মরিয়ম বেগম বলে চলেছেন, মনিরা ওর মামার মৃত্যুর পর আহার-ন্দ্রিা ত্যাগ করেছে। ফুলের মত সুন্দর মুখখানা ওর শুকিয়ে গেছে। কি যে বলেন আপনারা, ও কথা আমি কখনো বিশ্বাস করব না। তাছাড়া মনিরা আমার ঘরের মেয়ে।
মিসেস চৌধুরী, আমি আপনার ভাগ্নী মিস মনিরার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চাই। তাকে কয়েকটা প্রশ্ন করব।
মিঃ হারুন বললেন– মিঃ আলম, আপনি মিস মনিরার সঙ্গে পরিচিত হলেই বুঝতে পারবেন, সে তেমন ধরনের মেয়েই নয়।
মরিয়ম বেগম সরকার সাহেবকে লক্ষ্য করে বললেন– সরকার সাহেব, মনিরাকে ডাকুন।
মরিয়ম বেগমের কথা শেষ হতে না হতেই কক্ষে প্রবেশ করে মনিরা, চোখ মুখের ভাব উগ্র; তীব্রকণ্ঠে বলল– আমাকে ডাকছ?
হ্যাঁ মা, ইনি গোয়েন্দা বিভাগের লোক, তোমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চান।
মিঃ আলমের মুখে মৃদু হাসির রেখা ফুটে উঠে মিলিয়ে গেল।
বললেন– বসুন মিস মনিরা।
বলুন কি বলবেন? মনিরা না বসেই রাগত কণ্ঠে কথাটা বলে।
আবার একটু হাসলেন মিঃ আলম।
মিঃ হারুন বললেন– মিস মনিরা, উনি যা জিজ্ঞাসা করেন তার উত্তর দিন।
নিশ্চয়ই দেব।
মিঃ আলম বললেন–আপনি অযথা ক্ষুণ্ণ হচ্ছেন মিস মনিরা। জানেন আপনার মামার হত্যা ব্যাপারে আমরা আপনাকে সন্দেহ করছি?
মিথ্যা আপনাদের সন্দেহ। মামুজানের হত্যা ব্যাপারে আপনাদেরই যে চক্রান্ত নেই তাই বা কে জানে! আমি শুনেছি, আমার মামুজান সেদিন যে পার্টিতে যোগ দিয়ে জীবন হারিয়েছেন, ঐ পার্টিতে আপনারাও উপস্থিত ছিলেন।
অদ্ভুতভাবে হেসে উঠলেন মিঃ আলম।
মিঃ হারুনও মিঃ আলমের হাসিতে যোগ দিলেন, তারপর হাসি থামিয়ে বললেন–দেখলেন মিঃ আলম, মিস মনিরা এখন আমাদেরকেই তার মামুজানের হত্যাকারী বলে সন্দেহ করে নিয়েছেন।
এবার গম্ভীর হয়ে পড়লেন মিঃ আলম মিস মনিরার সন্দেহ অহেতুক নয় মিঃ হারুন। চৌধুরী সাহেবের হত্যাকারী কে এখনও তা কেউ জানে না। কাজেই আপনি, আমি, মিস মনিরা কিংবা তার দস্যুপুত্র বনহুরও হতে পারে।
উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলে ওঠেন মরিয়ম বেগম–না না, আমার মনির কখনও এ কাজ করতে পারে না।
তবে কাকে আপনার সন্দেহ হয় মিসেস চৌধুরী? প্রশ্ন করলেন মিঃ হারুন।
মরিয়ম বেগম জবাব দিলেন– কেমন করে বলব! আমার স্বামী যে ফেরেস্তার মত মহৎ ব্যক্তি ছিলেন, তাঁর যে কোন শত্রু ছিলো না, তা-ই আমি জানি।
মিঃ আলম এবার মনিরাকে লক্ষ্য করে বলেন– মিস মনিরা, আপনিও জানেন আপনার মামুর কোন শত্রু ছিল না বা নেই। তবে কে তাঁকে হত্যা করল, আর কেনই বা করল?
