ধ্রুব সান্ত্বনা দেবার চেষ্টা করল। অনুশোচনায় মনটাও খারাপ হয়ে গেল।
বাড়ি ফিরে প্রীতিকে সেকথা বলতেই ও বিস্ময়ে চোখ কপালে তুলল। হেসে বললে, দূর, তুমি কি শুনতে কি শুনেছ।
ধ্রুব বললে, ভুল শুনব কেন, বললাম, তুমি ওঁর স্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে যাবে। সঙ্গে সঙ্গে ভদ্রলোক হাউ হাউ করে কেঁদে ফেললেন। স্পষ্ট বললেন, গৃহপ্রবেশের তিন মাসের মধ্যেই মারা যান।
প্রীতি অবাক হয়ে বললে, কিন্তু ওঁর ছেলেমেয়েরা, রিনি বিন্টু ওরা তো এসেছিল, কত গল্প হল। কিছু তো বলেনি। বরং মা মা বলে কি যেন বলছিল।
তারপর বললে, ওরা ভীষণ ভাল, জানো।
এটুকুই পরম তৃপ্তি। এতকাল আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধবদের কাছে বাড়িওয়ালাদের সম্পর্কে কত কি শুনে এসেছে। খারাপ, খারাপ, বাড়িওয়ালা মানেই খারাপ লোক।
অফিসে অবিনাশকে আগেই বলেছিল একদিন, শুনে এমন অবাক হয়ে গিয়েছিল যে প্রত্যেককে ডেকে ডেকে বলেছে, শুনুন শুনুন, বাড়িওয়ালা ভালও হয়। ধ্রুবর বাড়িওয়ালা ওর মুখ দেখে এমন গলে গেছে যে পঞ্চাশটা টাকা ভাড়া কমিয়ে দিয়েছে।
অবিনাশকেই এসে বললে। রাখালবাবু মানুষটা একেবারে ভালমানুষ। স্ত্রীকে বোধহয় খুবই ভালবাসতেন। হাউ হাউ করে কেঁদে ফেললেন, বেচারি বউটা নতুন বাড়িটা ভোগ করতে পেল না বলে দুঃখ করছিলেন।
অবিনাশ বললে, তুমি খুব লাকি ধ্রুব। এ বাজারে এমন ভাল বাড়িওয়ালা পাওয়া পরম সৌভাগ্য। তুমি বরং একটা কাজ করো, একটা লটারির টিকিট কেটে ফেল, সময়টা তোমার খুবই ভাল যাচ্ছে।
ধ্রুব হাসল। কিন্তু সত্যিই মনের মধ্যে একটা পরম তৃপ্তি। বাড়িওয়ালাকে নিয়ে কত লোকের কত ঝামেলা। নিত্যই তো শুনছে। ছোটমাসিদের তো মামলা চলছে। অফিসের বীরেশ্বরও সেদিন বলছিল, হাইকোর্টে ঝুলছে, নিত্যদিন উকিলের বাড়ি। তা ছাড়া ওর আবার একটু ভয়ও আছে, রেন্ট কন্ট্রোলে ভাড়ার টাকা জমা দেওয়া নিয়ে কি যেন ভুলভ্রান্তি…
ধ্রুবকে অন্তত সে-সব কথা ভাবতে হবে না। তেমন অবস্থা হলে ও নিজেই ছেড়ে দেবে।
ভালমানুষ! কিন্তু একটা লোক, একজন মানুষকে কি বিচার করে ভাল বা মন্দ বলা যায়!
গলির মোড়ের বাড়ি থেকে যে ভদ্রলোক সেদিন বের হলেন, এখন নাম জেনে গেছে, অনাদিবাবু…মাঝে মাঝে রাস্তায় দেখা হত, হাসতেন, কখনও মুখ ফুটে ভাল? ধ্রুবও সংক্ষেপে সারত!
কথায় কথায় একদিন জিগ্যেস করলেন, কোনও অসুবিধে হচ্ছে না তো!
