ধ্রুব এসে সব শুনে জিগ্যেস করল, ডাক্তারের ফি কে দিল?
—তা তো জানি না। এই যা! আমি তো দিতে ভুলেই গেছি। খুব দাদাকে টাকাটা দিতে গিয়েছিল। দাদা হেসে ফেলেছিল। —তুই কি রে? টিপু কি আমাদের পর?
টাকা নেয়নি।
অথচ এদেরই বিরুদ্ধে যুদ্ধ। একটা ফ্ল্যাট পেয়ে আলাদা হতে পারছে বলে ভাবছে যুদ্ধজয় করেছি।
দিনকয়েক পরে মা এসে তারিখটা বললেন।—তোর বাবা বলছিল, এ মাসে তেমন ভাল দিন নেই। সাতাশে ফাল্গুন, একটা অবধি বারবেলা, তার পর।
ধ্রুব বললে, আচ্ছা।
ও বাবার সামনে যেতেই পারছিল না। সেদিন প্রচণ্ড রেগে গিয়েছিল বলেই বলতে পেরেছে। এখন আর সম্ভব নয়। সেজন্যই মাকে বলেছে, তুমি বল। মাকে বলতেও খুব কষ্ট হয়েছে ধ্রুবর। মা-বাবার কি দোষ। ওঁরাও তো ধ্রুবর মতোই, কিংবা ধ্রুবর চেয়েও অনেক বেশি ভিতরে ভিতরে ছিন্নভিন্ন হচ্ছেন। দোটানার মধ্যে ভিতরে ভিতরে পুড়ছেন। ওঁরা তো আর বিচারকের আসনে বসতে পারেন না, যে কার দোষ সেটাই বিচার করবেন।
মা আক্ষেপের স্বরে একদিন বলেছিলেন, কার দোষ? আমার কপালের দোষ রে, আর কারও দোষ নয়।
এ সব কথা শুনলে বড় ব্যথা লাগে, মন খারাপ হয়ে যায়। বাবার চাপা কষ্টের মুখ কিংবা মার দীর্ঘশ্বাস মাখানো কথা যখন ধ্রুবর বুকের ভিতরটা নিঙড়ে দেয়, তখনও তা প্রীতিকে স্পর্শ করে না। অন্তত ধ্রুবর তাই মনে হয়।
অবশ্য কেন তা স্পর্শ করবে প্রীতিকে। ধ্রুবর সঙ্গে ওঁদের সম্পর্কটা জন্ম থেকে। প্রীতি তত সম্পর্ক গড়ে তোলারই সময় পেল না, দিল না। তার জন্যে দোষও দিতে পারে না। ধ্রুবই কি কোনওদিন বুঝতে চেয়েছে, ওর নিজের বাবা-মাকে ছেড়ে প্রীতির এ বাড়িতে আসার সময় প্রীতির ভিতরটা কতখানি ছিন্নভিন্ন হয়েছিল? কেউ বুঝতে পেরেছে? বুঝতে চেয়েছে? দাদা, মেজদা, ও নিজে! কেউ না।
মেজবৌদি এই সেদিন তার বাবা-মার কাছে গিয়ে দিনকয়েক থাকবে বলেছিল।
মেজদা রেগে গিয়ে ধমক দিয়েছিল–তোমার তো এ বাড়িতে থাকতেই ইচ্ছে করে না, সুযোগ পেলেই কেবল বাপের বাড়ি যাব।
ধ্রুবরও শুনে খারাপ লেগেছিল। বাবা মা যেন শুধু ছেলেদের, মেয়েদের বাবা মা যেন সত্যি সত্যি বাবা মা নয়। কই, তাদের বুকের ভিতরটা কি ভাবে ছিঁড়ে যায় আমরা তো ভেবে দেখি না। আমরাই তো ওদের স্বার্থপর করে তুলি। ওরা হয়ত মনে মনে বলে, আমার আজন্ম সম্পর্কটা যদি এতই তুচ্ছ, যদি তোমার জন্যে ছিঁড়ে ফেলতে হয়, তা হলে তোমার জন্মসুত্রের স্নেহ ভালবাসাই বা তুমি ছিঁড়ে ফেলবে না কেন।
খুব তো মনে মনে ভেবে দেখেছে, মা তো এত ভাল, প্রীতিকে এত ভালবাসেন, কিন্তু ওর যে একটা আলাদা পছন্দ থাকতে পারে, রুচি থাকতে পারে, সে কথা মনে রাখেন না কেন? যেন মা যা চায়, যা ভাল মনে করে, সেটাই ঠিক। বাড়ির বউ হয়ে এসেছ, তোমার সমস্ত অস্তিত্ব ড়ুবিয়ে দিতে হবে। কেন? মাকে দোষ দিয়ে কি হবে, ধ্রুব নিজেও তো সেরকমই ভাবে। ঠাণ্ডা মাথায় যখন ভাবে তখন বুঝতে পারে প্রীতির, মানে প্রীতিদের কি অসীম সহ্যশক্তি।
