খুব ভেবে এসেছিল বাবার অসুখ বাড়াবাড়ি দেখলে রাতে এখানেই থেকে যাবে। কিন্তু এত লোকজন দেখে থাকতে ইচ্ছে হল না। শোবার জায়গাই হবে না।
মেজবৌদি বললে, রাত্রে থাকবে তো।
ধ্রুব বললে, না।
-সে কি, তোমাদের যে ভাত চড়িয়ে দিলাম। অন্তত এখানে খেয়ে যাও।
প্রীতিই জবাব দিল—কেন ওসব করতে যাচ্ছ। দিদি। তাছাড়া এত লোকজন, আমরা ফিরেই যাব।
তবু মেজবৌদি ওদের ছাড়ল না। না খেয়ে যেতে দেবে না।
তারপরও কিছুক্ষণ থাকতে হল। শোবার জায়গা, বিছানাপত্তর যে পিসিমা আর মাসিমার দল দখল করে নিয়েছে বলেই চলে যেতে হচ্ছে তা কি আর ওরা বুঝবে! হয়তো নিজেদের মধ্যে বলাবলি করবে, দ্যাখো, ছেলের কাণ্ড, বাবার এমন অসুখ, শুনেই আমরা ছুটে এলাম, আর ছেলে তার বৌকে নিয়ে চলে গেল।
দাদা বললে, তোরা চলেই যা। এখন তো আর ভয়ের কিছু নেই।
কেন বললে কে জানে। হয়তো অসুবিধে বুঝেই। নাকি পিসিমা মাসিমার কাছে দেখাতে চাইল বড়ছেলে কত কর্তব্যপরায়ণ, আর ছোটছেলে বাবা-মার তোয়াক্কাই করে না।
ফিরতে ফিরতে অনেক রাত হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু কি এমন রাত।
বকুলবাগানের এই দিকটা দিনের বেলাতেই নির্জন। সন্ধের পর থেকে লোকজনের যাতায়াত কমে যায়। বড় বেশি নিঃশব্দ। আশপাশের বাড়ির আলোও তখন নিভে গেছে।
ট্যাক্সি আসতে রাজি হয়নি বলেই একটা রিক্সা ধরতে হয়েছিল।
ঠুং ঠুং করে রিক্সাটা এলও খুব আস্তে আস্তে। সারাদিনের পরিশ্রমের পর রিক্সাওয়ালা বোধহয় ক্লান্ত। তাই তাড়া দিতে ইচ্ছে হয়নি।
বাড়ির সামনে এসে নামল। বাড়িটা একেবারে রাস্তার ওপর।
দেখল সদর দরজা বন্ধ।
এত তাড়াতাড়ি তো দরজা বন্ধ হয় না।
দরজা থেকেই সিঁড়ি উঠেছে। নীচের তলায় দুদিকে দুই ভাড়াটে, আর সিঁড়ির পাশেই। একখানা ছোট ঘর।
ওই ঘরে সেই গোঁপওয়ালা লম্বা চওড়া চেহারার দারোয়ান থাকে। একাই। কোনও কোনওদিন দেহাতি বন্ধুদের জুটিয়ে এনে তাস খেলে, কি রেডিও শশানে। একটা ট্রানজিস্টার রেডিও সব সময় ওর বগলে ঘোরে।
ভাড়াটেরা সকলে ফিরে আসার পর রাত এগারোটা কি বারোটায় ও সদর দরজা বন্ধ করে।
ধ্রুব দরজার কড়া নাড়ল। কিন্তু কোনও সাড়া পেল না।
বিরক্ত হয়ে খুব জোরে জোরে কড়া নাড়ল।
শেষে জোরে জোরে চিৎকার করে ডাকল, রামদয়াল! এই রামদয়াল।
নীচের তলার ভাড়াটেরাও কেউ কি শুনতে পাচ্ছে না?
তিনতলার জানালার দিকে তাকিয়ে দেখল আলো নেভানো। এত তাড়াতাড়ি সব শুয়ে পড়েছে? হাতের ঘড়িটা দেখল। কই তেমন রাত তো হয়নি।
ভিতরে ভিতরে বিব্রত বোধ করছিল। প্রীতি আর টিপুকে নিয়ে এভাবে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা যায় না। সেজন্যেই অস্বস্তিতে উত্তেজিত হয়ে উঠছিল। দড়াম দড়াম করে দরজায় দুটো লাথি কষিয়ে দিল! সঙ্গে সঙ্গে বঙ্কিমবাবুদের একটা জানালা খুলে গেল।
বঙ্কিমবাবু প্রশ্ন করলেন, কে?
