মরিয়ম বেগম কিন্তু মনের দুঃখ প্রকাশ না করে নিজের সাধ্যমত আদর যত্ন করতে লাগলেন। মরিয়ম বেগমের ব্যবহারে সন্তুষ্ট হলেন আসগর আলী সাহেব। কিন্তু তিনি এতক্ষণও মনিরাকে না দেখতে পেয়ে চঞ্চল হলেন। মরিয়ম বেগমকে জিজ্ঞেস করলেন–ভাবী, মনি কোথায়? ওকে তো দেখছি না?
মরিয়ম বেগম বললেন-শরীরটা খারাপ, তাই শুয়ে আছে।
গম্ভীর হয়ে পড়লেন আসগর আলী সাহেব, বললেন-শরীর খারাপ আজই হলো, না আগে থেকেই ছিল?
আমতা আমতা করে বললেন মরিয়ম বেগম-হঠাৎ আজ কদিন ওর শরীরটা…
খারাপ যাচ্ছে, এই তো? মনে হয় আমার চিঠি পাবার পর থেকে। কিন্তু মনে রাখবেন ভাবী, ওকে আমি নিয়ে যাবই। আমার ছোট ভাইয়ের মেয়ে, আপনার চেয়ে ওর ওপর আমার দায়িত্ব অনেক বেশি।
তা জানি। কিন্তু….
কিন্তু নয়, এখন মনিরা আগের মত কচি খুকী নেই। বয়স হয়েছে, বিয়ে দিতে হবে।
তা ঠিক।
আপনিই বলুন তাকে এখন এভাবে যেখানে সেখানে ফেলে রাখা যায়?
অস্ফুট আর্তনাদ করে ওঠেন মরিয়ম বেগম–যেখানে সেখানে….এ আপনি কি বলছেন?
যা বলছি সত্য কথা। এতদিন মনিরা নাবালিকা বলে তাকে আপন বানিয়ে ভুলিয়ে রেখেছেন, এমন কি তার বাবার বিশাল ঐশ্বর্য ভোগ করে আসছেন–
এসব আপনি বলছেন আলী সাহেব, মনিরার ঐশ্বর্য আমরা ভোগ করে আসছি?
তা নয় তো কি? মনিরার বিশাল ধন-সম্পদ এখন কাদের হাতের মুঠায়? চৌধুরী সাহেব নিজেই আত্মসাৎ করে নেন নি?
না। তিনি পরের ঐশ্বর্যের কাঙ্গাল ছিলেন না।
হাঃ হাঃ করে হেসে উঠলেন আসগর আলী সাহেব–একথা আর কেউ বিশ্বাস করলেও আমি বিশ্বাস করি না। মনিরাকে এবং তার মাকে এখানে নিয়ে আসার পেছনে কি ঐ একটিমাত্র কারণ নেই–আমার ছোট ভাইয়ের ধন-সম্পদ? চৌধুরী সাহেব সরলতার ভান করে মনিরা আর তার মায়ের সব লুটে নেন নি আপনি বলতে চান?
মরিয়ম বেগম স্তব্ধ হয়ে যান, কোন কথাই তিনি আর বলতে পারছেন না। কে যেন তার কণ্ঠনালী টিপে ধরেছে। পাথরের মূর্তির মত নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে থাকেন।
আসগর আলী সাহেব বলেই চলেছেন-মনিরার বাবা বেঁচে থাকলে পারতেন এসব করতে?
ঠিক সেই মুহূর্তে দমকা হাওয়ার মত কক্ষে প্রবেশ করে মনিরা–বড় চাচা বলে আমি আপনাকে ক্ষমা করবো না। দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে আমি সব শুনেছি। ছিঃ ছিঃ ছিঃ লজ্জা করে না আপনার এসব বলতে?
মনিরাকে হঠাৎ এভাবে কক্ষে প্রবেশ করতে দেখে প্রথমে আশ্চর্য, পরে রাগান্বিত হন আসগর আলী সাহেব। গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে থাকেন।
মনিরা বলে চলে-আমার মামুজান আপনার মত লোভী ছিলেন না। আমার ঐশ্বর্যের চেয়ে তার হৃদয় অনেক বড় ছিল। সেখানে ধন-সম্পদের মত তুচ্ছ জিনিসের কোন দাম ছিল না। আমি জানি, মামুজান আমার ঐশ্বর্যের এতটুকু নষ্ট করেন নি। বরং এতদিন আপনার নিকটে থাকলে….
