ধীরে ধীরে মুখ তুলে তাকাল মনিরা। তার স্বপ্ন সত্যে পরিণত হয়েছে। তার মনির এসেছে তার পাশে।
মনিরা কিন্তু নিজেকে ধরে রাখতে পারে না, দু’হাতে মুখ ঢেকে উচ্ছ্বসিত কান্নায় ভেঙে পড়ে।
বনহুর মনিরার মাথায় হাত রেখে বলে– মনিরা, একি কাঁদছ কেন?
না না, তুমি যাও। তুমি যাও।
মনিরা, কি হল তোমার?
কিছু না।
অনেকদিন পরে এলাম তোমার হাসিভরা মুখ দেখব কিন্তু ..
তুমিই আমার জীবনটা দুর্বিসহ করে তুলেছ। তুমি আমায় হাসতে দিলে না মনির।
জানো, আজ আমার হৃদয়ে কি অসহ্য ব্যথা গুমরে কেঁদে মরছে? শুধু তোমার জন্য আজ আমি মনে এতটুকু শান্তি পাচ্ছি না। কিসের অভাব তোমার– তবু কেন তুমি এসব করছ? কণ্ঠ বাষ্পরুদ্ধ হয়ে আসে মনিরার।
তোমার কথা ঠিক বুঝতে পারছি না মনিরা।
তা পারবে কেন, তুমি যে দস্যু–ডাকু ..
এ তো পুরনো কথা।
আচ্ছা, চিরদিন কি তুমি এসব করবে? চুরি-ডাকাতি লুটতরাজ ছাড়া আর কি কোন কাজ নেই তোমার?
হাঃ হাঃ হাঃ করে হেসে ওঠে বনহুর।
মনিরা, তাড়াতাড়ি দক্ষিণ হাতখানা দিয়ে বনহুরের মুখে চাপা দেয়– থাম।
মনিরা অভাবের তাড়নায় আমি এসব করি না। এসব আমার নেশা।
নরহত্যা তোমার নেশা?
দস্যু বনহুর কোনদিন বিনা কারণে নরহত্যা করে না।
একটা নির্দোষ বেচারী শিকারী ভদ্রলোককে তুমি হত্যা করনি?
মাধবপুরের জমিদারের কন্যার কণ্ঠ থেকে তুমি হার ছিঁড়ে নাওনি?
আমি নেইনি, নিয়েছে আমার অনুচরগণ।
সে তোমার আদেশেই। ছিঃ ছিঃ ছিঃ একটা সামান্য হারের জন্য তুমি…
মনিরা– সে হার তাকে ফেরতে পাঠানো হয়েছে।
নিলেই বা কেন আবার ফেরতই বা পাঠালে কেন?
সব কথা তুমি নাইবা শুনলে।
শুনতে আমি চাই না। শুধু বল, তুমি আর ওসব করবে না। বনহুরের জামার আস্তিন চেপে ধরে মনিরা।
বনহুর পূর্বের ন্যায় হেসে ওঠে– হাঃ হাঃ হাঃ!
মনিরা অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে বনহুরের মুখের দিকে। তারপর হঠাৎ লুটিয়ে পড়ে তার বুকে– আমি যে আর সহ্য করতে পারছি না মনিরা, আমি যে আর সহ্য করতে পারছি না..
বনহুর ওকে নিবিড়ভাবে টেনে নেয় কাছে, তারপর বলে– মনিরা, নারী হৃদয় বড়ই কোমল। শুধু কোমল নয়, দুর্বলও। তাই তুমি সামান্য কিছু হলেই সহ্য করতে পার না।
কি বললে, তোমার কাজ সামান্য! রাহাজানি, লুটতরাজ, নরহত্যা—এসব–সামান্য?
নয়তো কি? দস্যু বনহুরের কাছে এসব অতি নগণ্য। জানো মনিরা, এই মুহূর্তে আমি নিজের বুকে গুলী চালাতে পারি!
তুমি সবই পার– পাষন্ড, তুমি সব পার। কিন্তু সে ব্যথা যে আমার কাছে কত দুর্বিষহ তা জানো না। প্রতি মুহূর্তে তোমার অমঙ্গল চিন্তায় আমি যে কত অস্থির থাকি, তুমি তা জানো না।
মনিরা, এই হতভাগার জন্য কেন তুমি চিন্তা কর। কেন তুমি ভাব?
