মনিরার মুখে হাসি ফুটে ওঠে। বনহুর ওকে নিবিড় করে টেনে নেয় কাছে–বাহুবন্ধনে আবদ্ধ করে বলে–লক্ষ্মীটি আমার।
ঠিক সেই মুহূর্তে কক্ষে প্রবেশ করে নূরী। দু’চোখে আগুন ঠিকরে বের হচ্ছে ওর। রুদ্ধ নিঃশ্বাসে বলে–হুর।
বনহুর নূরীকে দেখেই চমকে উঠেছিল। সঙ্গে সঙ্গে মনিরাকে ছেড়ে দিয়ে স্বচ্ছকণ্ঠে বলে– নূরী এসো, এর সঙ্গে তোমার পরিচয় করিয়ে দেই।
নূরী স্থির চোখে তাকিয়ে আছে মনিরার দিকে।
মনিরাও নূরীকে দেখে কম আশ্চর্য হয় নি। সে একবার বনহুর আর এক বার নূরীর মুখের দিকে তাকায়। মনে তার অনেক প্রশ্ন একসঙ্গে ধাক্কা মারে। কে এই যুবতী। বনহুরের সঙ্গে কি এর সম্বন্ধ!
বনহুর নূরী আর মনিরার মাঝখানে দাঁড়ায়, তারপর হেসে বলে–নূরী, এই সেই মনিরা যার সন্ধানে আমি এবং আমার সমস্ত অনুচর ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম।
তীব্রকণ্ঠে বলে ওঠে নূরী–ব্যস্ত নয়, ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছিলে।
তা তুমি যাই বল–শোনো মনিরা, এ হচ্ছে আমার ছোট বোন নূরী।
মিথ্যে কথা, আমি বোন নই।
অবাক হয়ে চোখ মেলে তাকায় মনিরা বনহুর আর নূরীর মুখের দিকে।
বনহুর গম্ভীর কণ্ঠে বলে–তাহলে তুমি কে?
আমি তোমার আজন্ম সঙ্গিনী-সাথী। তুমি এ কথা অস্বীকার করতে পারবে না হুর। শিশুকাল থেকে তোমাকে আমি দেখে আসছি। সব সময় তুমি আমার পাশে পাশে ছিলে।
তুমি যাই মনে কর নূরী, আমি তোমাকে বোনের মতই মনে করে এসেছি। বনহুর মনিরার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখলো মনিরার মুখমণ্ডল গম্ভীর হয়ে পড়েছে।
নূরী আর এক মুহূর্ত দাঁড়ায় না। দ্রুত বেরিয়ে যায় সেখান থেকে। কক্ষে নিস্তব্ধতা বিরাজ করে। কিছুক্ষণ বনহুর আর মনিরা কোন কথাই বলতে পারে না।
নিস্তব্ধতা ভাঙে মনিরা, বলে– কি ভাবছ? আমি তোমাকে কোনদিন অবিশ্বাস করতে পারব না।
বনহুর মনিরাকে টেনে নেয় বুকে–মনিরা।
হ্যাঁ, আমি তোমাকে অনেক বিশ্বাস করি। মনিরার কণ্ঠ স্বচ্ছ স্বাভাবিক হয়ে এসেছে।
এখন বনহুর আর মনিরার যে পোডড়াবাড়িতে বসে কথাবার্তা হচ্ছিল, সে জায়গাটা বনহুরের আস্তানা ছেড়ে দূরে কান্দাইয়া গ্রামে।
একদিন এই কান্দাইয়া বিরাট একটা গ্রাম ছিল। বহু লোকের বাস ছিল এখানে। আজ কান্দাইয়া গ্রাম এক ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। প্রচণ্ড এক ভূমিকম্পে গ্রামটা নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল। এখন সেখানে গহন বন। ভূমিকম্পের পর যে কয়েকজন লোক জীবিত ছিল, তারাও বাড়ি-ঘর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়ার পর গ্রাম ছেড়ে চলে গিয়েছিলো শহরে।
