ঠিক সেই মুহূর্তে বনহুর নিদ্রা ছুটে গেলো, চমকে উঠে বসল। উজ্জ্বল আলোতে দেখল নূরী দাঁড়িয়ে আছে তার খাটের পাশে। বনহুর নিজের পায়ের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারল সব।
নূরী, এবার ধীরে ধীরে বেরিয়ে যাচ্ছিল।
বনহুর ডাকল– নূরী।
থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল নূরী। কিন্তু ফিরে তাকাবার সাহস পেল না সে।
বনহুর ডাকল– শোন নূরী।
নূরী ধীর পদক্ষেপে বনহুরের খাটের পাশে এসে দাঁড়াল। দৃষ্টি নত রয়েছে ওর।
বনহুর শান্তকণ্ঠে বলল– বসো।
নূরী তবুও বসল না, যেমন দাঁড়িয়ে ছিল তেমনি রইল!
বনহুর নূরীর দক্ষিণ হাতখানা মুঠায় চেপে ডাকল– নূরী!
এতক্ষণে নূরী চোখ তুলে একবার বনহুরের দিকে তাকাল, পুনরায় দৃষ্টি নত করতে যাচ্ছিল সে বনহুর ওর চিবুক ধরে মুখটা উঁচু করে ধরে উঁ হুঁ আমার দিকে তাকাও। বল, কেন তুমি এখানে এসেছিলে?
নূরী নীরব।
বনহুর ওকে টেনে বসিয়ে দেয় নিজের পাশে, তারপর হেসে বলে– পাগলী, আমার ওপর রাগ করে খুব কষ্ট পেয়েছ, না?
নূরী এবারও নিশ্চুপ।
বনহুর নূরীর কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়ে কই, আগের মত আমার চুলে হাত বুলিয়ে দিলে না?
নূরী আর নিজেকে সংযত রাখতে পারে না– হঠাৎ দু’হাতের মধ্যে মুখ রেখে উচ্ছ্বসিতভাবে কেঁদে ওঠে।
বনহুর আশ্চর্য কণ্ঠে বলে–একি, আবার কেন কাঁদছ?
না না, তুমি আমাকে কিছু জিজ্ঞাসা কর না হুর, জিজ্ঞাসা কর না।
তোমরা নারীজাতি, শুধু কাঁদতেই জানো, শুধু কান্না আর কান্না, এ ছাড়া আর কিছুই নেই তোমাদের?
হুর, তোমাকে ভালবেসে কান্না ছাড়া আর যে কোন পথ নেই।
নূরী, আমার কি জন্ম শুধু তোমাদের কাঁদাবার জন্য? যেদিকে তাকাই শুধু চোখের পানি আর চোখের পানি! শিশুকালে– বাবাকে কাঁদিয়েছি। তাই বুঝি আমার জীবনে এ একটি চরম অভিশাপ। যে দিকে তাকাই শুধু কান্নাই দেখতে পাই। কান্না ছাড়া কেউ যেন হাসতে জানে না।
হুর, তুমি আমাকে ক্ষমা কর। সে দিন তোমার কাছে যে অপরাধ আমি করেছি, জানি তার ক্ষমা নেই, তবু বল তুমি আমাকে…
অনেক হয়েছে! নূরী, দস্যু কোনদিন রাগ-অভিমান জানে না, যা যখন ঘটে তখনই তার শেষ হয়। তোমার কোন দোষ নেই।
হুর! নূরী বনহুরের বুকে মাথা রাখল। একটা অন্ধকার কালো মেঘ ধীরে ধীরে নূরীর মন থেকে সরে গেল। কতদিন নূরী এমনি করে বনহুরের বুকে মাথা রাখতে পারেনি। একটা অনাবিল আনন্দ তার সমস্ত হৃদয়ে একটা শান্তির প্রলেপ বুলিয়ে দিয়ে গেল।
নূরী যখন বনহুরের কক্ষ থেকে বেরিয়ে এলো, তখন অন্ধকারে একটা ছায়ামূর্তি সরে দাঁড়াল।
