না, প্রীতিকে বলার দরকার নেই।
আসলে রাখালবাবু লোকটাই একটা রহস্য। অনিচ্ছাসত্ত্বেও ধ্রুব কবে এতটুকু উপকার করেছিল, তার জন্যে আজও কৃতজ্ঞ। কোনও কোম্পানি, কত মাইনে কিছুই জিগ্যেস করেনি। অথচ হাতকাটা দালালটা কত ভয় দেখিয়েছিল। জিগ্যেস তো করেইনি, উপরন্তু পঞ্চাশটা টাকা ফিরিয়ে দিল। প্রথমে হয়ত লোভে পড়ে সব টাকাটাই পকেটে ঢুকিয়েছিল, পরে কিছু মনে হতে ফেরত দিয়েছে।
কিসের ব্যবসা ভদ্রলোকের ধ্রুব জানে না। যখন ওদের বাড়ির সামনের একতলায় থাকত, তখন কোনও কোনওদিন দেখত, অনেক রাতে, রাত এগারোটা কি বারোটা, অন্ধকারে একটা ঠ্যালা গাড়ি এসে দাঁড়াত। বিরাট বড় বড় পিপের মতো ড্রাম, তিনটে কি চারটে–কুলিদের সঙ্গে কাঁধ মিলিয়ে রাখালবাবু সেগুলো বাড়ির ভিতর ঢোকাতেন।
আবার আরেকদিন একটা ঠ্যালা গাড়ি আসত, ড্রামগুলো নিয়ে চলে যেত। সেও ওই মধ্যরাত্রে।
ওরা নিজেরা বলাবলি করত। ড্রাম তোলা নামানোর শব্দে প্রায়ই ঘুম ভেঙে যেত ওদের। বারান্দায় গিয়ে কোনও কোনওদিন দাঁড়িয়ে দেখত। কিন্তু ওই ড্রামগুলোর ভিতরে কি আছে কেউ জানত না।
ধ্রুব আজও জানে না।
ওসব জানার ওর প্রয়োজনও নেই। এখন একটাই কাজ, ইলেকট্রিকের মিটার নিজের নামে করাতে হবে। বাড়ি বদলাতে গেলে কত রকম ঝামেলা। আরেকটা কাজ লরি জোগাড় করা। দিনে দিনে তো কম আসবাবপত্র জমা হয়নি। খাট, আলমারি, আয়না, বুককেস, আরো হাজার রকম টুকিটাকি। জমতে জমতে এমন অবস্থা, ঘরে পা ফেলার জায়গা নেই। তা হোক, ওখানে গিয়ে আর এত অসুবিধে হবে না, তিন তিনখানা ঘর, দিব্যি ছড়িয়ে ছিটিয়ে সাজিয়ে রাখা যাবে।
তবে সময় থাকতে থাকতে লরির ব্যবস্থা করে ফেলতে হবে। কোথায় পাওয়া যায় কে জানে। অফিসে কাউকে জিগ্যেস করে দেখবে। কিন্তু লরির চেয়ে বেশি চিন্তা কুলিদের নিয়ে। ট্রেড কুলি না হলে হয়ত কাচফাচ ভেঙে কেলেঙ্কারি করে বসবে।
প্রীতি একসময় বললে, এই বলতে ভুলে গিয়েছিলাম, সেই হাতকাটা দালালটা টাকার তাগাদায় এসেছিল।
–ও হ্যাঁ, ওকে তো আবার এক মাসের ভাড়া দিতে হবে।
প্রীতি হেসে বললে, না, বাড়িওয়ালা কমিয়ে দিয়েছে বলেও ছাড়বে না, বলেছে পুরো সাড়ে চারশোই দিতে হবে।
কথাটা শুনে ধ্রুব একটু ক্ষুণ্ণ হটল, তবুবললে, তাই দেব।
আসলে লোকটা তো আমাদের উপকারই করেছে, ও না থাকলে তো যোগাযোগ হত। এর আগে তো এক জায়গায় মোটামুটি পছন্দও হয়েছিল, কিন্তু বাড়িওয়ালার কত রকম ফিরিস্তি। চাকরির জন্যে ইন্টারভিউ দিতে গিয়েও এত কথা বলতে হয়নি। সে জায়গায় এখানে তো কিছুই বলতে হল না। সেজন্য ও লোকটার কাছে কৃতজ্ঞ।
কিন্তু, যে লোকটা এমন একটা উপকার করল, প্রথম থেকে আজ এখন অবধি সে একজন হাতকাটা দালাল হয়েই রয়েছে। পঞ্চাশটা টাকা বেশি দিতে হবে বলে মুহূর্তের জন্যে মনে হয়েছিল তোকটা কি লোভী। আশ্চর্য, ওর তো একটা নাম আছে, কোনওদিন জিগ্যেস করতেও ইচ্ছে হয়নি। একজন দুঃখী লোক, নামমাত্র উপার্জন, কোনও দুর্ঘটনায় হয়ত হাতটা কাটা গেছে, তার পরিচয় হয়ে গেল হাতকাটা দালাল। নামটা জেনে নিলে নাম ধরেই তো ওরা কথা বলতে পারত। ধ্রুবর মনে হল, আমরা কি স্বার্থপর, বোধহয় প্রথম থেকেই ভেবে নিয়েছি ফ্ল্যাট পেলেই ওর দালালির টাকাটা দিয়ে বিদেয় করে দেব, তার আবার নাম জানার কি দরকার। কিংবা নোকটা হয়ত নাম বলেও ছিল মনে রাখা প্রয়োজন মনে করেনি। পঞ্চাশটা টাকা তাকে বেশি দিতে হচ্ছে বলে এখন গায়ে লাগছে!