বিনষ্ট হত, তাই বলতে চাও?
হ্যাঁ, আমাকেও হয়তো পথে দাঁড়াতে হত।
মনিরা!
বড় চাচা, আমি জানতাম না আপনার মন এত নিচু, এত ছোট।
মরিয়ম বেগম বলে ওঠেন–মনিরা, সাবধানে কথা বল, উনি তোমার গুরুজন।
উনি নিজের সম্মান বাঁচিয়ে চলতে না পারলে আমি কি করতে পারি? উনি যে আমার বড়। চাচা, ভাবতেও ঘৃণা বোধ করছি। আমার শরীরে ওদের রক্ত প্রবাহিত, একথাই আমি ভাবতে পারি না। অনেক দিন আমি উনাকে দেখিনি, উনাকে আমার তেমন করে মনেও পড়ে না। এতদিন একটিবার খোঁজ-খবর নিয়েও জানেন নি যে, আমি বেঁচে আছি না মরে গেছি-আজ এসেছেন বড় চাচার দাবি নিয়ে! এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলল মনিরা।
আসগর আলী সাহেবের দু’চোখে যেন আগুন ঠিকরে বের হচ্ছে। তিনি চিৎকার করে উঠলেন-সমস্ত শেখানো কথা। ভাবী, এসব মনিরাকে আপনি….
এই তো একটু আগেই আপনি মামীমার কাছে বললেন মনিরা এখন আগের মত কচি খুকী নেই। সত্যিই আমি আগের মত সেই ক্ষুদ্র বালিকা নই, নিজের ভালমন্দ বুঝবার মত জ্ঞান আমার আছে। আপনি আমার গুরুজন হতে পারেন কিন্তু অভিভাবক নন।
মনিরা, তুমি যতই আমাকে অস্বীকার কর কিন্তু আমি তোমার বাবার বড় ভাই।
তা জানি।
আমি এসেছি তোমাকে নেবার জন্য।
কেন?
বয়স তোমার কম হয় নি। তুমি আমাদের বংশের মেয়ে। তোমার কলঙ্ক আমাদের মুখে চুনকালি মাখাবে।
আমি তেমন কিছু করিনি যা আপনাদের মুখে চুনকালি দিতে পারে।
করনি? তোমার মামার ছেলে দস্যু বনহুরকে তুমি স্বামী বলে গ্রহণ করতে চাও নি?
চেয়েছি। এতে আপনাদের মুখে চুন কালি পড়ার কথা নয়।
না, একটা দস্যুর সঙ্গে তোমার বিয়ে হতে পারে না।
আমার বিয়ে যেখানে খুশি হউক বা না হউক তাতে আপনার কিছু আসে যায় না।
মানে?
মানে আপনাকে বুঝিয়ে বলতে চাই না।
তুমি ঐ দস্যু-চোর-ডাকু লম্পটকে….
হ্যাঁ, আমি তাকেই স্বামী বলে গ্রহণ করব। একটি কথা আপনি ভুল বুঝছেন–সে দস্যু বটে–কিন্তু চোর বা লম্পট নয়।
আবার হেসে ওঠেন আসগর আলী সাহেব, ব্যঙ্গপূর্ণ হাসি, তারপর বললেন-যার কুৎসা সারা দেশময়, লোকের মুখে মুখে যার বদনাম
বদনাম নয় বড় চাচা-সুনাম! দস্যু বনহুরের জন্য আজ দেশবাসী পরাধীনতার পঙ্কিলতা থেকে মুক্তি পেয়েছে। দেশের জন্য সে যতখানি ত্যাগ স্বীকার করেছে, কেউ ততখানি পেরেছে?
ওসব জানতে চাই না মনিরা। আমি বলছি, কিছুতেই একটা দস্যুর সঙ্গে তোমার বিয়ে হতে পারে না। তুমি নিজে যেতে না চাইলে আমি তোমাকে জোর করে নিয়ে যেতে বাধ্য হব।
