ধ্রুব আর বাবার সামনে দাঁড়াতে পারছিল না, চলে আসছিল। বাবা ক্ষীণ কণ্ঠে ডাকলেন, ছোটবৌমা। টিপুকে একবার দেবে, কোলে নেব।
ধ্রুবর বুকের মধ্যে একটা প্রচণ্ড যন্ত্রণা হল। দাঁড়িয়ে পড়েছিল ও।
টিপু তো সারাক্ষণ বাবার কাছে কাছেই থাকত। বাবার যত কথা ওর সঙ্গে। যত হাসি।
তা নিয়ে বড়বৌদি মেজবৌদি একটু টীকাটিপ্পনী করতেও ছাড়ত না।
মেজবৌদি বলেছিল, কই আমাদের ছেলেমেয়েদের তো কোনওদিন এত আদর করতে দেখিনি।
ওসব ঈর্ষার কথা। ধ্রুবর সব মনে আছে, ওরাই ভুলে গেছে।
প্রীতি টিপুকে নিয়ে গিয়ে বাবার কোলে দিল।
উনি টিপুকে একেবারে বুকের ওপর চেপে ধরলেন, যেন একেবারে হৃৎপিণ্ডের ওপর। ধ্রুবর ভয় হল, টিপুর ব্যথা লাগবে। একটা বাচ্চা ছেলেকে এমন করে কেউ চেপে ধরে নাকি।
ওর গালে থুতনি ঘষলেন। গালে গাল ঠেকালেন। তারপর টিপুকে ফিরিয়ে দিলেন প্রীতির কোলে। এমনভাবে হাত দুখানা বাড়িয়ে ওকে ছেড়ে দিলেন, যেন চিরদিনের মতো চলে যাচ্ছে।
আর তখনই প্রীতি ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। ওর দুচোখে জল।
ধ্রুব আর দাঁড়াতে পারছিল না। মাকে প্রণাম করেই তরতর করে সিঁড়ি ভেঙে নীচে নেমে এল।
বড়বৌদি, মেজবৌদি, সিমলি সবাই তখন নীচে এসে দাঁড়িয়ে আছে।
বড়বৌদি ধীরে ধীরে বললে, একেবারে পর করে দিও না ঠাকুরপো।
মেজবৌদি কান্না কান্না মুখে এগিয়ে এসে ধ্রুবর হাত ধরল।কাছেই তো রইলে ধ্রুবদা, এসো মাঝে মাঝে।
এতদিন ধ্রুবর মনে হয়েছে, সকলেই যেন শুধু বাঁধন ছিড়তে চাইছে। এখন মনে হচ্ছে, সবাই যেন বাঁধতে চাইছে। আর ও সেই বাঁধন ছিঁড়ে কিছুতেই বেরোতে পারছে না।
ধ্রুব বললে, প্রীতিকে দাঁড়াতে বলল। আমি ট্যাক্সি ডাকতে যাচ্ছি।
আশ্চর্য, ট্যাক্সিও যেন ওর সঙ্গে শত্রুতা করছে। একটুও সময় দিতে চায় না। বাড়ি থেকে বের হতে না হতেই কাছেই একটা ট্যাক্সি পেয়ে গেল। সে যেতে রাজিও হল।
নতুন ফ্ল্যাটে এসে উঠতেই মুহূর্তে সব যেন ধুয়েমুছে গেল। আসবাবপত্র ঠিকঠাক করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল ওরা তিনজনই। ধ্রুব, প্রীতি, প্রীতির ভাই পুলক।
ডবল বেড খাটখানা খুলে আনা হয়েছে, ওটা প্রীতির বাবা মেয়ের বিয়েতে দিয়েছিলেন। ডবল বেডের চেয়েও একটু বেশি চওড়া। ভবিষ্যতে টিপু আসবে ভেবে নিয়েই অডার দিয়ে বেশি চওড়া করিয়ে নিয়েছিলেন প্রীতির মা। ওঁর দূরদৃষ্টি আছে।
ওরা তিনজনে মিলে সেই খাটটা লাগাল শোবার ঘরের জানালা ঘেঁষে। তারপরও অনেকখানি জায়গা। খাটে গদি খোলা হল ধস্তাধস্তি করে। তোষক বালিশ।
একটা বসার ঘরও হয়ে গেল। সেটায় আপাতত বুককে, আলমারি। তৃতীয় ঘবখানাতেও সামান্য কিছু আসবাব।
ওখানে এই কখানা জিনিসেই ঘরটা ছিল একেবারে ঠাসা। পা ফেলার জায়গা নেই, যে আসত সেই বলত। ওদের নিজেদেরও শুনতে খারাপ লাগত।
এখানে এসে একেবারে উল্টো।
পুলক প্রথম দেখেই বলেছিল, কত স্পেস রে প্রীতি। এত জায়গা নিয়ে কি করবি? দুখানা ঘর হলেই তোদের চলে যেত।
প্রীতির দাদাও একটু সাবধানী প্রকৃতির মানুষ। সাড়ে চারশো টাকা ভাড়ার কথা শুনে বলেছিল, বাড়ি ভাড়াই দেবে সাড়ে চারশো, তা হলে খাবে কি!
