গিয়ে দেখল একটা মোড়ায় বসেছেন, বাবা সেই হাতলওয়ালা আরামকেদারায়। দাদা আর মেজদা দাঁড়িয়ে আছে দেয়ালে ঠেস দিয়ে, দুপ্রান্তে।
ঘরগুলো, বারান্দা চুনকাম হয়নি বহুদিন। এখানে ওখানে দাগ লেগে বেশ নোংরা হয়েছে, তাই এখন দেয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়ায় সবাই। বাড়িওয়ালা তো আজকাল হোয়াইট ওয়াশ করিয়ে দেয় না, তাই নিজেদের খরচেই করা হয়েছিল। প্রথম প্রথম তখন কত সাবধানতা, ঠিকে ঝি এসে দেয়ালে ঠেস দিলে সকলেই ধমক দিত। এখন নিজেরাই ঠেস দিয়ে দাঁড়ায়। আসলে নোংরা দেখলেই মানুষ নোংরা করতে চায়।
ধ্রুব কি করবে, সামনে এসে দাঁড়িয়ে রইল।
বাবা তাঁর তিন ছেলের মুখের ওপর দিয়ে চোখ বুলিয়ে নিয়ে মার দিকে তাকিয়ে হাসলেন।
বললেন, আমার বয়েস হয়েছে। কদিন আছি না আছি কেউ বলতে পারে না। তোর মা বলছে বেঁচে থাকতে কিছু একটা ব্যবস্থা করে যেতে। পরে যাতে লাঠালাঠি না হয়।
বলে হাসলেন। বললেন, তোরা লাঠালাঠি করবি না তা জানি, তবু আমারও তো একটা দায়িত্ব আছে।
মা বলে উঠলেন, শোন তোরা, ওসব কথা নয়, তোর বাবা যদি আমাকে ফেলে পালায়, আমি বাপু ওসব টাকাপয়সা সইসাবুদ ওসব পারব না। তাই বলছি…
কথাটা বাবাই শেষ করলেন। বললেন, আমার পেনশন আছে, তার চেয়েও বড় কথা তোরা তিন ভাই আছিস। আমাদের আর ভাবনা কীসের।
একটু থেমে বললেন, প্রভিডেন্ট ফান্ডে কিছু বেশি বেশি জমিয়েছিলাম। সুদে বেড়ে এখন প্রায় এক লাখ কুড়ি। তা এখনই তোদের তিনজনের নামে চল্লিশ হাজার করে ইউনিট কিনে দিতে চাই।
বাবা স্বেচ্ছায় কাণ্ডটা করছেন বলে ধ্রুবর অবশ্য মনে হল না। মার প্ররোচনা। মা সই করতে খুব ভয় পান, যে কোনও ফর্মেই হোক বা রেজিস্ট্রি চিঠির জন্যেই হোক। সব সময় বাবাকে জিগ্যেস করেন সই করবেন কিনা।
ধ্রুবর শুনে ভালই লেগেছিল, কিন্তু দাদা বোধহয় পিতৃভক্ত ভাল ছেলে সাজবার জন্যে ক্ষীণকণ্ঠে প্রতিবাদ করলে, এখনই ওসব নাই বা করলেন। সে পরের কথা পরে।
মা বললেন, হ্যাঁরে শেষদিন কি কারো নোটিস দিয়ে আসে? যা কিছু আছে তা তো তোদের জন্যেই। আমাদের জন্যে তো তোরাই আছিস।
আমাদের জন্যে তো তোরাই আছিস। মনে পড়লেও এখন খারাপ লাগে। সেই চল্লিশ হাজার টাকা এখন প্রায় পঞ্চাশ হাজারে দাঁড়িয়েছে। কিংবা আরো বেশি।
ও বাড়ি ছেড়ে চলে আসার সময় এসব কথা মনেই পড়েনি। তখন শুধু সর্বাঙ্গে রাগ। এখন নিজেকে ছোট লাগে, অনুশোচনা হয়।
এখন সমস্ত ব্যাপারটা ঠাট্টার মতো মনে হচ্ছে। মার অভিযোগ অনুযোগ কোনও কিছুতেই কান দেয়নি। একটা নেশা তখন ওকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে, নতুন ফ্ল্যাট, আলাদা ফ্ল্যাট। অথচ মা বুকের মধ্যে সব কষ্ট, সব অশান্তি চেপে রেখে এই ফ্ল্যাটে এসেছেন সত্যনারায়ণ দিতে। ধ্রুব আর প্রীতি যাতে সুখে শান্তিতে থাকতে পারে।
