বড়বৌদি মেজবৌদি খুব অন্তরঙ্গ হয়ে কথা বলে, যেতে না যেতে চা করে নিয়ে আসে, প্লেটে করে খাবার।—আহা, তুমি তো আপিস থেকে আসছ।
মেজবৌদি একদিন হেসে বলেছিল, বাড়ি থেকে যদি আসতে, দিতাম নাকি? স্রেফ এক কাপ চা। খাওয়াতে হয় সে মুখপুড়ি খাইয়ে পাঠাবে, আমি কেন দেব।
কথাগুলো খুব আপন আপন মনে হত।
মেজবৌদিও মাঝেমধ্যে ধ্রুবদের কাছে বেড়াতে আসে। সিমলিকে সঙ্গে নিয়ে। সিমলি কেমন চড়চড় করে বড় হয়ে গেল।
কলিং বেল বাজাতেই ধ্রুব ভেবেছিল মেজবৌদি এসেছে। রবিবারের দুপুরে, এ সময়ে আর কেই বা আসতে পারে। প্রীতিদের বাড়ি থেকে কেউ এলে সন্ধের দিকে আসে।
প্রীতি দরজা খুলতে গেল। খুলেই, ও মা আপনি? কি ভাগ্যি।
কথা শুনেই বিছানা ছেড়ে ধ্রুবও এগিয়ে গেল।
তারপরই বলে উঠল, ছোটমাসি, তুমি। এতকাল পরে হঠাৎ? পিছনে ছোটমেসো, হেসে বললে, পর্বত তো মহম্মদের কাছে যাবে না।
আসলে ছোটমাসিকে দেখে অবাক হবার কথা নয়। আগেও একবার এসেছে। অবাক করেছে ছোটমেসো। এই প্রথম।
ওদের বসার ঘরে বসিয়ে প্রীতি বাচ্চা চাকরটাকে ফিসফিস করে কী বললে, টাকা দিল।
মিষ্টি আনতে পাঠাল।
ছোটমাসি বোধহয় বসার ঘরে বসেই টের পেল। চিৎকার করে বললে, এই ধ্রুব, বৌকে বারণ কর, কিছু যেন না আনায়। আমরা এইমাত্র খেয়ে এলাম।
কিন্তু প্রীতি সে-কথায় কান দিল না।
অনেক হাসাহাসি-গল্পগুজবের পর ছোটমেসো ঘুরে ঘুরে ঘর কখানা দেখল, রান্নাঘরে উঁকি দিল, একবার বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল। রোদ্দুরের জন্যে চলে এল।
বারান্দায় রেলিং ধরে একটা লতানে মানি প্ল্যান্ট অনেক কষ্টে বাঁচিয়ে রেখেছে প্রীতি, কয়েকটা ঝোলানো টবে ফুলের গাছ।
ছোটমেসো হেসে বললে, বাড়িতে মানিপ্ল্যান্ট রাখলে নাকি খুব টাকা হয়? কি বৌ, সত্যি?
প্রীতি হেসে উঠল।–প্রচুর। রাখার জায়গা পাচ্ছি না।
ছোটমেসো বললে, নাঃ, চমৎকার ফ্ল্যাট, চমৎকার।
আর তখনই ছোটমাসি বললে, নিজে তো দিব্যি এমন একটা ফ্ল্যাট বাগিয়ে নিয়েছিস ধ্রুব, আমাদের একটা জোগাড় করে দে না।
এই ব্যাপার! সেজন্যেই আসা।
প্রীতি বললে, কেন মাসিমা, আপনাদের ও বাড়ি কি হল?
ছোটমাসি দুঃখী দুঃখী মুখ করে বললে, সে আব বলিস না। তোর ছোটমেসো বলছে। উকিল ওকে ড়ুবিয়েছে, উকিল বলছে তোর ছোটমেসো ড়ুবিয়েছে। মামলা তো হেরে গেছি, মাত্র এক বছর সময় দিয়েছিল…
-সে কি! আজকাল আবার মামলায় হবে নাকি কেউ? ধ্রুব অবিশ্বাসের সুরে বললে।
আর সঙ্গে সঙ্গে ছোটমাসি ধ্রুবর হাত দুখানা ধরে বললে, দ্যাখ না বাবা তুই, আমরা তো খুঁজে খুঁজে হন্যে হয়ে গেলাম।
ছোটমেসো জিগ্যেস করল, তোমাদের ফ্ল্যাটের কত ভাড়া ধ্রুব?
-সাড়ে চারশো। আগে চারশো ছিল, পঞ্চাশ টাকা বাড়াতে হয়েছে।
ছোটমেসো বলে উঠল, মাত্র?
