প্রীতি বুঝি একদিন মেজবৌদিকে চুপিচুপি বলেছিল হাউসকোট পরার কথা।
মেজবৌদি উৎসাহ দেখিয়েছিল।—পর না, কে কি বলবে ভাবছিস কেন। তারপর হেসে বলেছিল, তুই চালু করে দিলে আমিও পরব।
কিন্তু ধ্রুব নিষেধ করেছিল বলে প্রীতি আর ওপথে যায়নি।
আশ্চর্য। এইসব ছোটখাটো ব্যাপারে বাবা-মাকে অসন্তুষ্ট করতে, আঘাত দিতে চায়নি। ধ্রুব। প্রীতিও চেষ্টা করেছে মেনে চলতে। অথচ শেষ পর্যন্ত একটা বড় আঘাত দিতে বাধল না। নিশ্চিন্তে ছেড়ে চলে এল। এর চেয়ে ছোটখাটো বাধানিষেধগুলো তুচ্ছ করতে পারলে হয়তো বড় আঘাতটা দিতে হত না। অন্তত এত তাড়াতাড়ি দিতে হত না।
একটা কেরোসিন স্টোভ কিনে রেখেছে প্রীতি, কেরোসিনও জমা করে রেখেছিল কিছু। বাসনকোসনও মোটামুটি চলে যাবার মত।
কিন্তু রান্নার পাট নেই এখন। প্রীতিদের বাড়িতে রাত্তিরে খাওয়ার কথা। ওরাও খুব একটা দূরে থাকে না। রাত্তিরে খেয়ে ফিরে আসবে, নাকি ওখানেই রাতটা কাটাবে, এখনও ঠিক করেনি।
প্রীতি বললে, গ্যাসের জন্যে নাম লেখাতে হবে। কবে পাব কে জানে!
ধ্রুব হতাশ সুরে বললে, কোনটা যে আগে করি, কোনটা পরে। এত কাজ…
প্রীতি হাসল। বললে, বসার ঘরের জন্যে শোফাকৌচ…
ধ্রুব বললে, আপাতত তিনটে বেতের চেয়ার হলেই হবে।
প্রীতির মনঃপূত হল না।–তুমি কি বারবার বদলাবে নাকি? কতগুলো টাকা জলে দিয়ে লাভ কি!
ধ্রুব চুপ করে রইল। কোনটাকে যে জলে দেওয়া বলে ও বুঝতেই পারছে না।
কিন্তু দিনে দিনে বাড়িটার শ্রী ফিরে আসছিল। খুব সুন্দর করে সাজিয়ে নিচ্ছিল প্রীতি, বাড়িটা, অর্থাৎ এই তিনখানা ঘরের ফ্ল্যাট। এখন তো এটাই বাড়ি।
প্রীতির বাবা-মা দুদিন এলেন, অনেকক্ষণ থাকলেন, গল্পগুজব করলেন, টিপুকে আদর। দেখে মনে হচ্ছিল ওঁরাও খুব খুশি।
প্রীতির বাবা হাসতে হাসতে মেয়েকে বললেন, ইচ্ছে হলেই এবার থেকে তোর এখানে চলে আসব।
একটু থেমে বললেন, যাই বলিস, তোদের আগের বাড়িতে যেতে কেমন সঙ্কোচ হত। ওঁরা খুবই ভালমানুষ, আমি গেলে খুব খুশি হতেন, আদর আপ্যায়ন করতেন, কিন্তু তবু…
ধ্রুবর নিজেরও সেকথাই মনে হল। আগের বাড়িতে প্রীতির বাবা মা, কিংবা দাদা দিদি কেউ বেড়াতে গেলে, মেয়ের সঙ্গে দেখা করতে গেলে, ধ্রুবর ভাল লাগত। কিন্তু কেমন আড়ষ্ট লাগত। এখানে এদের যতখানি আপন মনে হচ্ছে, আপন করে নিতে পারছে, আগের বাড়িতে তা সম্ভব ছিল না। সব সময়েই কেমন একটা সঙ্কোচ। কিছুটা লজ্জা, কিছুটা ভয়। প্রীতির তো আরো বেশি। যেন সব কটা চোখ ওদের দিকে তাকিয়ে আছে, সব কটা কান সজাগ।
এখানে এখন সত্যি একটা মুক্তির হাওয়া।
প্রীতির মা নানা রকম উপদেশ দিচ্ছিলেন প্রীতিকে। ভাঁড়ারের জিনিসপত্র। কোথায় কীভাবে রাখবে, একটা মটসেফ আনিয়ে নে, আরো কত কি।