তারপরই অনাদিবাবু বলে বসলেন, লোক সুবিধের নয় মশাই, আপনার ওই বাড়িওয়ালা।
ধ্রুব আশ্চর্য হয়ে বললে, না না, উনি খুব ভাল, আমাদের সঙ্গে তো রীতিমত ভাল ব্যবহার করেন।
অনাদিবাবু হেসে বললেন, হ্যাঁ হ্যাঁ, জানবেন সব। বাইরে খুব মিষ্টি মিষ্টি ব্যবহার, কথাবার্তা…
কথা শেষ না করেই ঝট করে ছাতাটা খুলে মাথায় দিয়ে হনহন করে চলে গেলেন।
অনাদিবাবু লোকটিকেই খারাপ মনে হয়েছিল ধ্রুবর। হয়তো কোনও কারণে রাখালবাবুকে পছন্দ করেন না। কিংবা স্রেফ ঈর্ষা। রাখালবাবুর এই বিশাল তিনতলা বাড়ি, দোতলায় আর গ্রাউন্ড ফ্লোরে চারখানা ফ্ল্যাট ভাড়া দিয়েছেন, দুখানা গাড়ি, বিরাট ব্যবসা। ঈর্ষা হবারই তো কথা।
কিন্তু তার জন্যই কি যেচে আলাপ করে তাঁর সম্পর্কে সাবধান করলেন অনাদিবাবু? নাকি ভালমানুষ বা খারাপ মানুষ বলে কেউ নেই। প্রত্যেকটি মানুষ তার ব্যক্তিগত সম্পর্ক দিয়ে বিচার করে। যে একজনের কাছে ভাল, অন্যজনের কাছে সেই খারাপ।
অবিনাশকে ধ্রুব পছন্দ করে, এত আপন মনে হয়, ধ্রুবর তো ধারণা ও খুবই ভালমানুষ, অথচ অফিসের অনেকেই অবিনাশকে পছন্দ করে না। টীকাটিপ্পনীও করে।
কিন্তু রাখলবাবু যে এভাবে ওকে অবাক করে দেবেন ধ্রুব ভাবতেও পারেনি।
বাড়ি ফিরেই দেখলে একেবারে শোবার ঘরে প্রীতি মেয়েদের সভা বসিয়েছে। হো হো হাসির শব্দ আগেই শুনতে পেয়েছিল। যেন অনেকগুলি মেয়ে একসঙ্গে কথা বলছে। আর এলোপাথারি একটা হাসির ঝড় বয়ে যাচ্ছে।
দরজা থেকে উঁকি দিয়ে দেখল। আভাসে বুঝতে পারল তিন তিনটি ফ্ল্যাটের মেয়েরা। কিন্তু এত হাসি হল্লা কেন বুঝতে পারেনি।
বসার ঘরের জন্যে এখনও কিছু কেনা হয়ে ওঠেনি। তাই সকলেই শশাবার ঘরে। নতুন সংসার পাততে গেলে যে একসঙ্গে এত জিনিস কিনতে হয়, ধ্রুবর ধারণাই ছিল না।
শুধু পাখা আর বালব কিনতে গিয়েই হেসে বলেছিল, ফতুর হয়ে গেলাম।
প্রীতি হেসে বলেছিল, এর মধ্যেই? এখনও তো সবই বাকি।
তারপর চোখ বুজে গলার স্বরটা কিস্তৃত করে মৃদু মৃদু হেসে বলেছিল, একসঙ্গে আড্ডা দেব, একসঙ্গে ঘুরব, একসঙ্গে বাড়ি ফিরব…একই বাড়িতে…
ধ্রুব ওর ভাবভঙ্গি দেখে হেসে ফেলেছিল।
প্রীতি ধ্রুবর কথাগুলোই আউড়ে যাচ্ছিল। বিয়ের আগের কথাগুলো।
তখন ওরা পরস্পরের ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠছে।
বেশ রাত হয়ে গিয়েছিল, প্রীতি ঝট করে উঠে পড়ে বলেছিল, সর্বনাশ, নটা বেজে গেছে। পৌঁছতে পৌঁছতে…।
ধু তখনই বলেছিল প্রীতিকে।–দুজনে একসঙ্গে আড্ডা দেব, একসঙ্গে ঘুরব, একসঙ্গে বাড়ি ফিরব, একই বাড়িতে, এমন হলে, কি ভাল যে হত।
শুনে প্রীতি বুঝতে পারেনি, বিস্ময়ের গলায় বলেছিল, যাঃ, তা কি করে সম্ভব?
ধ্রুব হেসে বলেছিল, কেন, বিয়ে করে।
মুহূর্তের জন্যে লজ্জা পেয়েছিল প্রীতি। মাথা নীচু করেছিল, সারা পথ ধ্রুবর মুখের দিকে তাকাতে পারেনি। কিংবা ধীর পায়ে ধ্রুবর পাশে পাশে হেঁটে বাসস্টপ অবধি আসার সময় ওর বুকের মধ্যে কিছু গুনগুন করে উঠেছিল।