—আমি ধ্রুব। দেখুন তো, দরজাটা বন্ধ করে দিয়েছে।
ভিতর থেকে বঙ্কিমবাবুর হাঁকডাক শোনা গেল।
রামদয়াল দরজার তালা খুলল। রাত্রে ও দরজায় তালা দিয়ে রাখে। কপাট খুলে দিয়ে বললে, ছাদে ছিলাম।
ধ্রুব তখনও উত্তেজিত। ঘড়ি দেখিয়ে বললে, এর মধ্যে তালা দিয়েছিলে কেন?
ও কোনও উত্তর দিল না।
আর ধ্রুব সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠতে উঠতে রাগের মাথায় বললে, শালা!
ঘরে ঢুকে প্রীতি বললে, এমন এক একটা কাণ্ড করো, দারোয়ানটা শুনতে পেল।
ধ্রুবর রাগ তখনও পড়েনি। বললে, শোনাবার জন্যেই।
প্রীতি অবাক হয়ে বললে, তুমি দারোয়ানকে শালা বললে? ও যদি কিছু বলে বসত?
ধ্রুব বললে, ও বুঝতে পেরেছে যে ওকে বলিনি।
একটু থেমে বললে, তুমিই বুঝতে পারোনি। ছাদে গিয়েছিল না ছাই। সব ওই রাখালবাবুর প্ল্যান, আমাদের যাবার সময় দেখেছিল। অপদস্থ করার জন্যেই তালা দিতে বলেছে।
প্রীতি হেসে ফেলে বললে, কি যে বলো!
ধ্রুব বললে, ঠিকই বলছি। ওই যে সিন্দুক রাখতে দিইনি আমাদের ঘরে, সেজন্যেই।
ধ্রুবর খুব অপমান লেগেছিল। এতদিন বুঝতে পারেনি বাড়িওয়ালা আর ভাড়াটের মধ্যে কোনও দাগ টানা আছে কিনা। এই একটা ঘটনায় বুঝতে পারল। রাগের মাথায় গালাগাল দিয়ে ফেলেছে, দারোয়ান নিশ্চয় রিপোর্ট করবে, তখন আবার রাখালবাবু যদি কিছু বলতে আসেন..
সকালে উঠেই বাকি তিনটে ফ্ল্যাটের বঙ্কিমবাবু, সুধাংশুবাবু, অমিতবাবু—প্রত্যেককে গিয়ে রাতের ঘটনার কথা বললে।
—এভাবে যদি দবজায় তালা দিয়ে দেয়, এ কি মেয়েদের হোস্টেল পেয়েছে মশাই?
সকলেই উত্তেজিত হয়ে উঠল। অবশ্য চাপা স্বরে।
বঙ্কিমবাবু বললেন, দরকার হয় আমরা সব একসঙ্গে গিয়ে বলব। প্রোটেস্ট করা উচিত।
আর তখনই তিনতলার সিঁড়ির মাথা থেকে রাখালবাবুর হাঁক শোনা গেল, রামদয়াল! এই রামদয়াল!
নীচের ঘর থেকে রামদয়াল সাড়া দিল।
সঙ্গে সঙ্গে রাখালবাবুর চটির শব্দ শোনা গেল। নীচে নামছেন।
বঙ্কিমবাবুকে দেখতে পেয়েই বললেন, আর পারছি না মশাই, ওই রামদয়ালটাকে নিয়ে। রিনি বলছিল, কাল রাত্রে নাকি তাড়াতাড়ি দরজায় তালা দিয়ে দিয়েছিল…
রাখালবাবু রামদয়ালকে ধমকে দিলেন।–সকলে ফিরেছে কিনা দেখে তবে তো তালা দিবি।
রামদয়াল কোনও কথা বলল না। মাথা নীচু করে রইল।
আবার উঠে চলে গেলেন।
প্রীতি বললে, দেখলে তো। অকারণ চটে গিয়েছিলে।
ধ্রুবর নিজেরও মনে হল, অকারণ। তবু কেমন একটা সন্দেহ রয়েই গেল। সব ব্যাপারটাই বোধহয় সাজানো।
সামান্য একটা ঘটনা। হয়তো সত্যিই পো দারোয়ানটা খেয়াল করেনি যে ধ্রুবরা তখনও ফেরেনি, গরমের জন্যে ছাদে চলে গিয়েছিল, আর দরজায় তালা দেওয়া তো ওর অভ্যাস, তাই তালা দিয়েছিল।
