একটু পরেই ফিরে আসে–আপামনি, উনি বলছেন খুব জরুরি কথা আছে, আপনার সঙ্গে দেখা না করলেই নয়।
মনিরা বিপদে পড়ল। অবশ্য মনিরার পক্ষে এ দেখা করা ব্যাপার তেমন কিছু নয়। কিন্তু আজ মনিরার মন ভাল ছিল না, তাছাড়া বাড়িতে আজ কেউ নেই, সরকার সাহেবও একটু আগে কোন কাজে গেছেন, নকিবটা রয়েছে, সেও রান্নাঘরে। যাক, ওসব চিন্তা করে লাভ নেই। ভয় কি, তিনি তো আর এমন কোন লোক নন, একজন ভদ্রসন্তান। নিশ্চয়ই তার সঙ্গে কোন অসৎ ব্যবহার করবেন না। উঠে দাঁড়াল মনিরা– যা বলগে আমি আসছি। এই শোন ভেতরে বৈঠকখানায় বসাবি, বুঝলি?
বুঝেছি আপামনি। চলে যায় বাবলু।
ভেতর বৈঠকখানায় প্রবেশ করতেই মিঃ আলম মাথার ক্যাপটা খুলে মনিরাকে অভিবাদন জানালেন।
মনিরা শান্তকণ্ঠে বলল–বসুন।
একটু হেসে বলেন মিঃ আলম– অসময়ে বিরক্ত করলাম বলে…..
না না, সময় আর অসময়ের কি আছে? যে অবস্থায় পড়েছি তাতে,
হাঁ, একটু বিরক্ত হতে হবে বৈকি। মনিরাকে কথা শেষ করতে না দিয়েই বলে ওঠেন– মিঃ আলম।
মিঃ আলম আসন গ্রহণ করার পরও মনিরা আসন গ্রহণ করে না। সে একপাশে দাঁড়িয়ে প্রশ্নভরা দৃষ্টি তুলে ধরে মিঃ আলমের মুখে।
মিঃ আলমও একটা সিগারেটে অগ্নিসংযোগ করে একরাশ ধোয়া সামনে ছুঁড়ে দিয়ে বললেন–মিস মনিরা, আমি আজ একটা জরুরি কথা জানতে এসেছি।
বেশ বলুন।
বসুন না, এমন করে দাঁড়িয়ে রইলেন কেন?
বলুন কি জানতে চাচ্ছেন?
বসতে সঙ্কোচ করছেন– আমি গোয়েন্দা বিভাগের লোক বলে আমাকে বিশ্বাস করতে পারছেন না বুঝি?
না না বসছি। মনিরা মুখে সঙ্কোচ না করলেও মনে মনে একটু অস্বস্তি বোধ করছিল। এই নির্জন দ্বিপ্রহরে একলা একজন যুবকের পাশে, তবু বাবলুটা রয়েছে বলে ভরসা হয় মনিরার। অবশ্য এ দুর্বলতার কারণ আছে। মনিরা এখন যে অবস্থায় উপনীত হয়েছে সে অবস্থায় সবাই এমনি হবে।
চারদিকে তার বিপদের বেড়াজাল। একদিন মনিরা সবাইকে নিঃসঙ্কোচে বিশ্বাস করত, কিন্তু আজ সে কাউকে বিশ্বাস করতে পারে না। সবাই যেন আজ তাদের শত্রু, কেউ যেন তাদের মঙ্গল। চায় না।
মিঃ আলম বললেন– কি ভাবছেন মিস মনিরা?
কই কিছু না। আপনি যা জিজ্ঞাসা করতে চান, করতে পারেন।
দেখুন মিস মুনিরা, সবাই আপনাদের সম্বন্ধে যাই বলুক আমি তা বিশ্বাস করি না, মানুষের ধারণা এক কিন্তু ঘটনা অন্যরকম হয়। আমি পুলিশের রিপোর্টে জানতে পেরেছি আপনি দস্যু বনহুরকে ভালবাসেন এবং সেই কারণে দস্যু বনহুরও এখানে আসে–মানে আপনাদের এই বাড়িতে তার আগমন হয়।
এ কথাই কি আপনি জানতে এসেছেন?
