.
২. রামপাল
দ্বিতীয় মহীপাল যখন বিদ্রোহ দমন করিতে অগ্রসর হন তখন তাঁহার দুই কনিষ্ঠ ভ্রাতা শূরপাল ও রামপাল কারাগারে আবদ্ধ ছিলেন তাহা পূর্ব্বেই বলা হইয়াছে। মহীপালের পরাজয় ও মৃত্যুর পর তাঁহারা কিরূপে মুক্তি লাভ করিয়া বরেন্দ্র হইতে পলায়ন করেন রামচরিতে তাঁহার কোনো উল্লেখ নাই। পলায়ন করিবার পর পালরাজ্যের কোনো এক অংশে, সম্ভবত মগধে, শূরপাল রাজসিংহাসনে আরোহণ করেন। তাঁহার রাজ্যকালের কোনো বিবরণই জানা যায় নাই। সম্ভবত তিনি খুব অল্পকালই রাজত্ব করিয়াছিলেন এবং তারপর রামপাল রাজা হন।
রামপাল রাজা হইয়া বরেন্দ্র উদ্ধার করিবার প্রয়াস করিয়াছিলেন কিন্তু বিফল মনোরথ হইয়া বহুদিন নিশ্চেষ্ট ছিলেন। তারপর আবার এক গুরুতর বিপদ উপস্থিত হইলে পুত্র ও অমাত্যগণের সহিত পরামর্শ করিয়া বিপুল উদ্যমে কার্যক্ষেত্রে অবতীর্ণ হইলেন। এই গুরুতর বিপদ কী, রামচরিতকার তাঁহার উল্লেখ করেন নাই। সম্ভবত দিব্য কর্ত্তৃক আক্রমণই এই বিপদ এবং রাজ্যের অবশিষ্ট অংশ হারাইবার ভয়েই বিচলিত হইয়া রামপাল পুনরায় দিব্যের প্রতিরোধ করিতে কৃতসংকল্প হইলেন।
দিব্যের বিরুদ্ধে সৈন্য সংগ্রহের জন্য রামপাল সামন্তরাজগণের দ্বারে দ্বারে ঘুরিতে লাগিলেন। অর্থ ও সম্পত্তির প্রলোভনে অনেকেই তাঁহাকে সাহায্য করিতে স্বীকৃত হইল। এইরূপে বহুদিনের চেষ্টায় রামপাল অবশেষে বিপুল এক সৈন্যদল সংগ্রহ করিতে সমর্থ হইলেন।
রামপালের প্রধান সহায় ছিলেন তাঁহার মাতুল রাষ্ট্রকূটকুলতিলক মথন। ইনি মহন নামেও প্রসিদ্ধ ছিলেন। তিনি দুই পুত্র মহামাগুলিক কাহুরদেব ও সুবর্ণদেব এবং ভ্রাতৃম্পুত্র মহাপ্রতীহার শিবরাজ প্রভৃতিকে সঙ্গে লইয়া আসিলেন। অপর যে সমুদয় সামন্তরাজ রামপালকে সৈন্য দ্বারা সাহায্য করিয়াছিলেন তাঁহাদের মধ্যে নিম্নলিখিত কয়েকজনের নাম রামচরিতে পাওয়া যায়। রামচরিতের টীকায় ইহাদের রাজ্যের নামও দেওয়া আছে কিন্তু তাঁহার অনেকগুলির অবস্থান নির্ণয় করা যায় না।
১। ভীমযশ-ইনি মগধ ও পীঠীর অধিপতি ছিলেন এবং কান্যকুব্জরাজের সৈন্য পরাস্ত করিয়াছিলেন।
২। কোটাটবীর রাজা বীরগুণ।
৩। দণ্ডভুক্তির রাজা জয়সিংহ। দণ্ডভুক্তির মেদিনীপুর জিলায় অবস্থিত ছিল।
৪। দেবগ্রামের রাজা বিক্রমরাজ।
৫। অরণ্য প্রদেশস্থ সামন্তবর্গের চূড়ামণি অপরমারের (হুগলী জিলান্তৰ্গত) অধিপতি লক্ষ্মীশূর।
৬। কুজবটীর (সাঁওতাল পরগণা) রাজা শূরপাল।
৭। তৈলকম্পের (মানভূম) রাজা রুদ্রশিখর।
৮। উচ্ছলের রাজা ভাস্কর অথবা ময়গলসিংহ।
৯। ঢেক্করীরাজ প্রতাহসিংহ।
১০। (বর্ত্তমান রাজমহলের নিকটবর্ত্তী) কয়ঙ্গলমণ্ডলের অধিপতি নরসিংহাৰ্জ্জুন।