বহুকাল লোকজনের বসবাস না থাকায় কান্দাইয়া গ্রামের নাম কালান্তরে মানব সমাজ থেকে মুছে গিয়েছিল। কিন্তু প্রাচীন কোন কোন বৃদ্ধের মুখে এখনও এ গ্রামের নাম শোনা যায়। দস্যু বনহুর এই গ্রামের একটি পোড়োবাড়িতেই মনিরার থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছিল।
অবশ্য এই পোড়োবাড়িতে মনিরা একা থাকত না। বনহুরের কয়েকজন বিশ্বস্ত অনুচর মনিরার রক্ষার্থে কড়া পাহারায় থাকত। এই তো মাত্র কয়েকদিন মাঝে মাঝে বনহুরও গোপনে মনিরার সন্ধান নিয়ে যেত। মনিরাকে এখানে আটকে রাখার অবশ্য কারণ ছিল। বনহুর শয়তান। নাথুরাম এবং মুরাদকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল। মনিরাকে তার মামা-মামীমার নিকট পৌঁছে দেবার পূর্বেই নূরী এই পোড়োবাড়ির সন্ধান জানতে পারে।
বনহুরের এক অনুচর গোপনে নূরীকে সংবাদ দেয়, তাদের সর্দার একটি যুবতাঁকে কান্দাইয়া বনের একটি পোডড়াবাড়িতে আটকে রেখেছে। যুবতী অন্য কেউ নয়– চৌধুরী কন্যা মনিরা।
কথাটা শোনার পর থেকে নূরীর মনে এতটুকু শান্তি ছিল না। নূরী যদিও হিংসাপরায়ণ নারী নয়, তবু তার মনে একটা দাহ শুরু হলো। মনিরাকে দেখার জন্য অস্থির হয়ে পড়ল সে। নূরী সেই অনুচরটির সহায়তায় কান্দাইয়া বনে এসে পৌঁছল।
বনহুরের বাহুবন্ধনে মনিরা যখন ধরা পড়েছিল, ঠিক সেই মুহূর্তে নূরী কক্ষে প্রবেশ করে এই দৃশ্য দেখতে পায়। সঙ্গে সঙ্গে নূরীর স্বপ্নসৌধ ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। হৃদয়ে যে প্রচণ্ড আঘাত লাগে সেটা সহ্য করতে পারে না নূরী। পোডড়াবাড়ি থেকে বেরিয়ে উম্মাদিনীর ন্যায় ছুটতে থাকে।
কিছুটা এগুতেই বনহুরের সেই অনুচর জাফর অশ্ব নিয়ে নূরীর সম্মুখে পথরোধ করে দাঁড়ায়। বলে সে এভাবে ছুটলে কতক্ষণে বাড়ি পৌঁছবে? তার চেয়ে অশ্ব নিয়ে বাড়ি যাও।
নূরী কোনদিকে না তাকিয়ে অশ্বপৃষ্ঠে চেপে বসে।
জাফর জিজ্ঞাসা করে–কোথায় যাচ্ছো নূরী?
নূরী ততক্ষণে অনেক দূরে এগিয়ে গেছে। জাফরের কণ্ঠস্বর তার কানে পৌঁছল কিনা সন্দেহ।
নূরীর কোনদিকে ভ্রূক্ষেপ নেই। সে অশ্ব নিয়ে দ্রুতগতিতে ছুটে চলেছে। সামনে কোন বাধাই তাকে ক্ষান্ত করতে সক্ষম হচ্ছে না।
ঝোঁপঝাড়, লতাপাতা ডিঙিয়ে, গহন বনের মধ্য দিয়ে উল্কা বেগে ছুটে চলেছে নূরীর অশ্ব। বনহুরকে নূরী প্রাণ অপেক্ষা বেশি ভালবাসে। শুধু ভালবাসে না, ওকে সে মনে প্রাণে স্বামী বলে গ্রহণ করে নিয়েছে। নূরী দস্যু কন্যা–বনহুর দস্যু। বনহুর বীর পুরুষ, নূরী বীরঙ্গনা। নূরী সুন্দরী, বনহুর সুপুরুষ–দুয়ের মধ্যে সোনায় সোহাগায় মিল রয়েছে। অথচ বনহুর নূরী থেকে অনেক দূরে। বনহুরকে সে পাশে পেয়েছে বটে, কিন্তু কোথায় যেন অনেক তফাৎ রয়েছে তাদের মধ্যে।
বনহুর নূরীকে উপেক্ষা করলেও নূরী কোনদিন তাকে অবহেলা করতে পারেনি। বনহুরের উপেক্ষা তার হৃদয়ে আঘাত হেনেছে সত্য, কিন্তু রাগ বা অভিমান কিছুই করেনি সে।
