরা।
অবাক কণ্ঠে বললেন চাচীমা–সে কি বাছা, গোসল করবে না, ক্ষিদেও নেই–এ তুমি কি বলছ?
মনিরা কোনো কথা বলল না।
চাচীমা আবার বললেন–চলো মা, লক্ষীটি, চলো। বিয়ের সময় হয়ে এলো বলে…..
চমকে ওঠে ভয়ার্ত কণ্ঠে বলে মনিরা–বিয়ে! কার বিয়ে?
সেকি মা, তোমার বড় চাচা তোমাকে কিছু বলেন নি? ও, তুমি লজ্জা পাবে তাই বুঝি উনি বলেন নি। শোনো মা–শহীদের সঙ্গে তোমার বিয়ে।
শহীদ! কে শহীদ?
ওমা, সেকি, শহীদকে চেন না? আমাদের ছেলে শহীদ। ঐ যে তোমার সঙ্গে খেলা করত। অবশ্য তোমার চেয়ে বছর সাত-আট বড় হবে আমার শহীদ। কিন্তু শরীরটা যা ওর রোগাটে, তাই। এতটুকু হয়ে আছে। দেখলে মনে হয় এখনও বিশ বছর হয় নি। দাড়িগোঁফের নামগন্ধ নেই– বাছার আমার মেয়েদের মত সুন্দর ফুটফুটে মুখ। ঐ তো ওকে মেয়েরা সব গোসল করাচ্ছে
এমন সময় শোনা যায় একটা মহিলার কণ্ঠস্বর-বড় আম্মা, এসো, শহীদ ভাই কথা শুনছে না, শুধু শুধু পানি মাথায় ঢালছে। শিগগির এসো–
চাচীমা হেসে বললেন–দেখ, এখনও তার ছেলেমি যায় নি। যাই দেখি। বেরিয়ে যান চাচীমা।
মনিরা জানালা দিয়ে উঁকি দিয়ে দেখে। একটা বাচ্চা ছেলেকে দেখতে পেয়ে হাতের ইশারায় ডাকে–এই শোনো।
বাচ্চা ছেলেটা অবাক হয়ে কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থাকে, তারপর এগিয়ে আসে কি বলছ?
তোমার নাম কি?
ছেলেটা জবাব দেয়–আমার নাম মামুন।
খুব সুন্দর নাম তো তোমার। এই শোনো, এ বাড়িতে কার বিয়ে জান?
বা রে জানি না? আমার মেজো ভাইয়ার বিয়ে?
মেজো ভাইয়া?
হ্যাঁ, শহীদ ভাইয়ার বিয়ে তোমার সাথে, তুমি যে আমাদের ভাবী হবে—
মামুনের কথায় রাগ হয় মনিরার, ঠাস করে একটা চড় বসিয়ে দেয় সে তার গালে।
আচমকা চড় খেয়ে মামুন ভ্যা করে কেঁদে ওঠে। সঙ্গে সঙ্গে ছুটে আসে চাচীমা, আরও কয়েকজন মহিলা কি হল কি হল করে।
চাচীমা বললেন কি হয়েছে রে মামুন?
আংগুল দিয়ে মনিরাকে দেখিয়ে বলে– ভাবী মেরেছে।
অমনি মনিরা কঠিন কণ্ঠে বলে ওঠে– খবরদার, আবার যদি ভাবী বলবি।
গালে হাত রাখেন চাচীমা ওমা সেকি গো! এই তো একটু পরে কলেমা পড়ে শহীদের বৌ। হবে। ভাবী নয় তো কি?
চাচীমা, এসব কি বলছেন আপনারা? বিয়ে আমি এখন করব না।
অবাক কণ্ঠে বললেন চাচীমা করব না বললেই হলো। তোমার বড় চাচা তোমাকে তাহলে এমনি এমনি নিয়ে এলেন?
