অফিসে গিয়ে অবিনাশকেই বললে। ওর সঙ্গেই তো অন্তরঙ্গতা। জীবনের অনেক কথাই ওকে বলতে পেরেছে। কিন্তু ঘরোয়া টানাপোড়েনের খবর একটুও জানতে দেয়নি। বলতে লজ্জা। সঙ্কোচ। যেন বললেই অবিনাশের চোখে ও ছোট হয়ে যাবে।
শেষ পর্যন্ত বলেই ফেলল। বড় অশান্তির মধ্যে দিন কাটছে ভাই। জয়েন্ট ফ্যামিলির মতো খারাপ জিনিস আর নেই।
অবিনাশ হো হো করে হেসে উঠল। তোমাদের আবার জয়েন্ট ফ্যামিলি কোথায় হে। বাবা মাকে নিয়ে তিন ভাইয়ের সংসার, একে কি জয়েন্ট ফ্যামিলি বলে।
হাসতে হাসতে বললে, যেতে আমাদের হুগলির গ্রামের বাড়িতে, এখন নয়, বছর দশেক আগে, দেখতে কাকে যৌথপরিবার বলে।
একটু থেমে বললে, রান্নাঘর মানে টাটা কোম্পানির ফার্নেস, দাউ দাউ জ্বলছে সব সময়।
অবাক হয়ে গেল ধ্রুব। আগে কখনো শোনেনি ওর কাছে। হেসে ফেলে বললে, তাই নাকি?
অবিনাশ বললে, একটা বড় বারান্দায় লাইন দিয়ে দুপাশে বাইশজন খেতে বসতে পারে। সব মেঝেতে, আসন নয় হে, গোটা কয়েক কম্বল আধ ভাঁজ করে।
–বাইশজন আর এমন কি! ধ্রুব এবার আর অবাক হল না।
অবিনাশ হাসল।—শুনবে তো সবটা।
একটা কাঁসর বাজানো হত খাবার সময় হলে। গ্রামে যে যেখানে আছে। পরিবারের লোক, শুনেই চলে আসবে। তার আবার ফাস্ট বেল, সেকেন্ড বেল, থার্ড বেল।
এবার সত্যিই অবাক হতে হল ধ্রুবকে।
অবিনাশ বললে, ফাস্ট বেল বাচ্চাদের জন্যে, বিলো ফোটিন, ছেলেমেয়েদের সব। সেকেণ্ড বেল পুরুষদের, ফর অ্যাডাল্ট মেল মেম্বার্স। থার্ড বেল মেয়েদের, সে প্রায় বেলা তিনটেয়।
বলে হো হো করে হাসল।—পুজোর সময় সে এক এলাহি কাণ্ড, যে যেখানে আছে সব আসত, ছেলে মেয়ে জামাই নাই। এখনও আছে? ধ্রুব জিগ্যেস করল।
অবিনাশ হেসে বললে, দশ বছর আগেও ছিল। প্রথম পৃথক হলেন জ্যাঠামশাই, তারপর একে একে সকলেই। লাস্ট আমি, কলকাতায় সংসার নিয়ে চলে এলাম। বাবা মা সেই গ্রামেই, মাঝে মাঝে আসেন। ও সব আর চলে না হে, চলে না। নিকুচি করো তোমার ওই জয়েন্ট ফ্যামিলির। মার সারাটা জীবন তো কেটেছে ওই রান্নাঘরে, বউটাকে হাড় জিলজিলে করে দিয়েছিল, পালিয়ে এসে বেঁচেছি। বউয়ের কোনও সাধআহ্লাদ থাকবে না, ভালবাসা মানে রাতে একসঙ্গে শোয়া। ধুত্তোর।
ধ্রুবর সঙ্কোচ কেটে গেল। যতখানি না বললে নয় সেটুকুই বলল। তারপর জানাল, ফ্ল্যাট পেয়েছে। কিন্তু বড় কষ্ট।
অবিনাশ গম্ভীর হয়ে বললে, হবেই তো। বলে কেমন আনমনা হয়ে গেল, যেন কিছু মনে পড়ে গেছে। যেন ওর চোখের সামনে কিছু ভেসে উঠছে, কোনও স্মৃতি। মুখের ওপর কি ওটা বেদনার ছাপ?