তিন-তিনখানা ঘর বেশ ফাঁকা ফাঁকা রয়েছে দেখে পুলকও বললে, দুখানা ঘর হলেই চলে যেত।
ওদের তো সরকারি ফ্ল্যাট, ভাল জায়গায়, ভাড়াও নামমাত্র। তাই জানে না, এ বাজারে অডার মতো ফ্ল্যাট পাওয়া যায় না। চারশো টাকাই মনে হচ্ছে দিব্যি সস্তা। দু মাস ধরে ফ্ল্যাট খুঁজে খুঁজে তো হন্যে হয়ে গিয়েছিল ধ্রুব।
জিনিসপত্র সব কিছুটা গুছিয়ে রেখে প্রীতি মেঝের ওপরেই হাত-পা ছড়িয়ে বসে পড়ল, কিছুটা ক্লান্তিতে।
তারপর ফুর্তিতে বলে উঠল, আঃ, এতদিনে স্বাধীন হলাম।
ধ্রুবর নিজেরও সেরকমই মনে হচ্ছিল, কিন্তু প্রীতির মুখে শুনতে ভাল লাগল না। বিশেষ করে পুলকের সামনে। এ কবছর আগের বাড়িতে প্রীতি কি খাঁচায় পোরা বন্দি হয়ে ছিল! সেখানেও তো স্বাধীনই ছিল, শুধু মনে হয়নি স্বাধীন।
ধ্রুব আর পুলকও টিপুকে নিয়ে মেঝেতে বসে পড়ল।
ধ্রুবর মনে ফ্ল্যাট সম্পর্কে তখনও একটু অসন্তোষ লেগে আছে।
আক্ষেপের সঙ্গে বললে, ব্যাটা দালালটা এত তাড়াহুড়ো করল, আর আমরাও দুজনই এসে দেখলাম, বাড়িটার যে দক্ষিণ একেবারে চাপা, খেয়ালই হয়নি।
পুলক বলল, একেবারে হাওয়া পাবে না।
প্রীতি ওই দক্ষিণের ব্যাপারটা ভুলে থাকতে চাইছিল। একটা পৃথক ফ্ল্যাটে উঠে আসতে পেরেছে, তাতেই সারা শরীরে ওর খুশি উপছে পড়ছে।
বললে, কলকাতায় কখানা ফ্ল্যাটে হাওয়া বাতাস খেলে? দক্ষিণ খোলা হবে, বে অফ বেঙ্গলের হাওয়া খাব, ওসব ভাবতে গেলে খাবার বেলাতেও হাওয়াই জুটবে।
ওরা দুজনই হেসে উঠল।
আর তখনই প্রীতি বলে বসল। এবার বাবা হাউসকোট পরব, আর কাউকে কেয়ার করি না।
ধ্রুব আর পুলক আবার হেসে উঠল।
আসলে কার যে কোথায় লাগে, সামান্য একটা ইচ্ছে না মেটাতে পারলে মানুষ যে কত দুঃখী হয়, বন্দি ভাবে নিজেকে, বাইরে থেকে দেখে বোঝার উপায় নেই। ধ্রুব জানে, প্রীতির ট্রাকের মধ্যে দু-দুখানা হাউসকোট একেবারে নতুন হয়েই পড়ে আছে। ও বাড়িতে হাউসকোট পরার সাহসই হয়নি প্রীতির। একদিন ধ্রুবকে জিগ্যেস করেছিল। নিজের ঘরের মধ্যে পরলে কার কি বলার আছে!
ধ্রুব নিষেধ করেছিল। বাবা-মা কি মনে করবে। কিংবা ওঁরা কিছু না মনে করলেও বড়বৌদি তো ব্যঙ্গবিদ্রুপ করতে ছাড়বে না। উপরন্তু বাবা-মার বিরুদ্ধেও বিষােদগার করবে। এখন ছোটবৌমা যাই করুক, কোনও আপত্তি নেই, অথচ আমার বেলায় পান থেকে চুন খসলেই…।