বাড়িওয়ালা রাখালবাবুও খোঁজখবর নিতেন। সকালে মর্নিং ওয়াক করতে বেরোতেন। বেরোবার সময় সিঁড়ির মুখে দাঁড়িয়ে জিগ্যেস করতেন, ধ্রুব, কিছু অসুবিধে হচ্ছে না তো? কিছু দরকার হলে বলল। একসঙ্গে আছি আমরা, বুঝলে কিনা…।
হরিশ মুখার্জি রোডে থাকার সময় রাখালবাবু লুঙি পরে ফতুয়া গায়ে বাজারে যেতেন। হাতে থলি নিয়ে। এখন আর ওসব করেন না। চাকরবাকরদের হাতে বাজার তুলে দিয়েছেন। কিন্তু সকালে বাইরে একটু খোলা হাওয়ায় ঘুরতে যেতেন বাজার করার নাম করে। এখন বাজার করা সাজে না, তাই মর্নিং ওয়াকে বের হন।
—তোমার তো গ্যাস স্টোভ নাই। একদিন হঠাৎ বললেন, রিনা বলছিল। আমার একটা চেনা লোক আছে, করিয়ে দোবো, বুঝলে কিনা।
প্রীতি শুনে বললে, যাই বলো, সব বাড়িওয়ালা একরকম নয়। রাখালবাবু লোকটি কিন্তু সত্যি খুব ভাল লোক।
রাখালবাবুর সংসার নিতান্ত ছোট নয়। দুই ছেলে, এক মেয়ে রিনা। ছোট ছোট তিনটি ছেলেমেয়ে নিয়ে হরিশ মুখার্জি রোডের একতলার ঘরে কি করে থাকতেন কে জানে। আসলে ব্যবসার ব্যাপারটাই হয়তো এই রকম। প্রথম দিকে কষ্টেসৃষ্টে থেকে টাকা জমাতে হয়। তখন সবাই ভাবে লোকটা দুঃস্থ। তারপর হঠাৎ একদিন মুখখাশ খুলে ফেলতেই সকলে অবাক হয়ে যায়।
কিন্তু তার জন্যে রাখালবাবু মানুষটা বদলে যাননি। কোনও গর্ব নেই, ভাড়াটে বলে তাচ্ছিল্য করেন না। বরং ধ্রুবকে যেন একটু সমীহই করেন।
ধ্রুবর শুধু একটাই অনুশোচনা হয়। না জেনে মানুষটিকে দুঃখ দিয়ে ফেলেছে।
প্রতিকে একদিন বলেছিল, ভদ্রলোক এত খোঁজখবর নেন, গ্যাসের ব্যবস্থা করে দিচ্ছেন, একদিন ওঁর স্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে এসো।
প্রীতি হেসে বললে, যাব। তবে গ্যাসের জন্যে ওঁর চিন্তাই বেশি, কেন জানো? তা না হলে বাড়ি নষ্ট হবে যে। কয়লা কিংবা কেরোসিনে শেষে এত যত্নের বাড়িটা নষ্ট হয়ে যাবে কে চায় বলো।
এদিকটা ধ্রুব একবারও ভাবেনি। বিশ্বাস করতেও ইচ্ছে হল না।
সেদিনই রাস্তায় রাখালবাবুর সঙ্গে দেখা। উনি মর্নিং ওয়াক করে ফিরছেন। ওঁকে খুশি করার জন্যেই বললে, আপনার স্ত্রীকে তো একদিনও দেখলাম না, প্রীতি আজ যাবে ওঁর সঙ্গে দেখা করতে।
রাখালবাবু কথাটা শুনেই ধ্রুবর মুখের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলেন। তারপর হঠাৎ ড়ুকরে কেঁদে উঠলেন।
ধ্রুবর হাতটা ধরলেন, থরথর করে যেন কাঁপছেন, বললেন, সে তত নেই ধ্রুব। আমাকে ভাসিয়ে দিয়ে চলে গেছে। তিন-তিনটে ছোট ছোট ছেলেমেয়ে নিয়ে…
গলা কাঁপছিল ওঁর। ছলছল চোখে বললেন, কি আর বলব তোমাকে, তিনটে মাসও পার হল না, শুধু বাড়িই করলাম আমি, সে ভোগ করতে পেল না ধ্রুব। বুঝলে কিনা, এ বাড়িতে আসার তিন মাসের মধ্যে…