—তোদের মঙ্গল, অমঙ্গল, টিপুর মঙ্গল অমঙ্গল, তোমরা যতই দূরে সরে যাও ছোটবৌমা, আমি তো নিভাবনা হতে পারব না।
মা এমনভাবে কথাগুলো বলছিলেন যেন ভিক্ষে চাইছেন। জানেন, ধ্রুব আর প্রীতি ওসবে বিশ্বাস করে না, হয়তো মনে মনে অসন্তুষ্ট হচ্ছে এই ভেবে বলেছিলেন, শুধু একটা দিনের তো ঝামেলা, কয়েক ঘণ্টা, তোরা যাবার আগে অন্তত আমাকে পুজোটা দিতে দিস।
বাইরে একটা ফুর্তির ভাব রেখেছিল ধ্রুব। কিন্তু ভিতরে ভিতরে লজ্জায় মরে যাচ্ছিল। ও মার মুখের দিকে ভাল করে তাকাতে পারছিল না।
বাবার মুখের দিকে তাকাতে পারেনি।
চলে আসার সময় কেবলই মনে হচ্ছিল যেন পালিয়ে যাচ্ছে।
লরি এলো নির্দিষ্ট দিনে। বাবা পাঁজি দেখে বলেছিলেন একটা পর্যন্ত বারবেলা। কুলিদের বসিয়ে রেখেছিল কিছুক্ষণ। হাতের ঘড়িতে একটা বাজতেই তাদের মাল তুলতে বললে। তারা ঝটপট খাটটা খুলে ফেলল। আলমারি বুক কেস বসার চেয়ার সব একে একে লরিতে তুলতে শুরু করল।
সারা বাড়ি নিস্তব্ধ। কেউ কোনও কথা বলছে না। যেন কারো মৃতদেহ পড়ে আছে। উঠোনে, সবাই শোকে নিঃশব্দ।
ধ্রুবও মাথা তুলে কারো দিকে তাকাতে পারছে না। যেন সকলের কাছে ও ছোট হয়ে গেছে। অথচ তখন ভেবেছিল যুদ্ধজয়।
হেমন্তবাবুর কথা মনে পড়ে গেল। সামনের সেই ভাঙা পোড়ো বাড়িটা আঁকড়ে ধরে পড়েছিলেন, ভিতরে ভিতরে যে নিঃস্ব হয়ে গেছেন কেউ জানতে পারেনি। গোপনে গোপনে বাড়িটা বেচে দিয়ে রাতের অন্ধকারে পালিয়েছিলেন। সেও কি এই রকমই কোনও লজ্জা!
—লোকটা কি বোকা, এত লুকিয়ে লুকিয়ে বাড়ি বিক্রি না করে যদি সকলকে জানিয়ে করত, হয়তো অনেক বেশি দাম পেত। ধ্রুব বলেছিল।
ও জানত না, দাম বেশি পাওয়ার চেয়েও দামি জিনিস কিছু আছে। আত্মসম্মান। পাড়ার এই এতগুলি লোকের সামনে ছোট হয়ে যেতে চাননি।
ধ্রুবর মনে হল হেমন্তবাবুর মতোই ও পালিয়েই যাচ্ছে।
যাবার আগে কি বাবাকে একটা প্রণাম করবে, বলবে, আমি যাচ্ছি!
সেটা যে কত কঠিন কাজ, ধ্রুব ভাবতে পারেনি।
প্রীতির ভাই গিয়ে লরিতে বসল। বললে, তোমরা কিছু ভেবো না, আমি সব গোছগাছ করে দেব। তোমরা একটা ট্যাক্সি নিয়ে চলে এসো।
ধ্রুব গিয়ে বাবাকে প্রণাম করল। প্রীতিও।
বাবা মাথা তুললেন না। নিজের পায়ের দিকেই যেন তাকিয়ে আছেন।
আমরা চলে যাচ্ছি এ কথাটাও বলতে পারল না ধ্রুব। বলার তো কিছু নেই, নিজেই পাঁজি দেখে দিন বলে দিয়েছিলেন, মা সত্যনারায়ণ দিতে গিয়েছিলেন, তাও জানেন, লরিতে মালপত্র খোলা হচ্ছে দেখেছেন, অথবা শুনেছেন সিমলির কাছে।