নূরী এগিয়ে চলেছে তার ঘরের দিকে। কিছু পূর্বে যে ব্যথার আগুন তার মনে দাউ দাউ করে জ্বলছিল, এখন তা আর নেই। ধুয়ে-মুছে সব পরিস্কার হয়ে গেছে। বনহুরের একটা কথায় সব ভুলে গেল নূরী।
নূরী এগিয়ে যাচ্ছে। পেছনে তার এগিয়ে চলেছে একটা ছায়ামূর্তি। যেমনি নূরী নিজের কক্ষে প্রবেশ করতে যাবে ঠিক সেই মুহূর্তে পেছন থেকে নূরীকে ধরে ফেলল একটা বলিষ্ঠ লোক। নূরী চিৎকার করার পূর্বেই লোকটা তার মুখে কাপড় গুঁজে দিয়ে কাঁধে উঠিয়ে নিল, তারপর অন্ধকারে দ্রুত অদৃশ্য হয়ে গেল।
বনহুর বিছানায় শুয়ে হঠাৎ শুনতে পেল তাদের আস্তানা থেকে একটা অশ্ব-পদশব্দ যেন দ্রুত দূরে সরে যাচ্ছে। এ অসময়ে কে তাদের আস্তানা থেকে কোথায় চলে যাচ্ছে? ব্যাপারটা তার কাছে। স্বচ্ছ মনে হল না। বনহুর বিছানায় সোজা হয়ে বসল, কান পেতে শুনতে চেষ্টা করলো।
এমন সময় একজন অনুচর হাঁপাতে হাঁপাতে ছুটে এলো, দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে ডাকল সর্দার, সর্দার……
বনহুর তড়িৎ গতিতে বিছানা থেকে লাফিয়ে নেমে দাঁড়াল তারপর টেবিল থেকে রিভলভারখানা তুলে নিয়ে দরজার বাইরে এসে দাঁড়াল– কে, মহসীন?
সর্দার, হাংলু নূরীকে নিয়ে ভেগেছে… ঐ শুনা যাচ্ছে তার ঘোড়ার খুরের শব্দ।
তোমরা দেখেছ, বাধা দাওনি?
সর্দার, আমরা দু’জনে পাহারায় ছিলাম, বাধা দিতে গেলে একজনকে হাংলু হত্যা করছে …
বনহুর আর এক মুহূর্ত দাঁড়ায় না, ছুটে বেরিয়ে যায় সে অশ্বালয়ের দিকে। গেটের পাশেই দেখতে পায় তার নিহত অনুচরটা চিৎ হয়ে পড়ে আছে। একখানা ছোরা আমূল বসিয়ে দেওয়া হয়েছে তার বুকে।
বনহুরের এসব দেখার সময় নেই। একবার মাত্র তাকিয়ে দেখে নিয়ে অশ্বালয়ে প্রবেশ করে। অতি দ্রুত তাজকে নিয়ে বেরিয়ে আসে। তারপর চেপে বসে তাজের পিঠে।
হাংলুর অশ্ব পদশব্দ ততক্ষণে অনেক দূরে সরে গেছে।
বনহুর তাজের পিঠে উকাবেগে ছুটল। চোখ দুটি দিয়ে যেন আগুন ঠিকরে বের হচ্ছে। নুরীকে নিয়ে হাংলু পালিয়েছে, এতবড় সাহস তার! বনহুর দাঁতে অধর চেপে অশ্বপৃষ্ঠে কষাঘাত করে। এইবুঝি সে প্রথম তাজের পিঠে কষাঘাত করল।
তাজ বুঝতে পারে তার মুনিব আজ প্রকৃতিস্থ নয়। কাজেই নিজের গতি আরও বাড়িয়ে দেয়, সে।
রাত্রির নিচ্ছিদ্র অন্ধকার ভেদ করে তাজ ছুটে চলেছে। পূর্বের অশ্ব-পদশব্দ অতি ক্ষীণ হয়ে এসেছে।
বনহুর বারবার তাজের পেটে পা দিয়ে আঘাত করতে লাগল। জোরে, আরও জোরে ছুটতে লাগল তাজ।
.
হাংলু নূরীকে এঁটে ধরেছিল।
নূরী যতই হাংলুর হাত থেকে নিজকে বাঁচিয়ে নেবার চেষ্টা করছিল ততই হাংলুর বলিষ্ঠ হাতখানা তার দেহে সাঁড়াশীর মত বসে যাচ্ছিল। প্রাণফাটা চিৎকার করে মাঝে মাঝে ডাকছিল– হুর–হুর–
