ডাক্তারের মুখে একটি হাসির রেখা ফুটে ওঠে, বলে–সন্দেহ হচ্ছে?
হ্যাঁ। আপনি ডাক্তার নন।
কেন, আপনার ননদিনী কি আরোগ্য লাভ করছে না?
তা জানি না, কিন্তু আপনি যে ডাক্তার নন, এ আমি জানি। বলুন আপনি কে?
ডাক্তার কিছু ভেবে বললেন–চন্দ্রাদেবী, সত্যিই আমি ডাক্তার নই। কিন্তু….
কিন্তু নয়, আপনি আমার নিকট লুকাতে চেষ্টা করবেন না, আপনার আসল পরিচয় আমি জানতে পেরেছি।
তাই নাকি?
হ্যাঁ, আপনি-আপনি—
বলুন, বলুন?
আপনি দস্যু বনহুর।
ধন্যবাদ। আপনি যে আমাকে চিনতে পেরেছেন সেজন্য আমি কিছুমাত্র আশ্চর্য হই নি।
জানেন, আমি এখনি আপনাকে পুলিশের হাতে ধরিয়ে দিতে পারি।
সে জন্য আমার চিন্তার কোন কারণ নেই। বরং আপনার ননদের চিকিৎসার হাত থেকে উদ্ধার পেতাম। চন্দ্রাদেবী, আপনার সঙ্গে আমার কয়েকটি গোপনীয় কথা আছে! যদি মনে কিছু না করেন…
চন্দ্রাদেবী গম্ভীর কণ্ঠে বলে–দস্যু বলে আমি আপনাকে ভয় করি না। যদি বলার মত কথা হয় বলতে পারেন।
নিজ মনেই হাসে বনহুর। যে দস্যুর নাম স্মরণে শহরবাসীর হৃদকম্প শুরু হয়–সেই দস্যুর সামনে দাঁড়িয়ে একটি নারী এতবড় কথা বলতে পারে না। চন্দ্রাদেবীর সাহসের পরিচয় পেয়ে খুশি হলো সে, চারদিকে তাকিয়ে চাপা কণ্ঠে বলল–দেখুন,. সুভাষিণীকে সম্পূর্ণ আরোগ্য করতে হলে আপনার সাহায্য আমার একান্ত প্রয়োজন।
বলুন আমি কি করতে পারি?
মাধবগঞ্জের জমিদারপুত্র মধুসেনের সঙ্গে সুভাষিণীর বিয়ে হবে, এ ব্যাপারে আপনি আমাকে সহায়তা করবেন।
স্তব্ধকণ্ঠে বলে ওঠে চন্দ্রাদেবী-সুভা যে আপনাকে ভালবাসে।
সে কথায় কান না দিয়ে বলে ওঠে ডাক্তারবেশী দস্যু বনহুর–চন্দ্রাদেবী, সুভা যে ডাক্তারকে অনেকখানি ভালবেসে ফেলেছে এটা হয়তো আপনি লক্ষ্য করেছেন।
হ্যাঁ করেছি। কিন্তু সে ডাক্তারকে ভালবাসেনি, ভালবেসেছে তার দুটি চোখকে।
চন্দ্রাদেবী!
হ্যাঁ, দ্য হলেও আপনি মানুষ। সবাই আপনাকে না বুঝলেও আমি জানি আপনার হৃদয়। অতি মহৎ। আপনি আমার ছোট বোনের মত আদরের সুভাকে বাঁচান, বাঁচান
উদ্বিগ্ন হবেন না চন্দ্রাদেবী। আমি যা বলব সেভাবে আপনাকে কাজ করতে হবে।
বলুন কি করতে হবে?
তেমন কোন কঠিন কাজ নয় চন্দ্রাদেবী। আমি এরপর মধুসেনকে সঙ্গে আনবো।
মধুসেন–সুভার-ভাবী স্বামী মধুসেন?
হ্যাঁ, তাকেই আমি ডাক্তার বেশে আনব। চন্দ্রাদেবী, আপনি ডাক্তার আর সুভাষিণীর দৈনন্দিন নিবিড় প্রেমে সাধ্যমত সাহায্য করবেন।
কিন্তু…..