নিষ্ঠুর! সত্যই তোমার হৃদয় পাষাণে গড়া। জানো না তুমি তোমার মনিরার কতখানি। কণ্ঠরোধ হয়ে আসে মনিরার।
বনহুর অবেগমধুর কণ্ঠে ডাকে– মনিরা!
বনহুরের বুকে মুখ গুঁজে বলে মনিরা আর কত দিন আমাকে এমনি করে কাঁদাবে তুমি? তুমি তো ঐ সব নিয়ে মেতে থাক, আমি কি নিয়ে বেঁচে থাকি বল?
আম্মা-আব্বার সেবা-যত্নের মধ্যে নিজেকে বিলিয়ে দিও, শান্তি পাবে।
তা জানি কিন্তু তোমাকে না পেলে আমার সব অন্ধকার।
তুমি নিতান্ত বালিকার মত কথা বললে মনিরা। দস্যু বনহুরকে তুমি মায়ার বাঁধনে বাঁধতে চাও। কিন্তু তা কোন দিনই হবার নয় মনিরা।
অস্কুট ধ্বনি করে ওঠে মনিরা–কি বললে? আমার সমস্ত আকাশ কুসুম ধূলিসাৎ করে দিলে। মুছে দিলে আমার হৃদয়ের সমস্ত বাসনা। ছুটে গিয়ে লুটিয়ে পড়ল মনিরা মেঝের কার্পেটে, উচ্ছ্বসিত কান্নায় ভেঙে পড়ল সে।
বনহুর কিছুক্ষণ পাথরের মূর্তির মত স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল তারপর মনিরার পাশে এসে বসল, পিঠে হাত রেখে ডাকল– মনিরা! আবার ডাকল সে– মনিরা, তুমি যা চাও তাই পাবে। ওঠো মনিরা–
মনিরা ধীরে ধীরে কার্পেট থেকে উঠে বলল– সত্যি দেবে?
কি চাও তুমি?
তোমাকে।
আমি তো তোমারই।
মনির!
হাঁ মনিরা।
মনিরা বনহুরের চোখ দুটির দিকে স্থিরদৃষ্টি মেলে তাকাল। এমন করে কোনদিন ওর চোখের দিকে তাকিয়ে দেখতে পারেনি।
দূর থেকে ভেসে আসছে মোরগের কণ্ঠস্বর। ভোর হবার আর বেশি দেরী নেই।
বনহুরকে বিদায় দিয়ে মনিরা শয্যায় গা এলিয়ে দিল। একটা অনাবিল আনন্দ মনিরার হৃদয়ের সমস্ত ব্যথাকে মুছে নিয়ে গেছে। মনির আর কারও নয়– শুধু তার।
.
সেদিনের পর থেকে নূরীর মনের শান্তি চিরতরে লোপ পেয়ে গিয়েছিল। লজ্জায়-অভিমানে নূরী আজ পর্যন্ত বনহুরের সম্মুখে আসেনি। অসহ্য একটা দাহ তার অন্তরে তুষের আগুনের মত ধিকিধিকি জ্বলছিল। বনহুরকে নূরী শুধু ভালবাসতো তা নয়, তার জীবনের সাথী হিসাবে ওকে সে গ্রহণ করেছিল। গোটা পৃথিবী চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে যাক, তবু নূরী ওকে ভুলবে না– ভুলতে পারে না।
নূরী যদিও এতদিন বনহুরের সামনে আসেনি, তবুও সে একটি দিনও ওকে না দেখে থাকতে পারেনি। প্রতিদিন সে দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে একটি বারের জন্য বনহুরকে দেখে যেত। যতক্ষণ বনহুর বাইরে থেকে ফিরে না আসত ততক্ষণ নূরী ব্যাকুল আগ্রহে প্রতীক্ষা করত ওর।
বনহুর ফিরে এলে তাকে একটি বারের জন্য দেখে এসে তবেই সে শয্যা গ্রহণ করতো।
একদিন বনহুর সকালে বেরিয়ে গেল, আর ফিরে এলো না। সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত হল তবু তার দেখা নেই। নূরী উদ্বিগ্ন হয়ে উঠল না জানি কোন বিপদে পড়েছে সে! ব্যস্ত হয়ে বারবার অনুচরদের জিজ্ঞাসা করতে লাগল কোথায় গেছে বনহুর। আর কে গেছে তার সঙ্গে। এতক্ষণ ফিরে এলো না কেন? নানা প্রশ্নে অতিষ্ঠ করে তুলল নূরী সবাইকে।