–হোয়াইট ওয়াশের কথাটা কিন্তু বলে আসতে ভুলো না।
প্রীতি মনে পড়িয়ে দিয়েছিল। আর তালাচাবি নিয়ে গিয়ে দরজায় লাগিয়ে দিয়ে আসতে হবে। বাড়িওয়ালাদের কিছু বলা যায় না।
ধ্রুব হেসে বলেছে, না না, সকলে কি একই রকম নাকি? রাখালবাবু দারুণ ভালমানুষ, আমরাই আগে বুঝতে পারিনি।
বুঝতে সত্যিই পারেনি কেউ। কত সাদাসিধে ভাবে থাকতেন ওঁদের সামনের বাড়ির একতলায়। এত বড় একখানা বাড়ি হাঁকিয়ে বসবেন কোনওদিন ভাবেনি কেউ। ধ্রুব অবশ্য বাড়ির কাউকেই বলবে না। ওরা শুনলে অবাক হয়ে যাবে। কিন্তু সম্মানেও লাগবে।
বড় বৌদি হয়ত বলে বসবে, ওই লোকটাকে তোমরা অত হতশ্রদ্ধা করতে, তারই বাড়ির একটা ফ্ল্যাট ভাড়া নিতে তোমাব লজ্জা করল না।
ঘরগুলো চুনকাম করিয়ে দেওয়ার কথা বলার জন্যেই খুব গেল একদিন। এমন কিছু রাত হয়নি তখন।
গোঁপওয়ালা পালোয়ান টাইপের দারোয়ানকে বললে, বাবুকে একবার খবর দাও, দেখা করব।
দারোয়ান বললে, সকালে আসবেন।
ধ্রুব বললে, তুমি গিয়ে খবরই দাও না। বল, ধ্রুববাবু এসেছেন। বলবে, ধ্রুববাবু। যিনি ওই ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়েছেন।
দারোয়ান অখুশি মুখ করে বললে, ঠহরিয়ে।
একটু পরেই ওপর থেকে নেমে এসে বললে, বাবু শুয়ে পড়েছেন।
ধ্রুবর বিশ্বাস হল না। এত তাড়াতাড়ি কেউ শুয়ে পড়তে পারে না। তা হলে কি ইচ্ছে করেই দেখা করলেন না রাখালবাবু? এতখানি হেঁটে এসেছে ও, আবার ফিরে যেতে হবে। আবার আসতে হবে কাল। অথচ দুমিনিটের তো কথা।
ধ্রুবর রীতিমতো অপমান লাগল। প্রীতি ঠিকই বলেছে। বাড়িওয়ালা হলেই বোধহয় এইরকম হয়ে যায়। ভাড়াটের সুখসুবিধে, সম্মান-অসম্মান যেন কিছুই নয়।
রাগ চেপে ধ্রুব বললে, কাল আর আসতে পারব না হয়ত, তুমি বলে দিও ঘরগুলো চুনকাম করিয়ে দিতে। আসলে দারোয়ানের কাছে আত্মসম্মান রাখার জন্যেই বলতে হল, কাল আসতে পারব না।
দারোয়ান ঘাড় নেড়ে বললে, আচ্ছা বাবুজি।
ধ্রুব মনঃক্ষুণ্ণ হয়ে চলে আসছিল। দারোয়ান হাসল।রাতমে বাবুর সঙ্গে মোলাকাত হয় না বাবুজি। ওর হাসিটা কেমন রহস্যজনক।
—কেন? ধ্রুব প্রশ্ন করল।
দারোয়ান হাসতে হাসতে হাতটা মুখের কাছে তুলে গ্লাসে চুমুক দেওয়ার ভঙ্গি করলে।
তাই বুঝি!
রাখালবাবু তা হলে টাকাই করেননি, এই গুণটাও হয়েছে। না কি আগে থেকেই ছিল, ওরা জানত না।
এতক্ষণ ওর অপমান লাগছিল, মুহূর্তে তা ধুয়েমুছে গেল। কিন্তু প্রীতি আবার এ কথা শুনলে বেঁকে বসবে না তো? হয়তো বলে বসবে, একটা মাতালের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে তুলছ!
