সন্ধ্যাকরনন্দী বিরচিত রামচরিত কাব্যে এই বিদ্রোহ ও তাঁহার পরবর্ত্তী ঘটনা সবিস্তারে বর্ণিত হইয়াছে। বাংলার ইতিহাসে এই গ্রন্থখানি অমূল্য-কারণ বাংলার আর কোনো রাজনৈতিক ঘটনার এরূপ বিস্তৃত বিবরণ আমরা কোথাও পাই না। সন্ধ্যাকরনন্দীর পিতা এই সমুদয় ঘটনার কালে উচ্চ রাজকার্যে নিযুক্ত ছিলেন এবং তিনি নিজেও ইহার অধিকাংশ প্রত্যক্ষ করিয়াছিলেন। সুতরাং সমুদয় ঘটনা যথাযথভাবে জানিবার তাঁহার বিশেষ সুযোগ ছিল। কিন্তু দুঃখের বিষয় এই কাব্যখানির সম্যক অর্থ গ্রহণ করা অতিশয় কঠিন। ইহার প্রধান কারণ এই যে কাব্যখানি দ্ব্যর্থবোধক। ইহার প্রতি শ্লোকের দুই প্রকার অর্থ আছে। এক অর্থে ধরিলে কাব্যখানিতে রামায়ণে বর্ণিত রামচন্দ্রের আখ্যান এবং অন্য অর্থে পালরাজগণের, প্রধানত রামপালের, ইতিহাস পাওয়া যায়। দ্বিবিধ অর্থব্যঞ্জনার জন্য শ্লোকগুলির শব্দযোজনা এমনভাবে করিতে হইয়াছে যে সহজে তাহা বিশ্লেষণ করা যায় না। এই জন্যই কবির জীবিতকালেই, অথবা তাঁহার অল্পদিন পরেই, এই কাব্যের একটি টীকা রচিত হয়। তাহাতে দুইপক্ষের অন্বয় ও ব্যাখ্যা দেওয়া হইয়াছে। দুর্ভাগ্যের বিষয় মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী নেপালে এই কাব্যের যে একমাত্র পুঁথি আবিষ্কার করেন তাহাতে সম্পূর্ণ মূল গ্রন্থ ও টীকার এক অংশমাত্র পাওয়া যায়। যে অংশের শ্লোকের প্রকৃত ব্যাখ্যা, বিশেষত তাঁহার মধ্যে ঐতিহাসিক ঘটনার যে সমুদয় ইঙ্গিত বা অভ্যাস আছে তাঁহার মর্ম গ্রহণ করা সৰ্ব্বত্র সম্ভবপর হয় নাই। মূল টীকার সাহায্যে মূল গ্রন্থ হইতে বরেন্দ্রের বিদ্রোহ ও রামপাল কর্ত্তৃক বরেন্দ্রের পুনরাধিকার সম্বন্ধে যাহা জানা যায় পরবর্ত্তী অধ্যায়ে তাহা বিবৃত হইবে।
০৯. তৃতীয় পালসাম্রাজ্য
নবম পরিচ্ছেদ –তৃতীয় পালসাম্রাজ্য
১. বরেন্দ্র-বিদ্রোহ
যে বিদ্রোহের ফলে দ্বিতীয় মহীপালরাজ্য ও প্রাণ হারাইলেন কৈবর্ত্তনায়ক দিব্যের সাহিত তাঁহার কোনো সম্বন্ধ ছিল কি না তাহা নির্ণয় করা কঠিন। রামচরিতের একটি শ্লোকে এরূপ ইঙ্গিত আছে যে দিব্য মহীপালের অধীনে উচ্চরাজকার্যে নিযুক্ত ছিলেন। রামচরিতে ইহাও স্পষ্ট উল্লিখিত হইয়াছে যে দিব্য মহীপালকে হত্যা করিয়া বরেন্দ্রভূমি অধিকার করিয়াছিলেন। সুতরাং প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষভাবে যে দিব্যি এই বিদ্রোহের সহিত সংশ্লিষ্ট ছিলেন ইহা অনুমান করা স্বাভাবিক। কিন্তু দিব্যের সহিত বিদ্রোহীদের কোনো প্রকার যোগাযোগ ছিল এরূপ কোনো কথা রামচরিতে নাই। সুতরাং অসম্ভব নহে যে দিব্য প্রথমে মহীপালের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে যোগদান করেন নাই কিন্তু বিদ্রোহীদের হস্তে পরাজয়ের পর মহীপালকে হত্যা করিয়া তিনি বরেন্দ্রী অধিকার করিয়াছিলেন। রামচরিতে দিব্যকে