তারপরই বললে, খুব সময়মতো পেয়ে গিয়েছিলে। এখন আটশো হাজারেও পাবে না, তার ওপর দশ বিশ হাজার অ্যাডভান্স। তাও তো পাচ্ছি না।
এবার ধ্রুবরই অবাক হবার পালা। বাড়ি ভাড়ার কোনও খবরই রাখত না ও। জানার প্রয়োজনও হয়নি।
এই ফ্ল্যাটের ভাড়া এখন আটশো কিংবা হাজার! শুনে ভালই লাগল।
ভিতরে ভিতরে বেশ একটা গর্ব অনুভব করল।
যাবার সময়েও ছোটমাসি মনে পড়িয়ে দিল।–একটু খোঁজ রাখিস বাবা, কোথায় যে গিয়ে উঠব কোনও কূলকিনারা পাচ্ছি না।
ছোটমেসোকেও খুব উদভ্রান্ত লাগল।
ওরা চলে যেতেই প্রীতি বললে, দেখলে তো? যে আসে সেই বলে চমৎকার ফ্ল্যাট, তোমারই কেবল দক্ষিণ দক্ষিণ। তখন না নিলে কী হত বুঝতে পারছ!
ধ্রুব কোনও উত্তর দিল না। এই ফ্ল্যাটটা নিজের মনোমত হয়নি, মন্দের ভাল, কিন্তু অন্য অনেকে চমৎকার চমৎকার বলে বলেই পছন্দ করিয়ে দিয়েছে। তাছাড়া এর চেয়ে ভাল আর কোথায় বা পেত।
কিন্তু ছোটমেসোর চিন্তিত উদভ্রান্ত মুখ দেখে ওর মনও খারাপ হয়ে গেল। বেচারি। এই বয়সে নিরাশ্রয় হওয়ার ভয় যে কি দুঃসহ, ধ্রুব বুঝতে পাবে। বাবাকেও তো দেখেছে, যখনই বাড়িওয়ালা এসে মিষ্টি মিষ্টি হেসে উঠে যাওয়ার কথা বলত, বেশ কয়েকদিন ধরে বাবার মুখে ভয়ের ছাপ দেখতে পেত। ছোটমেসো তো আবার মামলায় হেরে বসে আছে। এক বছর সময় পেয়েছে, এই যথেষ্ট। কিন্তু যত দেরি হবে, ততই তো ভাড়া বাড়বে।
ইনফ্লেশন কথাটা মাঝে মাঝেই শোনা যায়। তর্কবিতর্ক উঠলে ধ্রুবও উচ্চারণ করে। কিন্তু কাউকে যেন স্পর্শ করে না, নাড়া দেয় না। যেন স্বাভাবিক কোনও ব্যাপার। অবয়বহীন, ধরা-ছোঁয়ার বাইরে, অনুভূতির বাইরে কোনও অশরীরী দৈত্য যেন।
আজকাল বাড়ি ভাড়া এত বেড়ে গেছে ওর ধারণাই ছিল না। এই সেদিনও তো রাখালবাবুদের ওপর রেগে গিয়ে প্রীতিকে বলেছিল, এভাবে থাকা যায় না, অন্য ফ্ল্যাট দেখতে হবে।
ভেবেছিল, আরো বেশি ভাড়া দিলে আরো ভাল ফ্ল্যাট পাওয়া যাবে।
ধ্রুবর অবশ্য ইতিমধ্যে অফিসে দুদুটো লিট হয়েছে। মাইনে বেড়েছে। কিন্তু খরচখরচাও বেড়েছে। তবু মনে হয়েছে আরো বেশি ভাড়া দিতে পারবে।
দিতে পারবে বলে ভিতরে ভিতরে একটু অহঙ্কারও ছিল।
প্রীতিকে বলেছিল, তোমার দাদার কথা মনে আছে? বলেছিল, সাড়ে চারশো টাকা বাড়ি ভাড়া দিলে খাবে কি!
বলে হাসল। হাসির মধ্যে যেন একটা অহঙ্কার। অর্থাৎ দিতে তো পারছি। দিয়েও অভাবের মধ্যে তো সংসার চালাতে হচ্ছে না।
প্রীতি বলল, দাদা সেভাবে বলেনি। সত্যি তো, যেভাবে বাড়ি ভাড়া বাড়ছে, লোকগুলো যাবে কোথায়?
তারপরই বললে, আর এখন যাদের নতুন করে ফ্ল্যাট দরকার, তাদের কথা ভাবো তো।
