এ সব ভাবনাচিন্তার বাইরে। কেউ কিছু ভাবে না। যে যার নিজের কথা ভাবে। নিজের সমস্যার নিজেকেই সমাধান করতে হয়।
ধ্রুব ভেবে রেখেছে যেমন করে তোক একটা ফ্ল্যাট কিনবে। টাকা জমানোর চেষ্টাও করছে। কিন্তু তার দামও তত বাড়ছে চড়চড় করে। নাগাল পাবে কি না কে জানে।
রাখালবাবুর সঙ্গে সম্পর্কটা এখন আর তেমন নেই। অথচ প্রথম প্রথম কত অন্তরঙ্গতা। ওঁর দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রীও দু-একবার এসেছেন।
ধ্রুবর, প্রীতির ভালই লেগেছিল।
তারপরই একটা ব্যাপার ঘটে গেল।
রাখালবাবু একদিন রাস্তায় ধরলেন ধ্রুবকে। মর্নিং ওয়াক করে ফিরছিলেন, ধ্রুব ফিরছে বাজার থেকে।
রাখালবাবু চারপাশ দেখে নিয়ে গলার স্বর নামিয়ে বললেন, একটা কথা ভাবছিলাম।
ধ্রুব সপ্রশ্ন চোখে তাকাল ওঁর দিকে।
রাখালবাবু একমুখ হেসে বললেন, তোমরা তো সোয়া দুজন লোক, তিন-তিনখানা ঘর নিয়েছ। অনেক জায়গা।
ধ্রুবর বুকের ভিতরটা ধক করে উঠল। একটা ঘর ছেড়ে দিতে বলবে নাকি? নাকি আবার কোনও অজুহাত দেখিয়ে আবার ভাড়া বাড়াতে বলবে।
ভয় পাওয়া মুখে ও শুধু তাকিয়ে রইল।
রাখালবাবু ট্রাউজার্সের দু পকেটে দুখানা হাত ঢুকিয়ে একেবারে আধুনিক ছোকরা হবার ভঙ্গিতে দাঁড়ালেন পা ফাঁক করে। ওঁকে অবশ্য এ সব একেবারেই মানায় না, তার ওপর পায়ের ঘের বড় বেশি ঢিলেঢালা। মানুষটার মতোই।
বললেন, তোমাদের অসুবিধে কিছু হবে না। মানে…
ধ্রুব অধৈর্য হয়ে বললে, বলুন না, কি বলতে চান।
রাখালবাবু বললেন, আমার একটা লোহার সিন্দুক আছে, তোমাদের ঘরে রাখতাম। কখনো-সখনো হয়তো এসে খুলব, কাগজপত্র রাখব…
ধ্রুব প্রায় বলে ফেলেছিল, তাতে আর আপত্তি কি!
আসলে উনি যে একখানা ঘর ছিনিয়ে নিতে চাইছেন না, সেটুকু জেনেই ও খুশি হয়ে উঠেছিল।
কিন্তু পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে বললে, প্রীতিকে একবার জিগ্যেস করে দেখি।
–সিন্দুক রাখবে আমার ঘরে? প্রীতি শুনেই স্তম্ভিত হয়ে গেল।
রেগে গিয়ে বললে, সঙ্গে সঙ্গে জানিয়ে দিতে পারলে না যে ও-সব চলবে না।
ধ্রুব ওর রাগ দেখে হেসে ফেলল। বললে, বলব বলব, এত তাড়া কিসের।
প্রীতি বললে, বুঝতে পারছ না, ব্ল্যাকের টাকা রাখবে, আর নয়তো কাঁড়ি কাঁড়ি সোনা। সার্চ হলে তো ওর বাড়ি সার্চ হবে। কিছুই পাবে না।
ধ্রুব বললে, আর আমাদের বাড়ি সার্চ করে যদি পায় আমরা ধরা পড়ব। ওর জিনিস প্রমাণ করতেই পারব না।
বলে দুজনেই হেসে উঠল।
পরের দিনই রাখালবাবুকে জানিয়ে দিল ধ্রুব। জানিয়ে দিয়ে তবে স্বস্তিযেন দেরি হলে জোর-জবরদস্তি সিন্দুকটা ঢুকিয়ে দিতেন উনি।
বললে, প্রীতি রাজি হচ্ছে না। আপনি ব্যাঙ্কের লকারে রাখছেন না কেন? ওখানে রাখুন। উল্টে উপদেশ দিয়ে দিল ও, যেন সে কথা রাখালবাবু জানেন না।