দস্যু ও ‘উপব্ৰিতী’ বলা হইয়াছে টীকাকার উপব্ৰিতীর অর্থ করিয়াছেন ‘ছদ্মব্ৰিতী’। কেহ কেহ ইহা হইতে সিদ্ধান্ত করিয়াছেন যে দিব্য কর্তব্যবশে বিদ্রোহী সাজিয়া মহীপালকে হত্যা করিয়াছিলেন। কিন্তু এরূপ অর্থ সঙ্গত মনে হয় না। দস্যু ও উপব্ৰিতী হইতে বরং ইহাই মনে হয় যে রামচরিতকারের মতে দিব্য প্রকৃতই দস্যু ছিলেন, কিন্তু দেশহিতের ভান করিয়া রাজাকে হত্যা করিয়াছিলেন। বস্তুত রামচরিত কাব্যের অন্যত্রও দিব্যের আচরণ কুৎসিত ও নিন্দনীয় বলিয়া ব্যাখ্যাত হইয়াছে। কিছুদিন পর্য্যন্ত বাংলার একদল লোক বিশ্বাস করিতেন যে দিব্য অত্যাচারী মহীপালকে বধ করিয়া দেশরক্ষা করিয়াছিলেন এবং তাঁহার এই মহৎ কার্যের জন্য জনসাধারণ কর্ত্তৃক রাজা নিৰ্বাচিত হইয়াছিলেন। তাঁহারা দিব্যকে মহাপুরুষ সাজাইয়া উত্তরবঙ্গের নানা স্থানে প্রতি বৎসর “দিব্য-স্মৃতি উৎসবের ব্যবস্থা করিতেন। কিন্তু রামচরিতে ইহার কোনো সমর্থনই পাওয়া যায় না। অবশ্য পালরাজগণের কর্ম্মচারী সন্ধ্যাকরনন্দী দিব্য সম্বন্ধে বিরুদ্ধ ভাব পোষণ করিবেন ইহা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু রামচরিত ব্যতীত দিব্য সম্বন্ধে জানিবার আর কোনো উপায় নাই। সুতরাং রামচরিতকার তাঁহার চরিত্রে যে কলঙ্ক লেপন করিয়াছেন তাহা পুরোপুরি সত্য বলিয়া গ্রহণ না করিলেও দিব্যকে দেশের ত্রাণকর্ত্তা মহাপুরুষ মনে করিবার কোনোই কারণ নাই।
দিব্য নিষ্কণ্টকে বরেন্দ্রের রাজ্য ভোগ করিতে পারেন নাই। পূর্ব্ববঙ্গের বৰ্ম্মবংশীয় রাজা জাতবর্ম্মা তাঁহাকে পরাজিত করিয়াছিলেন; কিন্তু এই বিরোধের হেতু বা বিশেষ কোনো বিবরণ জানা যায় না। রামপাল বরেন্দ্র উদ্ধার করিবার চেষ্টা করিয়াছিলেন কিন্তু পারেন নাই-বরং দিব্য রামপালের রাজ্য আক্রমণ করিয়া তাঁহাকে ব্যতিব্যস্ত করিয়াছিলেন। যদিও রামচরিতে দিব্যের রাজ্যকালের কোনো ঘটনার উল্লেখ নাই, তথাপি যিনি জাতবর্ম্মা ও রামপালের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিয়া বরেন্দ্রী রক্ষা করিতে পারিয়াছিলেন তিনি যে বেশ শক্তিশালী রাজা ছিলেন এবং বরেন্দ্রে তাঁহার প্রভুত্ব বেশ দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল তাহা স্বীকার করিতেই হইবে। দিব্যের মৃত্যুর পর তাঁহার ভ্রাতা রুদোক এবং তৎপরে রুদোকের পুত্র ভীম বরেন্দ্রর সিংহাসনে আরোহণ করেন। রামচরিতে ভীমের প্রশংসাসূচক কয়েকটি শ্লোক আছে এবং তাঁহার রাজ্যের শক্তি ও সমৃদ্ধির বর্ণনা আছে। সুতরাং দিব্য স্বীয় প্রভু ও রাজাকে বধ করিয়া যে মহাপাতক করিয়াছিলেন বরেন্দ্রে একটি শক্তিশালী রাজ্য প্রতিষ্ঠাপূৰ্ব্বক তথায় সুখ-শান্তি ফিরাইয়া আনিয়া তাঁহার কতক প্রায়শ্চিত্ত করিয়াছিলেন। দিনাজপুরের কৈবর্ত্তস্তম্ভ (চিত্র নং ১ক) আজিও রাজবংশের স্মৃতি বহন করিতেছে।
