পাশের ঘরে একা বসে ছিল ধ্রুব। ও এসেছে দেখেই বোধহয় মেয়েদের হাসিহল্লা থেমে গেল। একে একে সকলে চলে গেল।
আর প্রীতি হাসতে হাসতে এসে বললে, আজ যা একটা খবর দেব-না, দাঁড়াও…
বলে ওষুধের তাক থেকে স্মেলিং সল্টটা নিয়ে এসে বললে, নাও, হাতে রাখো, কি জানি যদি ফেন্ট হয়ে যাও খবর শুনে…
খুব সপ্রশ্ন চোখে তাকাল।
প্রীতি বললে, তোমার ওই রাখালবাবু, তুমি বলছিলে হাউ হাউ করে কেঁদে ফেললেন স্ত্রীর কথা বলতে বলতে…
ধ্রুব বললে, কী হয়েছে?
প্রীতি হেসে লুটোপুটি।–দ্বিতীয় পক্ষকে আজ নিয়ে এলেন, নতুন বৌকে দেখলাম আজ…
ধ্রুব বিশ্বাস করতে পারছিল না।
প্রীতি বললে, আমি একা নই, সব ফ্ল্যাটের সবাই দেখেছে।
তারপর হাসতে হাসতে বললে, দুমাস আগেই নাকি রেজিস্ট্রি করে বিয়ে করেছিল। কী অসুবিধে ছিল বলে এতকাল আনতে পারেনি।
তারপরই সেই ব্রহ্মাস্ত্র।—অবাক হবার তো কিছু নেই। তোমরা ছেলেরা স্যার, সবাই এক।
ধ্রুব কোনও উত্তর দিল না, প্রতিবাদ করল না। শুধু মনে হল, সত্যিই অবাক হবার কিছু নেই। প্রত্যেকটি মানুষই এই রকম কিনা কে জানে। তার একটা দিক যখন বুকফাটা কান্নায় ভেঙে পড়ে, হয়তো অন্যদিকটা তখন আরেকজনকে আঁকড়ে ধরতে চায়। সেটাই স্বাভাবিক। নাকি, কান্নাটা রাখালবাবুর অভিনয়?
০৪. প্রীতি ফ্ল্যাট গুছিয়ে নিয়েছে সুন্দর করে
কয়েকটা বছরের মধ্যে প্রীতি ফ্ল্যাট গুছিয়ে নিয়েছে সুন্দর করে। প্রথম প্রথম ঘরগুলো বড় ফাঁকা ফাঁকা লাগত। একটাই লাভ ছিল, টিপু নড়বড়ে পায়ে সারা বাড়ি ছুটে বেড়াতে পারত। এখন আর ওর পা নড়বড়ে নেই, দিব্যি হাঁটতে পারে, দৌড়তে পারে। কিন্তু দৌড়ে বেড়ানোর জায়গা নেই আর।
বসার ঘরে চমৎকার সোফাকৌচ বানিয়ে নিয়েছে।
ওসব ধ্রুবর একটুও পছন্দ ছিল না। ওর ইচ্ছে ছিল বেশ হেলান দিয়ে বসা যায় এমন একসেট বেতে বোনা চেয়ার। তার দামও বেশ কম, বসেও আরাম। কিন্তু প্রীতি রাজি হল না।
কোত্থেকে একটা আমেরিকান ফ্যাশন ম্যাগাজিন নিয়ে এল, বোধহয় নীচের তলার বঙ্কিমবাবুদের কাছ থেকে। পাতা উল্টে উল্টে এমন একটা ডিজাইন পছন্দ করল, যা কারও বাড়িতে দেখা যায়নি। যেন অন্য কারো বাড়িতে দেখা গেলেই সেটাকে যথেষ্ট ভাল বলা যাবে না।
বসার ঘরে একটা ডিভান এল। এক কোণে টি ভি।
ধ্রুব আপত্তি করে বলেছিল, কেই বা আসছে আমাদের এখানে, এত শোফাকৌচ ডিভান কি হবে।
প্রীতি বললে, বাঃ রে, কেউ আসবে বলেই কি বসার ঘর? কেউ যদি আসে হঠাৎ, ওই তো পাশের ফ্ল্যাটের ওরা একদিন এল, খাটে বসতে দিতে হল।
হেসে বললে, ধরো দাদাই যদি একদিন এসে থাকতে চায়। শশাবে কোথায়। আমি ডিভানের অডার দিয়ে এসেছি, বক্স মতো হবে। ভিতরে লেপতোষক তুলে রাখা যাবে,