-তোকে একটা কথা বলছিলাম…
মা এসে চুপ করে দাঁড়ালেন।
আসলে মার তো খুবই খারাপ লাগছে। হয়ত আবার বলে বসবেন থেকে গেলেই ভাল করতিস; অথবা ওই রকম কিছু, এই আশঙ্কায় ধ্রুব একটু কঠিন স্বরে বললে, কি বলছ বল না।
মা ধীরে ধীরে বললেন, তোরা তো এ সব কিছু মানিস না, তবু আমার কথা ভেবে, বলছিলাম কি, যাবার আগে তোদের ফ্ল্যাটে যদি সত্যিনারাণ দিস।
একটু থেমে বললেন, ছোটবৌমা তো ওসব জানে না, আমি বলছিলাম, যদি আমি গিয়ে ওখানে ওসব দেবার ব্যবস্থাটা করে দিই….
আবার কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, আমি একটু মনে শান্তি পেতাম আর কি।
ধ্রুব একবার প্রীতির মুখের দিকে তাকাল। ও চাইছিল প্রীতি খুশি হয়ে মাকে বলুক, হ্যাঁ, মা, আপনি গিয়ে দেখেশুনে দেবেন, পুজোআচার আমি তো কিছুই জানি না…
কিন্তু না, প্রীতি যেন কি একটা কাজে বড় ব্যস্ত, শুনতেই পায়নি।
তাই ধ্রুব বললে, হ্যাঁ তা তত দিতে হবেই, তুমি যদি পারো মা, খুব ভাল হয়।
মা হাসলেন।—পারব না কি রে। যেন খুব খুশি হয়েছেন ধ্রুব ওঁর কথায় সায় দিয়েছে বলে। বললেন, আমি মরতে মরতেও তোদের জন্যে সব পারব।
মা হাসতে হাসতেই বললেন, কিন্তু চলে যাবার সময়, ধ্রুবর মনে হল, মা যেন চোখে আঁচল ঘষলেন।
ওর মনের ভিতরটায় একটা বিষাদের ছায়া পড়ল। এ বড় যন্ত্রণা। কষ্টও হয়, অথচ যেখানে গিয়ে পৌঁছেছে, ছেড়ে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই। ও এবং প্রীতি যেভাবে বাঁচতে চায়, এখানে সেভাবে বাঁচা যাবে না। সমস্ত বন্ধনগুলো একে একে ছিঁড়ে গেছে। যেন অনেকদিন ধরে হাতকড়া পরানো ছিল, হাতকড়া খুলে ফেলে মনে হচ্ছে আমি মুক্ত, আমি আর বন্দি নই, কিন্তু হাতের কজিতে এখনও যেন হাতকড়ার স্পর্শটা লেগে রয়েছে। মনেই হচ্ছে না ওটা খুলে ফেলেছে।
বুকের মধ্যে একটা তোলপাড় চলছে, কাউকে না বলেও যেন শাস্তি নেই। অথচ এ-সব কথা প্রীতিকে বলা যাবে না। ও শুনলে উপহাস করবে, কিংবা কথায় বিছুটি মাখিয়ে বলবে, তা হলে বৌদিদের আঁচল জড়িয়েই থাকো, এতই যখন ছেড়ে যেতে কষ্ট।
