রামপাল ৪২ বৎসরেরও অধিককাল রাজ্য করেন। জ্যেষ্ঠভ্রাতা মহীপালের রাজ্যকালেই তিনি যৌবনে পদার্পণ করেন, অন্যথা তিনি সিংহাসনের জন্য ষড়যন্ত্র করিতেছেন এরূপ অপবাদ বিশ্বাসযোগ্য হইত না। সুতরাং মৃত্যুকালে তাঁহার অন্ত ত ৭০ বৎসর বয়স হইয়াছিল এরূপ অনুমান করা যাইতে পারে। তিনি সম্ভব ১০৭৭ হইতে ১১২০ অব্দ পর্য্যন্ত রাজত্ব করেন।
রামপালের জীবন ও মৃত্যু উভয়ই বিচিত্র। তাঁহার কাহিনী ইতিহাস অপেক্ষা উপন্যাসের অধিক উপযোগী জীবনের প্রারম্ভে জ্যেষ্ঠভ্রাতার অমূলক সন্দেহের ফলে যখন কারাগারে শৃঙ্খলিত অবস্থায় তিনি নিদারুণ শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণা ভোগ করিতেছিলেন, তখন অন্তর্বিপ্লবের ফলে বরেন্দ্রে পালরাজ্যের অবসান হইল। সেই ঘোর দুর্যোগের দিনে অসহায় বন্দী রামপাল কিরূপে জীবন রক্ষা করিয়াছিলেন ইতিহাস তাঁহার কোনো সন্ধান রাখে না। তারপর পিতৃরাজ্য হইতে বিতাড়িত হইয়া কোন নিভূত প্রদেশে তিনি দীর্ঘকাল দুঃসহ মনোব্যথায় জীবন যাপন করিয়াছিলেন তাহাও জানা যায় না। যখন বিপদ আরও ঘনীভূত হইয়া উঠিল এবং সম্ভবত তাঁহার শেষ আশ্রয়টুকুও হস্তচ্যুতে হইবার উপক্রম হইল, তখন ধর্ম্মপাল ও দেবপালের উত্তরাধিকারী এবং প্রথম মহীপালের বংশধর ভারতপ্রসিদ্ধ রাজবংশের এই শেষ মুকুটমণি লজ্জা ঘৃণা ভয় ত্যাগ করিয়া অধীনস্থ সামন্ত রাজগণের দ্বারে দ্বারে সাহায্য ভিক্ষা করিয়া ফিরিতে লাগিলেন। তাঁহার উদ্যম ও অধ্যবসায়ে রাজলক্ষ্মী তাঁহার প্রতি প্রসন্না হইলেন। বরেন্দ্র পুনরধিকৃত হইল, বাংলা দেশের সর্বত্র তিনি প্রভুত্ব প্রতিষ্ঠিত করিলেন এবং কামরূপ ও উৎকল জয় করিলেন। দক্ষিণ দিগ্বিজয় অনন্তবর্ম্মা চোড়গঙ্গ এবং পশ্চিমে চালুক্য ও গাহড়বাল এই তিনটি প্রবল রাজশক্তির বিরুদ্ধে তাঁহাকে সংগ্রাম করিতে হইয়াছিল। তাঁহার বাহুবলে খণ্ড-বিখণ্ড বাংলা দেশে আবার একতা ও সুদৃঢ় রাজশক্তি ফিরিয়া আসিল, বাঙ্গালী আবার সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখিল। নিভিবার ঠিক আবেগ প্রদীপ যেমন উজ্জ্বল হইয়া উঠে রামপালের রাজ্যকালে পালরাজ্যের কীৰ্তিশিখাও তেমনি শেষবারের মতো জ্বলিয়া উঠিল। রামপালের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই পালবংশের গৌরবরবি চিরদিনের তরে অস্তমিত হইল।
১০. পালরাজ্যের ধ্বংস
দশম পরিচ্ছেদ –পালরাজ্যের ধ্বংস
রামপালের মৃত্যুর পর তাঁহার পুত্র কুমারপাল রাজা হইলেন। রামচরিতে উক্ত হইয়াছে যে রামপালের দুই পুত্র বিত্তপাল ও রাজ্যপাল বরেন্দ্রের বিদ্রোহ দমনে যথেষ্ট সাহায্য করিয়াছিলেন। রামপালের আর এক পুত্র মদনপাল পরে পালরাজ্যের রাজা হইয়াছিলেন। রামপালের এই চারি পুত্রের মধ্যে কে সৰ্ব্বজ্যেষ্ঠ ছিলেন, এবং কোন অধিকারে কুমারপাল পিতার মৃত্যুর পর সিংহাসনের আরোহণ করিয়াছিলেন তাহা সঠিক জানিবার উপায় নাই।