তা তিনি যা মনে করেই আনুন না কেন, বিয়ে আমি করব না।
করতে হবে। কথাটা বলতে বলতে কক্ষে প্রবেশ করেন বড় চাচা। দু’চোখে আগুন ঠিকরে বের হচ্ছে। কঠিন কণ্ঠে বলেন– তোমার কোন আপত্তি শুনব না মনিরা।
মনিরা তেমনি দৃঢ়কণ্ঠে জবাব দেয়– আপনি যতই বলুন, বিয়ে আমি করব না। মামুজানকে আপনি লোভী স্বার্থপর বলে অপবাদ দিচ্ছিলেন, এখন বুঝতে পারছি কেন আপনি আমাকে জোর করে নিয়ে এলেন আমাকে হাতের মুঠায় এনে আমার সমস্ত বিষয় আশয় আত্মসাৎ করতে চান। আপনার পাগল ছেলের সঙ্গে আমার বিয়ে দিয়ে আমাকে জীবন্ত হত্যা করতে চান। কিন্তু মনে রাখবেন, আপনার এ কুমতলব সিদ্ধ হবার নয়। প্রাণ গেলেও আমি শহীদকে স্বামী বলে মেনে নিতে পারব না।
তা আয়োজন আমার পণ্ড করে দিতে চাও? মনে রেখ মনিরা, দুনিয়া পাল্টে যেতে পারে তবু। তোমাকে আমি পুত্রবধু করবোই। আমার ছোট ভাইয়ের ধন-সম্পদ আমি কারও হাতে তুলে দিতে পারি না–বেরিয়ে যান আসগর আলী সাহেব।
গোটা দিন কেটে গেল মনিরা দানাপানি মুখে দিল না। সন্ধ্যার পর বিয়ে হবে, কিন্তু মনিরা বেঁকে বসলো, বলল–দুটো দিন সময় দিন বড় চাচা, তারপর আপনি যা বলবেন শুনব।
অগত্যা আসগর আলী সাহেব মনিরার কথায় রাজি হলেন, সেদিনের মত বিয়ে স্থগিত রইল।
.
বনহুর তার পাতালপুরীর গোপন আস্তানায় গা ঢাকা দিয়ে রইল বটে, কিন্তু রাতের অন্ধকারে তাজকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ত। পুরোদমে চলল তার দস্যুবৃত্তি।
এর টাকা-পয়সা ওর, অলঙ্কার আর ধনরত্ন লুটে নিয়ে স্তূপাকার করতে লাগল সে তার। পাতালপুরীর রত্নাগারে। দস্যু বনহুর যেন প্রলয় কাণ্ড শুরু করেছে।
পুলিশমহলে আবার সাড়া পড়ল।
দেশবাসীর মনে আতঙ্কের ছায়া ঘনিয়ে ওঠে। কেউ নিশ্চিন্ত মনে দিন কাটাতে পারছে না। সবাই দস্যু বনহুরের ভয়ে আড়ষ্ট।
মিঃ জাফরী, মিঃ হারুন দস্যু বনহুরের আস্তানা ধ্বংস করে মনে মনে খুশি হয়েছিলেন। কিন্তু যখন তারা দেখলেন দস্যু বনহুরের আস্তানা ধ্বংস এবং তার কিছু সংখ্যক অনুচরকে নিহত করে। কোনই লাভ হয় নি বরং দস্যু বনহুরকে ক্ষেপানো হয়েছে তখন একটু ঘাবড়ে গেলেন।
মিঃ মুঙ্গেরী অনেক কষ্টে এই আস্তানার সন্ধান লাভ করেছিলেন। এই আস্তানার সন্ধান করতে গিয়ে কতদিন তার না খেয়ে কেটেছে। কতদিন তাঁকে অনিদ্রায় কাটাতে হয়েছে। গহন বনে লুকিয়ে লুকিয়ে চলাফেরা করতে অনেক বিপদে পড়তে হয়েছে, এমনকি প্রাণের মায়া বিসর্জন দিয়ে তবেই মিঃ মুঙ্গেরী দস্যু বনহুরের আস্তানার খোঁজ পেয়েছিলেন। কিন্তু তার সকল প্রচেষ্টা। ব্যর্থ হয়েছে। দস্যু বনহুরের আস্তানা ধ্বংস হলেও তার যে কোন ক্ষতি হয় নি বেশ বুঝা যায়।