না, আর কিন্তু নয়। মনে রাখবেন চন্দ্রাদেবী, একথা আপনি ছাড়া আর কেউ যেন জানতে পারে। যখন দেখবেন উভয়ের মধ্যে একটা গভীর বন্ধনের সৃষ্টি গড়ে উঠেছে তখন ডাক্তারের মুখোশ উন্মোচিত করে ফেলবেন–বাস, তারপর আপনাকে কিছু করতে হবে না।
এ কি করে সম্ভব হবে?
অসম্ভব কিছুই নয় চন্দ্রাদেবী। আচ্ছা, আজ তাহলে চলি?
চন্দ্রাদেবী কিছু বলতে গেল, কিন্তু তার পূর্বে বনহুর বাইরে বেরিয়ে গেছে।
সুভাষিণীর কক্ষে ফিরে আসে চন্দ্রাদেবী। দেখতে পায় রায়বাবু বসে বসে ঝিমুচ্ছেন। পুত্রবধূর আগমনে তিনি উঠে দাঁড়ান–আমার এখন তাহলে ছুটি?
হ্যাঁ বাবা, আপনি যান! আমি বসছি।
ব্রজবিহারী রায় বেরিয়ে যান।
চন্দ্রাদেবী সুভাষিণীর পাশে বসে। তখনও তার মনে চিন্তার রেখাজাল জট পাকাচ্ছিল। দস্যু বনহুর স্বয়ং তাদের বাড়িতে আসে যায় অথচ তারা কেউ জানে না সে কথা। নিভৃতে ভাবতে গিয়ে শিউরে উঠে চন্দ্রাদেবী। এ দাড়ি গোফের অন্তরালে না জানি কেমন একখানা মুখ লুকানো আছে–যে মুখখানার জন্য আজ সুভার এই অবস্থা। চন্দ্রাদেবীর মনে দস্যু বনহুরের আসল রূপ দেখার বাসনা জাগে।
.
মিঃ হারুন অফিসে প্রবেশ করতেই সাব-ইন্সপেক্টর মিঃ জাহেদ বলেন–স্যার, কালকের সেই শিকারী খুন হয়েছে।
বলেন কি! আঁতকে ওঠেন মিঃ হারুন।
হ্যাঁ স্যার, আমি নিজে গিয়েছিলাম, পরীক্ষা করে দেখে এলাম। কালকেই সেই শিকারী ভদ্রলোককে কে বা কারা গুলী করে হত্যা করেছে।
ইস! নিশ্চয় এ দস্যু বনহুরের কাজ।
হ্যাঁ স্যার, আমারও তাই মনে হয়।
লাশ কি মর্গে পাঠানোর ব্যবস্থা করেছেন?
স্যার, আপনাকে জিজ্ঞেস না করে আমি কিছুই করিনি। বেশ করেছেন। আমি লাশটা একবার পরীক্ষা করে দেখব। তাহলে আমি গাড়ি বের করতে বলি স্যার?
না, আমার গাড়িতেই যাব। আপনিও চলুন মিঃ জাহেদ।
মিঃ হারুনের গাড়ি বাইরেই অপেক্ষা করছিল। মিঃ হারুন মিঃ জাহেদ এবং দু’জন পুলিশকে নিয়ে রওয়ানা দিলেন।
গন্তব্যস্থানে পৌঁছে মিঃ হারুন দেখলেন, শিকারীর রক্তাক্ত দেহ একটা প্রান্তরের মাঝখানে মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। খানিকটা জায়গা রক্তে জমাট বেঁধে আছে।
হঠাৎ মিঃ হারুনের নজরে পড়ল, লাশটার পাশে একটি কাগজের টুকরো পড়ে আছে। মিঃ হারুন কাগজের টুকরোখানা হাতে উঠিয়ে নিয়ে পড়লেন, “বিশ্বাসঘাতকের শাস্তি এমনি করেই হয়।“–দস্যু বনহুর
মিঃ হারুন রাগে আগুনের মত জ্বলে উঠলেন, বজ্রকঠিন স্বরে বললেন-দিন দিন দস্যু বনহুরের ঔদ্ধত্য চরম সীমায় পৌঁছে যাচ্ছে। অচিরে তাকে পাকড়াও করতে না পারলে দেশে শান্তি ফিরে আসবে না।
লাশ মর্গে পাঠানোর ব্যবস্থা করে অফিসে ফিরে এলেন মিঃ হারুন এবং তার সঙ্গিগণ। এবার মিঃ হারুন পুলিশ সুপার মিঃ আহমদের সঙ্গে পরামর্শের জন্য রওয়ানা দিলেন।