মনোমালিন্যের সূত্রপাত তখন থেকেই। বেশ বোঝা গেল, রাখালবাবু রেগে গেছেন। কিন্তু মুখে হাসিটা লেগেই রইল।
সপ্তাহখানেক বাদেই একটা ঘটনা ঘটল।
ধ্রুবর নিজের টেলিফোন নেই। প্রয়োজনও হয় না। রাখালবাবু অবশ্য প্রথম দিকে, যখন খুব সদ্ভাব, বলেছিলেন, দরকার হলে আমার ওখান থেকেই করো।
ধ্রুব কখনও করেনি। প্রয়োজনই হয়নি। আর রাখালবাবুর টেলিফোনের নম্বরটাও জেনে রাখেনি।
ধ্রুব অফিসেই দাদার ফোন পেল।–বাবার খুব শরীর খারাপ, একবার আসিস।
ধ্রুব তাড়াতাড়ি অফিস থেকে বেরিয়ে পড়ল।
হরিশ মুখার্জি রোডের বাড়িতে ইদানীং ওর যাওয়া হয়ে ওঠে না। পনেরো বিশ দিন পরপর যায়। রবিবার তো একটাই ছুটির দিন, কখনো সিনেমা থিয়েটার, কখনো টি ভি-তে ভাল ছবি থাকে। বন্ধুবান্ধবের বাড়ি, নেমন্তন্ন। সময়ই পায় না।
তাই বাবার শরীর খারাপ শুনেই ধ্রুব বিচলিত বোধ করল। কেমন একটা অন্যায়বোধ। দু সপ্তাহ কোনও খবরই রাখেনি। তেমন গুরুতর কিছু নয় তো?
ভাবল, প্রীতি আর টিপুকে নিয়ে যাওয়া উচিত।
এসেই প্রীতিকে বললে, শিগগির তৈরি হয়ে নাও, বাবার খুব অসুখ। দাদা ফোন করেছিল।
ওদের নিয়ে বড় রাস্তার মোড়ে এসে একটা ট্যাক্সি পেয়ে গেল।
বাড়ির সামনে পৌঁছেই দেখল ডাক্তারের গাড়ি। কাচের ওপর লাল ক্রশ।
দ্রুত ওপরে উঠে গেল ও। সিমলিকে দেখতে পেয়েই জিগ্যেস করল, কেমন আছেন রে!
সিমলি দৌড়ে এসে টিপুকে কোলে নিল। প্রীতিকে বললে, কতদিন পরে এলে কাকিমা! তোমাদের একটু আসতেও ইচ্ছে হয় না।
আধখানা সিঁড়ি উঠতেই ধ্রুব দেখতে পেল ডাক্তারবাবু নামছেন।
ও সরে দাঁড়াল। দু-চারটে কথা শুনল। উনি বেরিয়ে গেলেন।
সিমলি এতক্ষণে ওর কথার জবাবে বললে, দুপুরে তো বড় ডাক্তার এসেছিল। কাল যে কি অবস্থা গেছে ভাবতে পারবে না।
ওপরে উঠে এসে বাবার খাটের পাশে দাঁড়াল। কেমন একটা ঘোরের মধ্যে শুয়ে আছেন।
দাদা ডাক্তারবাবুকে বিদায় দিয়ে ফিরে এসে বললে, সকালে এত ছুটোছুটি গেছে, তোকে খবর দিতে পারিনি।
তারপর বললে, কিডনির রোগ। দুপুরে ডাক্তার দা এসেছিলেন, বললেন, ভয়ের কিছু নেই। এখন ভালর দিকে। দিন সাতেক আগে থেকেই, আমরা ভেবেছিলাম ঠাণ্ডা লেগে জ্বর…
ধ্রুবকে যে আরো আগে খবর দেওয়া হয়নি সেজন্যেই যেন দাদার এত সঙ্কোচ।
ধ্রুবর নিজেরও খারাপ লাগছিল। মনে হচ্ছিল, ওকেই সব শেষে খবর দেওয়া হয়েছে। বাড়ি ভর্তি লোকজন। মামা মাসিমাও এসে গেছেন। পিসিমাকেও দেখেছে। ওদের আগে খবর না দিলে এসে পড়ল কি করে। ওরা অবশ্য, ধ্রুব আগে যে ঘরে থাকত, সেই ঘরে বসে গল্প করছে। যেন গল্প করতেই আসা। দু বৌদি ওদের চা বানানো, খাবার দাবার নিয়ে ব্যস্ত। বাড়িতে একটা গুরুতর অসুখ না হলে আত্মীয়স্বজনের আজ্ঞা জমে না। যাদের সঙ্গে কালেভদ্রে দেখা হয়, এই সুযোগে তাদের রীতিমত একটা রি-ইউনিয়ন।