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললে অবিনাশ। ধীরে ধীরে বললে, জন্মের পর যখন নাড়ি কাটে তখন শিশু কিছু টের পায় কিনা কে জানে। কিন্তু এতকাল এক সংসারে কাটিয়ে আবার নাড়ি কাটা, কষ্ট হবে না? কিন্তু উপায় নেই ধ্রুব, সব মেনে নিতে হয়। একদিকে অনেক কিছু ছাড়তে হয়, আবার অনেক কিছু পাওয়াও তো যায়। নিজের মতো করে বাঁচতে কে
চায় বল।
একটু থেমে বললে, ভালই করেছ। সাহস করে চলে যাও, দিব্যি ভাল থাকবে। দেখবে দূরে থাকলেই আরো আপন মনে হবে।
অবিনাশের কাছে সমর্থন পেয়ে ধ্রুবর মনের অপরাধবোধ অনেকখানি সরে গেল। যেন নিজেই নিজেকে বোঝাতে চাইছে এ-ভাবে বললে, ভেবে কি হবে বল, এটাই এ যুগের নিয়ম।
অবিনাশ সায় দিয়ে বললে, হিউম্যান নেচার। সব ব্যাপারে জ্যাঠামশাইয়ের কাছে। হাতজোড় করে দাঁড়ানো, সে যে কি দিন ছেলেবেলায় দেখেছি। স্বাধীনতার চেয়ে দামি জিনিস আর কিছু নেই, বুঝলে ধ্রুব। বাবা-মাও তার কাছে তুচ্ছ।
অবিনাশই লরির ব্যবস্থা করে দিল।
চুনকাম হয়ে যেতেই মা গিয়ে সত্যনারায়ণ পুজো দিয়ে এলেন। সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিল ধ্রুব আর প্রীতি।
পুরুতঠাকুর দেখে বললেন, বাঃ এ তো চমৎকার ফ্ল্যাট।
মা বললেন, হ্যাঁ, ভালই।
পুজোর বাসনকোসন কোশাকুশি সব মা নিয়ে গিয়েছিলেন। পিতলের গামলায় খুব যত্ন করে সিন্নি বানালেন।
প্রীতি বেশ খুশি। ও মাকে সাহায্য করছিল, হেসে হেসে গল্প করছিল। দেখে ভাল লাগছিল ধ্রুবর। কিন্তু বুকের মধ্যে কাঁটার মতো বিঁধছিল একটাই কথা। কি অকৃতজ্ঞ, কি অকৃতজ্ঞ।
রাখালবাবু লোকটার সঙ্গে কোনও সম্পর্কই নেই। বরং তাচ্ছিল্যই করত তাকে। তবু, কবে সামান্য একটা উপকার করেছে ধ্রুব, বিরক্তির সঙ্গে, চাপা রাগের সঙ্গে তুচ্ছ একটা উপকার করতে বাধ্য হয়েছিল, অথচ রাখালবাবু কৃতজ্ঞতা দেখালেন, একটাও প্রশ্ন না করে ওকেই ফ্ল্যাট ভাড়া দিলেন, উপরন্তু পঞ্চাশ টাকা ফেরতও দিলেন। তোমার পাশের ফ্ল্যাটও চারশোই দেয়।
আর ধ্রুব দিব্যি সব ভুলে যেতে পারল। এমন কি আর অসুবিধে কিংবা অশান্তি। ও চলে আসার পর বাবা-মা যা কষ্ট পাবেন, যে অশান্তিতে ভুগবেন তার তুলনায় কতটুকু। তবু সব ভূলে যেতে পারল ধ্রুব।
বেশ কয়েকবছর আগের একটা দৃশ্য মনে পড়তেই নিজেকে ভীষণ ছোট লাগে। অনুশোচনা হয়।
মা এসে ধ্রুবকে বললেন, তোর বাবা ডাকছে! আয়।
এর আগেও একবার ডেকে গিয়েছিলেন। ধ্রুব তেমন গা করেনি। আজকাল বাবার ডাক মানেই তো ফালতু আজেবাজে কথা। বড় বেশি কথা বলেন আজকাল, এমন সব কথা যার সম্পর্কে ধ্রুবর বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই।
দ্বিতীয়বার মা ডাক দিয়ে যেতেই বড়বৌদি এসে বললে, কি ব্যাপার বলো তো? তিন ভাইকেই একসঙ্গে ডাকছেন?
ধ্রুব ঠোট ওল্টাল। অর্থাৎ কি জানি। কিন্তু ওদের তিন ভাইকেই একসঙ্গে ডেকেছেন জেনে একটু কৌতূহলও হল।