কুমারপালের রাজত্বকালে (আ ১১২০-১১২৫) দক্ষিণবঙ্গে বিদ্রোহ হইয়াছিল এবং তাঁহার প্রাণাপেক্ষা প্রিয়তর বন্ধু প্রধান অমাত্য” বৈদ্যদেব নৌযুদ্ধে বিদ্রোহীগণকে পরাজিত করিয়াছিলেন। ইহার কিছুদিন পরেই পূৰ্ব্বভাগে, সম্ভবত কামরূপে, তিগ্যদেব বিদ্রোহী হইয়াছিলেন এবং বৈদ্যদেব তাঁহাকে পরাজিত করিয়া সেই রাজ্যের রাজা হইয়াছিলেন। পরবর্ত্তীকালে, সম্ভবত কুমারপালের মৃত্যুর পর, বৈদ্যদেব কামরূপে স্বাধীনভাবে রাজ্য করেন। কুমারপালের পর তাঁহার পুত্র তৃতীয় গোপাল রাজা হন। তাঁহার রাজত্বকালের (আ ১১২৫-১১৪০) কোনো ঘটনাই জানা যায় না। কিন্তু পালরাজ্যের অন্তর্বিদ্রোহ সম্ভবত এই সময় আরও বিস্তৃত হয়। পূর্ব্ববঙ্গে বৰ্মণ রাজারা স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। সুযোগ পাইয়া দক্ষিণ হইতে গঙ্গরাজগণ পালরাজ্য আক্রমণ করেন। ১১৩৫ অব্দের পূর্ব্বে অনন্তবর্ম্মা চোড়গঙ্গ মেদিনীপুর ও হুগলী জিলার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হইয়া গঙ্গাতীরবর্ত্তী মন্দার প্রদেশ পর্য্যন্ত জয় করেন। তিনি যে মিথুনপুর ও আরম্য দুর্গ অধিকার করেন তাহা সম্ভবত আধুনিক মেদিনীপুর ও আরামবাগ (হুগলী জিলা)। দাক্ষিণাত্যের চালুক্য রাজগণও পশ্চিমবঙ্গ আক্রমণ করেন এবং ইহার ফলে রাদেশের সেনরাজবংশ প্রবল হইয়া ওঠে। গাহড়বাল রাজগণও মগধ আক্রমণ করিয়া পাটনা পৰ্য্যন্ত অধিকার করেন।
তৃতীয় গোপালের মৃত্যুর পর মদনপাল যখন সিংহাসনে আরোহণ করেন তখন এইরূপে আভ্যন্তরিক বিদ্রোহ ও বহিঃশত্রুর আক্রমণে পালরাজ্য দ্রুতবেগে ধ্বংসের পথে অগ্রসর হইতেছিল। মদনপাল চতুর্দিকে শত্রু কর্ত্তৃক আক্রান্ত হইয়া পালরাজ্য রক্ষার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করিলেন কিন্তু সমর্থ হইলেন না। রামচরিতের একটি শ্লোক হইতে অনুমিত হয় যে তিনি অনন্তবর্ম্মা চোড়গঙ্গের সহিত যুদ্ধে কিছু সফলতা লাভ করিয়াছিলেন। কিন্তু এই সময়ে গাহড়বালগণ আরও অগ্রসর হইয়া মুঙ্গের নগরী পৰ্য্যন্ত অধিকার করে। অনেক চেষ্টার পরও মদনপাল এই অঞ্চল শহস্ত হইতে পুনরুদ্ধার করেন। কিন্তু শ্রীঘই তাঁহাকে অন্যান্য শক্রর বিরুদ্ধে অগ্রসর হইতে হয়। গোবর্দ্ধন নামক এক রাজাকে তিনি পরাজিত করেন। সম্ভবত ইনি বাংলার কোনো অঞ্চলে এক স্বাধীন রাজ্য স্থাপন করিয়াছিলেন। আর এক প্রবল শক্র মদনপালের বহু সৈন্য নষ্ট করিয়াছিল। মদনপাল বহু কষ্টে তাহাকে কালিন্দী নদীর তীর পর্য্যন্ত হঠাইয়া দেন। এই নদী সম্ভবত মালদহের নিকটবর্ত্তী কালিন্দী নদী। এইরূপে যে শক্ররাজা গৌড় দেশের একাংশ জয় করিয়া প্রায় পালরাজধানী পৰ্য্যন্ত অগ্রসর হইয়াছিলেন তিনি সম্ভবত সেনরাজ বিজয় সেন। বিজয় সেনের শিলালিপি হইতে জানা যায় যে, তিনি গৌড়রাজকে বিতাড়িত করিয়াছিলেন এবং গৌড়রাজ্যের অন্তত কিয়দংশ অধিকার করিয়াছিলেন। এই পরাজিত গৌড়রাজ যে মদনপাল সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নাই। মদনপাল আনুমানিক ১১৪০ হইতে ১১৫৫ অব্দ পর্য্যন্ত রাজত্ব করেন।