আমিও সেই প্রশ্ন আপনাকে করছি। কারণ আমার মামুর হত্যাকালে আমি সেখানে ছিলাম না, বরং আপনারা সেখানে ছিলেন এবং তার মৃত্যুকালেও উপস্থিত ছিলেন।
তাহলে উনার পুত্র বনহুরের চক্রান্তে?
না, তাও নয়। সে দস্যু হতে পারে, সে ডাকু হতে পারে, কিন্তু পিতৃহত্যাকারী নয়। তীব্র কণ্ঠে কথাগুলো উচ্চারণ করে মনিরা।
মিস মনিরা, আপনি ভুল করছেন। দস্যু-ডাকুদের আবার ধর্ম জ্ঞান আছে নাকি! আমার মনে হয় দস্যু বনহুরই তার পিতাকে হত্যা করেছে। পূর্বের ন্যায় স্থির কণ্ঠে বললেন– মিঃ আলম।
অসম্ভব! মনিরা যেন চিৎকার করে ওঠে। একটু থেমে পুনরায় বলে–পিতাকে হত্যা করতে যাবে সে কোন্ লাভে?
পিতাকে হত্যা করলে তার দুটি উদ্দেশ্য সাধন হচ্ছে মিস মনিরা, এটাও কম নয়। একটা হচ্ছে প্রচুর ঐশ্বর্য, অন্যটা হয়তো আপনাকে বুঝিয়ে বলতে হবে না।
ঐশ্বর্যের লালসা দস্যু বনহুরের নেই, এটা আমি জানি। দীপ্তকণ্ঠে বলে উঠে মনিরা।
মিঃ আলম মনিরার কথায় অট্টহাসি হেসে ওঠেন হাঃ হাঃ হাঃ। তারপর হাসি থামিয়ে বললেন–তাহলে সে দস্যুবৃত্তি করে কেন?
দস্যুতা তার নেশা–পেশা নয়।
মিস মনিরা, আপনি তাকে ভালবাসেন এ কথা আমরা জানি।
সবাই জানে। আপনিও জানবেন এতে আশ্চর্য হবার কিছু নেই।
কিন্তু একজন দস্যুকে ভালবাসা অপরাধ, এটাও আপনি হয়ত জানেন?
ভালবাসা অপরাধ নয়। আমি আর আপনার প্রশ্নের জবাব দিতে চাই না। আপনারা এখন যেতে পারেন। মনিরা যেমন দ্রুত কক্ষে প্রবেশ করছিলো তেমনি দ্রুত বেরিয়ে যায়।
মিঃ আলম উঠে দাঁড়ান –চলুন মিঃ হারুন, আমার যা প্রশ্ন করার ছিল করা হয়েছে।
মরিয়ম বেগমও উঠে দাঁড়ান–দেখুন, ওর কথায় আপনারা যেন কিছু মনে করবেন না।
না, না, আমরা এতে কিছু মনে করিনি। এসব আমাদের গা-সওয়া হয়ে গেছে। কথাটা বলে মিঃ আলম দরজার দিকে পা বাড়ালেন।
মিঃ হারুন তাকে অনুসরণ করলেন।
মরিয়ম বেগম চিন্তিত কণ্ঠে বললেন–সরকার সাহেব, মনিরার ব্যবহারে ওরা রাগ করেন নি তো?
আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন বিবি সাহেবা। মা মনি কোন অন্যায় বলেন নি। যেমন কুকুর তেমনি মুগুর।
কি জানি কখন কি ঘটে বসে–ভয় হয়।
.
দেখ মা, তখন পুলিশের লোককে অমন করে বলা ঠিক হয় নি। শান্তকণ্ঠে মনিরার পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন মরিয়ম বেগম।
মনিরা বিছানায় শুয়ে একটা বই নিয়ে নাড়াচাড়া করছিল। মুখমণ্ডল বিষণ্ণ। চোখ দুটি লাল। একটু পূর্বে হয়ত কেঁদেছে সে। মামীমার কথায় বইখানা পাশে রেখে বিছানায় উঠে বসল, কোন কথা বলল না।
মরিয়ম বেগম স্নেহভরা গলায় পুনরায় বললেন–আমাদের দেখার এক খোদা ছাড়া কেউ নেই। এ অবস্থায় পুলিশের লোকরা যদি ক্ষেপে যায় তাহলে আর যে কোন উপায় থাকবে না মা।