না মিস মনিরা, আমি জানতে চাই, চারদিকে অন্ধের মত হাতড়ানোর চেয়ে আমরা অতি সহজেই চৌধুরী সাহেবের হত্যারহস্য ভেদ করতে পারব, যদি আপনি সঠিক জবাব দেন।
হাঁ, তাকে আমি ভালবাসি।
আপনার মত উচ্চশিক্ষিতা মেয়ে একটা নগণ্য দস্যুকে ভালবাসতে পারে, আশ্চর্য!
না, সে নগণ্য নয়। দস্যু সে হতে পারে কিন্তু হৃদয় তার অনেক বড়। আমার-আপনার মনের চেয়ে অনেক উঁচু তার মন।
ও, আপনি দেখছি তার প্রেমে একেবারে মুগ্ধ, অভিভূত!
মনিরা নীরব।
বাবলু একপাশে দাঁড়িয়েছিল, কারণ মনিরা তাকে কক্ষে থাকার জন্য ইংগিত করেছিল।
মিঃ আলম বাবলুকে লক্ষ্য করে বললেন-এক গেলাস পানি নিয়ে এসো।
বাবলু বেরিয়ে গেল।
মনিরার বুকটা হঠাৎ যেন ধক্ করে উঠল। বাবলু বেরিয়ে যাওয়ায় কেমন যেন অস্বস্তি বোধ করতে লাগল সে।
মিঃ আলম একটু ঝুঁকে মনিরার কানের কাছে মুখ নিয়ে বললেন-মিস মনিরা, আপনি সত্য কথা বললে আমি আপনাকে বাঁচিয়ে নিতে চেষ্টা করবো।
এ আপনি কি বলছেন, বুঝতে পারছি না?
আপনি নিশ্চয়ই জানেন চৌধুরী সাহেবের হত্যারহস্য। চৌধুরী সাহেবের হত্যার পেছনে দস্যু বনহুরের অদৃশ্য ইংগিত রয়েছে, এ কথা আপনি জানেন।
আপনার অনুমান মিথ্যা। আপনি যেতে পারেন, আমি আর এক মুহূর্ত এখানে বিলম্ব করব না। উঠে পড়ে মনিরা।
সঙ্গে সঙ্গে মিঃ আলম মনিরার হাত মুঠোর মধ্যে চেপে ধরে-বসুন, আরও কথা আছে।
মনিরার হাত স্পর্শ করার সঙ্গে সঙ্গে মনিরা ক্রুদ্ধ ভুজঙ্গিনীর ন্যায় ফোস্ করে ওঠে হাত ছাড়ুন।
মিঃ আলম হাত ছেড়ে দেন, তারপর হেসে বলেন–মিস মনিরা, আপনি আমার ওপর রাগ করবেন না। হঠাৎ ভুল হয়ে গেছে।
তীব্রকণ্ঠে বলে মনিরা-ভুল! ছিঃ আপনার মত…
হ্যাঁ, সত্যি আমি বড় অসভ্য।
মনিরা ক্রুদ্ধদৃষ্টিতে তাকাল মিঃ আলমের মুখের দিকে। কিন্তু কি আশ্চর্য, সে মুখে নেই এতটুকু পরিবর্তন!
মনিরার পা থেকে মাথা পর্যন্ত রাগে রি-রি করে উঠল। কোন কথা না বলে পুনরায় ধপ করে সোফায় বসে পড়ল সে।
কিন্তু তখন মিঃ আলম উঠে দাঁড়িয়ে পড়েছেন, মুখে তাঁর মৃদু হাসির রেখা, টেবিল থেকে ক্যাপটা তুলে নিয়ে মাথায় দিয়ে বলেন– মিস মনিরা, আমার যা জানার ছিল জানা হয়ে গেছে।
অসময়ে বিরক্ত করলাম, ক্ষমা করবেন। আসি তবে…বেরিয়ে যান মিঃ আলম।
মনিরার দু’চোখে তখন অগ্নিস্ফুলিঙ্গ নির্গত হচ্ছিল। রাগে-ক্ষোভে গজ গজ করছিল। মিঃ আলমের কথার কোন উত্তর দিল না সে।
গাড়ি-বারান্দা থেকে মোটর স্টার্টের শব্দ শোনা গেল। এমন সময় বাবলু ট্রে হাতে কক্ষে প্রবেশ করল। এক গ্লাস পানি আর প্লেটভরা নাস্তা। কক্ষের চারদিকে দৃষ্টি বুলিয়ে বলল– আপামনি, উনি কোথায়?
