মদনপালের রাজত্বের সমুদয় ঘটনার বিশদ বিবরণ অথবা পারম্পর্য সঠিক না জানিতে পারিলেও ইহা অনায়াসেই সিদ্ধান্ত করা যাইতে পারে যে তাঁহার মৃত্যুকালে দক্ষিণ, পূর্ব্ব ও পশ্চিমবঙ্গে তাঁহার কোনো অধিকারই ছিল না। উত্তরবঙ্গেরও সমগ্র অথবা অধিকাংশ তাঁহার হস্তচ্যুত হইয়াছিল। সুতরাং পালরাজ্য এই সময়ে মগধের মধ্যে ও পূৰ্ব্বভাগে সীমাবদ্ধ ছিল।
মদনপালের পর গোবিন্দপাল নামে এক রাজা গয়ায় রাজত্ব করেন। ইহারও পরমেশ্বর পরমভট্টারক মহারাজাধিরাজ প্রভৃতি পদবী এবং গৌড়েশ্বর উপাধি ছিল। সম্ভবত মদনপালের মৃত্যুর পরই তিনি রাজসিংহাসনে আরোহণ করেন এবং ১১৬২ খৃষ্টাব্দে তাঁহার রাজ্য বিনষ্ট হয়। তিনি বৌদ্ধ ছিলেন এবং একখানি বৌদ্ধ পুঁথিতে ‘শ্রীমদগোবিন্দপালদেবানাং বিনষ্টরাজ্যে অষ্টত্রিংশৎ সম্বৎসরে’ এইরূপ কালজ্ঞাপন পদ পাওয়া যায়। অপর কয়েকখানি পুঁথিতে বিনষ্টরাজ্যের পরিবর্তে ‘গতরাজ্যে’, ‘অতীত-সম্বৎসর’ প্রভৃতি শব্দ ব্যবহৃত হইয়াছে। এই সমুদয় কালজ্ঞাপক বাক্য হইতে অনুমিত হয় যে গোবিন্দপালই মগধে শেষ বৌদ্ধ রাজা, এবং এইজন্যই বৌদ্ধ ভিক্ষুগণ তাঁহার মৃত্যুর পর বিধর্মী রাজার প্রবর্দ্ধমান বিজয়রাজ্যের উল্লেখ না করিয়া গোবিন্দপালের রাজ্য-ধ্বংস হইতে কাল গণনা করিতেন।
গোবিন্দপাল পালরাজবংশীয় ছিলেন কি না তাহা নিশ্চিত করিয়া বলা যায় না। তাঁহার পদবী ও উপাধি, বৌদ্ধধৰ্ম্ম, ও মদনপালের মৃত্যুর অব্যবহিত পরেই মগধে রাজত্বের কথা বিবেচনা করিলে তিনি যে পালরাজবংশীয় ছিলেন এরূপ অনুমান সঙ্গত বলিয়া মনে হয় না। কিন্তু তাহা হইলেও মদনপালের সহিত তাঁহার কী সম্বন্ধ ছিল, এবং গয়ার বাহিরে তাঁহার রাজ্য কত দূর বিস্তৃত ছিল–অর্থাৎ তাঁহার গৌড়েশ্বর উপাধি কেবলমাত্র পূৰ্বগৌরবের সূচক অথবা গৌড়রাজ্যে তাঁহার কোনোকালে কোনো প্রকার অধিকার ছিল-ইত্যাদির বিষয়ে কিছুই বলা যায় না। তবে ইহা এক প্রকার স্থির সিদ্ধান্ত করা যাইতে পারে যে, ১১৬২ খৃষ্টাব্দে তাঁহার রাজ্য বিনষ্ট হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ধর্ম্মপাল, দেবপাল, মহীপাল ও রামপালের স্মৃতিবিজড়িত পালরাজ্যের শেষ চিহ্ন বিলুপ্ত হইয়া যায়।
কেহ কেহ পলপাল, ইন্দ্রদ্যুম্নপাল প্রভৃতি দুই-একজন পরবর্ত্তী পাল উপাধিধারী রাজার উল্লেখ করিয়াছেন, কিন্তু ইঁহাদের অস্তিত্ব সম্বন্ধে সন্দেহ করিবার যথেষ্ট কারণ আছে।
১১. বৰ্ম্মরাজবংশ
একাদশ পরিচ্ছেদ –বৰ্ম্মরাজবংশ
একাদশ শতাব্দীর শেষভাগে যখন পালরাজশক্তি ক্রমশ দুর্বল হইয়া পড়িতেছিল তখন পূর্ব্ববঙ্গে বৰ্ম্ম-উপাধিধারী এক রাজবংশের প্রতিষ্ঠা হয় একথা পূর্ব্বেই বলা হইয়াছে। ঢাকা জিলার অন্তর্গত বেলাব গ্রামে প্রাপ্ত একখানি তাম্রশাসনই এই রাজবংশের ইতিহাসের প্রধান অবলম্বন। এই শাসনে বৰ্ম্মরাজগণের বংশপরিচয়ে প্রথমে পৌরাণিক কাহিনী অনুযায়ী ব্রহ্মা হইতে পুত্রপৌত্রাদিক্রমে অত্রি, চন্দ্র, বুধ, পুরূরবা, আয়ু নহুষ, যযাতি ও যদুর, এবং এই যদুবংশে হরির অবতার কৃষ্ণের জন্মের উল্লেখ আছে। এই হরির বান্ধব অর্থাৎ জ্ঞাতি বৰ্ম্মবংশ বৈদিক ধর্ম্মের প্রদান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন এবং সিংহপুরে রাজত্ব করিতেন। এই বংশীয় বজ্ৰবর্ম্মা একাধারে বীর, কবি ও পণ্ডিত ছিলেন। তাঁহার পুত্র জাতবর্ম্মা বহু যুদ্ধে জয়লাভ করিয়া সার্বভৌমত্ব লাভ করিয়াছিলেন। তিনি অঙ্গদেশে স্বীয় ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত করিয়াছিলেন, কামরূপ জয় করিয়াছিলেন, দিব্যের ভুজবল হতশ্রী করিয়াছিলেন, এবং গোবর্দ্ধন নামক রাজাকে পরাজিত করিয়াছিলেন। প্রশস্তিকারের দ্ব্যর্থবোধক শ্লোকের এই উক্তি কত দূর সত্য তাহা বলা যায় না। ঐ শ্লোকে ইহাও বলা হইয়াছে যে তিনি কর্ণের কন্যা বীরশ্রীকে বিবাহ করিয়াছিলেন। ডাহলের কলচুরিরাজ কর্ণ যে পালরাজ্য আক্রমণ করিয়া বঙ্গদেশ পর্য্যন্ত অগ্রসর হইয়াছিলেন এবং অবশেষে পালরাজ তৃতীয় বিগ্রহপালের সহিত স্বীয় কন্যা যৌবনশ্রীর বিবাহ দিয়াছিলেন তাহা পূর্ব্বেই উল্লিখিত হইয়াছে। সুতরাং অসম্ভব নহে যে জাতবর্ম্মা কলচুরিরাজ গাঙ্গেয়দেব ও কর্ণের অধীনস্থ সামন্তরাজরূপে তাঁহাদের সঙ্গে পালরাজ্য আক্রমণ করেন, এবং অঙ্গদেশে পালরাজ ও বরেন্দ্রে কৈবর্ত্যরাজ দিব্যের সহিত যুদ্ধে প্রবৃত্ত হন। তারপর কোনো সুযোগে পূর্ব্ববঙ্গে অধিকার প্রতিষ্ঠিত করিয়া কামরূপ আক্রমণ করেন ও গোবর্দ্ধন নামক বঙ্গদেশীয় কোনো রাজার বিরুদ্ধে অভিযান করেন। অবশ্য এ সকলই বর্ত্তমানে অনুমান মাত্র কারণ ইহার সপক্ষে বিশিষ্ট কোনো প্রমাণ নাই। কিন্তু এইরূপ কোনো অনুমানের আশ্রয় না লইলে সিংহপুর নামক ক্ষুদ্র রাজ্যের অধিপতি জাতবৰ্ম্মা কেবলমাত্র নিজের বাহুবলে অঙ্গ, কামরূপ ও বরেন্দ্রে বিজয়াভিযান করিয়া বঙ্গে এক স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠা করিয়াছিলেন এরূপ বিশ্বাস করা কঠিন।
বৰ্ম্মরাজগণের আদিম রাজ্য সিংহপুর কোথায় ছিল এ বিষয়ে পণ্ডিতগণের মধ্যে মতভেদ আছে। পঞ্জাবের একখানি শিলালিপিতে সিংহপুরের যাদব বংশসস্তৃতা জালন্ধরের এক রাণীর কথা আছে এবং হুয়েন সাংও পঞ্জাবে এক সিংহপুর রাজ্যের উল্লেখ করিয়াছেন। কেহ কেহ অনুমান করেন যে ইহাই পূর্ব্ববঙ্গের যাদববংশীয় বৰ্ম্মরাজগণের আদি বাসভূমি। কলিঙ্গেও এক সিংহপুর রাজ্য ছিল-এই স্থান বর্ত্তমানে সিঙ্গুপুর নামে পরিচিত এবং চিকাকোল ও নরাসন্নপেতার মধ্যস্থলে অবস্থিত। সিংহলদেশীয় গ্রন্থে যে বিজয়সিংহের আখ্যান আছে তাহাতে রাঢ়দেশে এক সিংহপুরের উল্লেখ আছে; ইহা সম্ভবত হুগলী জিলার অন্তর্গত সিঙ্গুর নামক গ্রামে অবস্থিত ছিল। বৰ্মগণের আদি বাসভূমি কলিঙ্গ রাঢ়ের অন্তর্গত সিংহপুরে ছিল ইহাও কেহ কেহ অনুমান করেন। কলিঙ্গের সিংহপুর রাজ্য পঞ্চম হইতে দ্বাদশ শতাব্দী পর্য্যন্ত বিদ্যমান ছিল ইহার বিশেষ প্রমাণ আছে। খুব সম্ভবত জাতবর্ম্মা এই রাজ্যেরই অধিপতি ছিলেন। কলচুরিরাজগণের প্রশস্তি অনুসারে গাঙ্গেয়দেব অঙ্গ ও উৎকলের রাজাকে পরাজিত করেন ও তৎপুত্র কর্ণ গৌড়, বঙ্গ ও কলিঙ্গে আধিপত্য করেন। সুতরাং কলিঙ্গদেশীয় জাতবর্ম্মা কলচুরিরাজগণের অধীনে অঙ্গ, গৌড় ও বঙ্গে যুদ্ধাভিযান করিয়াছিলেন এবং এই সুযোগে বঙ্গে এক স্বাধীন রাজ্য স্থাপন করিয়াছিলেন এরূপ অনুমানই খুব স্বাভাবিক বলিয়া মনে হয়।