ওপরে গদি। কেউ এলে শুতেও পারবে।
তারপরই এই ডিভান। আর একটা আলমারিও এল। কাপড় রাখার নাকি জায়গা নেই। শেষে ফ্রিজ।
ফ্ল্যাটটা ক্রমশ সাজিয়ে তুলছে প্রীতি, আর তা দেখে ধ্রুবর ভালই লাগত। কিন্তু ধ্রুবর আরেক চেষ্টা ছিল টাকা জমানোর। সেটা আর সম্ভব হচ্ছিল না বলেই ভিতরে ভিতরে রাগ।
আসলে ধ্রুব একটা স্বপ্ন দেখত। কোথাও এক টুকরো জমি কিনে বাড়ি করবে। অন্তত একটা ফ্ল্যাট কিনবে। আজকাল তো লোন পাওয়া যায়, সব টাকা দিতে হয় না। মাসে মাসে ভাড়ার মতোই কিস্তিতে লোন শোধ করা যায়। আছে তো সেই বাবার দেওয়া হাজার পঞ্চাশ টাকা। না, সুদে বেড়ে এখন বোধহয় ষাট। কিন্তু আরও অনেক লাগবে।
প্রীতিকে খরচ কমানোর জন্যে সে কথা বলতেই ও বলে উঠেছিল, অত টাকা জমাবে তুমি? টিপু বড় হচ্ছে না? স্কুলে দিতে হবে না?
অর্থাৎ খরচ বাড়বে বই কমবে না।
অথচ এখন ধ্রুবর বড় অনুশোচনা হয়। প্রথম থেকেই যদি চেষ্টা করে টাকা জমিয়ে ফেলত, তা হলে লোনটোন নিয়ে হয়তো হরিশ মুখার্জি রোডে ওদের বাড়ির সামনে যে চারতলা ফ্ল্যাট বাড়িটা উঠল, তার একখানা ছোট ফ্ল্যাট কিনে ফেলতে পারত। তখন কত সস্তায় পাওয়া যেত। এখন শুনছে দিনে দিনে নাকি দাম বাড়ছে।
প্রীতিকে সেকথা বলতেই ঈষৎ ঝাঁঝের সঙ্গে বললে, ভাগ্যিস কিনে ফেলনি। ও বাড়ির সামনেই? দরকার নেই আমার ফ্ল্যাটের।
আসলে স্মৃতির গায়ে জড়ানো তিক্ততাটুকু ও কিছুতেই যেন ভুলতে পারছে না।
তিক্ততা একসময় ধ্রুবর মনেও ছিল। কিন্তু এতদিন বাদে, এখন তো ও রীতিমত সুখী, তেমন কোনও অশান্তি নেই, তাই তিক্ততাটুকুও ধুয়ে মুছে গেছে। হাল্কা হয়ে গেছে চাপা অপরাধবোধ।
প্রথম প্রথম ও অফিস থেকে ফেরার সময় বাবা-মার সঙ্গে দেখা করে আসত। একদিন তো ভুলে ও বাড়িতে চলে গিয়েছিল। যেন বাড়ি ফিরছে। দরজার সামনে পৌছে ভুল ভাঙল। নিজের মনেই হেসে ফেলেছিল সেদিন। এতদিনের অভ্যাস, ভুল সেজন্যেই। যেন ওদের সঙ্গেই দেখা করতে গেছে এমন স্বাভাবিক মুখ করেই ঢুকে গিয়েছিল। কিন্তু এতদিনের সেই ভুলটা নিজের মধ্যেই গোপন হয়ে আছে। ওদের তো বলেইনি, প্রীতিকেও না। শুনলেই কিছু একটা বলে বসত।
আজকাল মাঝেসাঝে যায়। সময়ের ব্যবধান ক্রমশই বাড়ছে। বাস থেকে ওখানে নামলে বকুলবাগানে আসা রীতিমত কষ্টকর। সরাসরি বাস নেই, হয় ট্যাক্সি, কিংবা হেঁটে আসা। আজকাল বড় ক্লান্ত লাগে।
ওখানে গেলে মা এটা ওটা খাওয়াতে চায়, বাবা টিপুর কথা, প্রীতির কথা জিগ্যেস করে। ধ্রুবর বড় অস্বস্তি লাগে।,
কেবলই মনে হয় কী স্বার্থপর আমি। অথচ স্বার্থপর না হলেও বাঁচাও যায় না। যেন সুখ শান্তি সব স্বার্থের সঙ্গেই জড়িয়ে আছে।