১১। সঙ্কট গ্রামের রাজা চণ্ডাৰ্জ্জুন।
১২। নিদ্রাবলীর রাজা বিজয়রাজ।
১৩। কৌশাম্বীর রাজা দ্বোরপবর্দ্ধন। কৌমাঘী সম্ভবত রাজসাহী অথবা বগুড়া জিলায় অবস্থিত ছিল।
১৪। পদুবহুবার রাজা সোম।
এই সমুদয় ব্যতীত আরও অনেক সামন্তরাজ রামপালের সহিত যোগ দিয়াছিলেন-রামচরিতে তাঁহাদের সাধারণভাবে উল্লেখ আছে, নাম দেওয়া নাই। ইহার মধ্যে যে সমুদয় সামন্তরাজ্যের অবস্থিতি মোটামুটি জানা যায় তাঁহার বিশ্লেষণ করিলে দেখা যাইবে যে প্রধানত মগধ ও রাঢ়দেশের সামন্তগণই রামপালের পক্ষ অবলম্বন করিয়াছিলেন।
রামপাল সম্ভবত দক্ষিণবঙ্গ হইতে বরেন্দ্র আক্রমণ করেন। সমস্ত সামন্ত রাজগণের সৈন্য একত্রিত করিয়া তিনি প্রথমে মহাপ্রতীহার শিবরাজকে একদল সৈন্যসহ প্রেরণ করেন। এই সৈন্যদল গঙ্গা নদী পার হইয়া বরেন্দ্রভূমি বিধ্বস্ত করে। এইরূপে গঙ্গার অপর তীর সুরক্ষিত করিয়া রামপাল তাঁহার বিপুল সৈন্যদল লইয়া বরেন্দ্রভূমি আক্রমণ করেন। এইবার কৈবৰ্তরাজ ভীম সসৈন্যে রামপালকে বাধা দিলেন এবং দুই দলে ভীষণ যুদ্ধ হইল। রামচরিতে নয়টি শ্লোকে এই যুদ্ধের বর্ণনা আছে। রামপাল ও ভীম উভয়ই বিশেষ বিক্রম প্রদর্শন করেন এবং পরস্পরের সম্মুখীন হইয়া যুদ্ধ করেন। কিন্তু হস্তীপৃষ্ঠে যুদ্ধ করিতে করিতে দৈববিড়ম্বনায় ভীম বন্দী হইলেন। ইহাতে তাঁহার সৈন্যদল ছত্রভঙ্গ হইয়া পড়িল। যদিও হরি নামক তাঁহার এক সুহৃদ পুনরায় তাঁহার সৈন্যগণকে একত্র করিয়া যুদ্ধ করেন এবং প্রথমে কিছু সফলতাও লাভ করেন, তথাপি পরিশেষে রাজপালেরই জয় হইল। রামপাল ভীমের কঠোর দণ্ড বিধান করিলেন। ভীমকে বধ্যভূমিতে নিয়া প্রথমেই তাঁহার সম্মুখেই তাঁহার পরিজনবর্গকে হত্যা করা হইল। তারপর বহু শরাঘাতে ভীমকেও বধ করা হইল। এইরূপে কৈবৰ্ত্তনায়কের বিদ্রোহ ও ভীমের জীবন অবসান হইল।
বহুদিন পরে রামপাল আবার পিতৃভূমি বরেন্দ্রী ফিরিয়া পাইয়া প্রথমে ইহার শান্তি ও শৃঙ্খলা ফিরাইয়া আনিতে যত্নবান হইলেন। তিনি প্রজার করভার লাঘব এবং কৃষির উন্নতি বিধান করিলেন। তারপর রামাবতী নামক নতুন এক রাজধানী প্রতিষ্ঠা করিলেন। এই রামাবতী নগরী সম্ভবত মালদহের নিকটবর্ত্তী ছিল।
এইরূপে পিতৃভূমি বরেন্দ্ৰীতে স্বীয় শক্তি সুপ্রতিষ্ঠিত করিয়া রামপাল নিকটবর্ত্তী রাজ্যসমূহ জয় করিয়া পালসাম্রাজ্যের লুপ্ত গৌরব উদ্ধার করিতে যত্নবান হইলেন।
বিক্রমপুরের বৰ্ম্মরাজ সম্ভবত বিনা যুদ্ধেই রামপালের বশ্যতা স্বীকার করিলেন। রামচরিতে উক্ত হইয়াছে যে পূৰ্ব্বদেশীয় বৰ্ম্মরাজ নিজের পরিত্রাণের জন্য উৎকৃষ্ট হস্তী রথ উপঢৌকন দিয়া রামপালের আরাধনা করিলেন।
