রাখালবাবুর ফ্ল্যাটে উঠে এলে নিশ্চয় প্রচুর হাওয়া পাবে। আর কতখানি জায়গা। তিন তিনখানা ঘর।
মনের ভিতর তখন একটা দারুণ ফুর্তি। রাস্তায় বেশ হাওয়া দিচ্ছে। বাড়িতে না থাক, রাস্তায় হাওয়া থাকে বলেই তো বিকেল হতে না হতে সকলেই বাইরে বেরিয়ে পড়ে। তাই এত ভিড়।
ধ্রুব এসে ঘন ঘন দরজার কড়া নাড়ল। কলিং বেলটা অনেককাল খারাপ হয়েছে, সারানো হয়নি। কেই বা মিস্ত্রি ডেকে এনে সারাবে। ধ্রুব ইচ্ছে করে মিস্ত্রি খুঁজতে যায়নি। বারবার ওকেই যেতে হবে কেন। দাদা কিংবা মেজদাও তো ডাকতে পারত। সবাই ভাবছে আরেকজন কেউ ডেকে আনবে। মিস্ত্রি ধরে আনাও এক ঝামেলা, একবার গেলেই তো আর পাবে না। তাছাড়া বেটা খারাপই হয়ে গেছে, নতুন কিনতে হবে। যে কিনে আনবে তাকেই দিতে হবে টাকাটা। বাবা রিটায়ার্ড মানুষ, এখন তো আর সব ব্যাপারে হাত পেতে টাকা চাওয়া যায় না।
দরজা খুলতেই এক এক লাফে দুদুটো সিঁড়ি ভেঙে সটান নিজের ঘরে চলে এল। প্রীতি শুয়ে একটা সিনেমার কাগজ পড়ছিল।
ধড়মড় করে উঠে ব্যগ্র গলায় প্রশ্ন করল, বাড়িওয়ালার সঙ্গে দেখা হল?
ধ্রুব উজ্জ্বল মুখ নিয়ে রসিদটা পকেট থেকে বের করে দেখাল।—ফাইনাল। একেবারে রসিদ নিয়ে এসেছি।
প্রীতির মুখেও উজ্জ্বল হলি। যেন এতদিন বাদে সত্যি সত্যি যুদ্ধ জয় করেছে।
তারপরই ধ্রুব বললে, একটা অবাক কাণ্ড, তোমাকে তো আসল কথাটাই বলা হয়নি।
প্রীতির চোখে প্রশ্ন।
খুব হাসতে হাসতে বললে, বাড়িওয়ালা তো চেনা লোক, খুব চেনা। ওই সামনের ফ্ল্যাট বাড়িটা হওয়ার আগে…
কথাটা বলে ফেলে ধ্রুবর নিজেরই কেমন খারাপ লাগল। চেনা লোেক, খুব চেনা। সত্যি কি তাই?
কেমন বিষণ্ণ হয়ে গেল ওর গলার স্বর।—জানো প্রীতি, মাত্র একখানা না দেড়খানা অন্ধকূপ ঘর নিয়ে থাকত একটা গোটা সংসার। এখন ফেঁপেফুলে বড়লোক হয়ে গেছে। কিসের ব্যবসা কে জানে।
চেনা লোক বলার অধিকার কি ধ্রুবর আছে! ও তো লোকটিকে এড়িয়ে এড়িয়ে যেত। লুঙ্গি পরে ফতুয়া গায়ে দিয়ে থলি হাতে করে যখন বাজার যেত, ডেকে কথা বললেও ধ্রুব এড়িয়ে যেত। যেন পাড়ার কেউ দেখলে ওর নিজেরও দাম কমে যাবে। ওর ট্রাউজার্সের কাপড় যে বেশ দামি, কেউ ভাববে না। অথচ এখন তাকেই খুব চেনা লোক হিসেবে স্বীকার করতে একটুও অস্বস্তি হচ্ছে না।
ধ্রুবর মনে হয়েছিল ও যুদ্ধজয় করে ফিরছে। এখন আর তেমন মনে হচ্ছে না।
শুনলে বাবার হয়ত একটু সম্মানে লাগবে। দাদাদের বৌদিদের।
আশ্চর্য, ভাগ্য এক একজন মানুষকে কত তাড়াতাড়ি বদলে দিতে পারে।
কিন্তু একে কি যুদ্ধজয় বলে। এতদিন তো ওর সামনে ছিল আত্মসম্মানের প্রশ্ন। সে আত্মসম্মান শুধু নিজের পরিবারের কাছে, দাদা বৌদিদের কাছে, তাদের ছেলেমেয়েদের কাছে।
খুব অহঙ্কার নিয়ে বলেছিল, এত অশান্তি নিয়ে থাকা যায় না। আমরা উঠে যাচ্ছি।
কথা রাখতে পেরেছে, একটা ফ্ল্যাট জোগাড় করে তাদের চোখের সামনে দিয়ে সদর্পে উঠে যাবে, সেটাই যেন যুদ্ধজয়।
অথচ এটা যে এত বড় পরাজয় ধ্রুব এতক্ষণ ভেবে দেখেনি। পরাজয় একটা নগণ্য মানুষের কাছে। দীনদরিদ্র দুঃস্থ মানুষ বলে মনে হত, ধ্রুবদের সঙ্গে কথা বলতে পেলেই ধন্য মনে করত। দু লাইন ইংরিজি লিখতে পারে না। রসিদে সইটা দেখেই হাসি পেয়ে গিয়েছিল।
উপমন্ত্রীকে গ্রামের স্কুলে নিয়ে যাবে, একটা অভিনন্দনপত্র লিখে দেবেন ইংরিজিতে। কাকে কি ভাবে তোয়াজ করতে হয়, ঠিক জানে। হাসতে হাসতে বলেছিল, না না, ইংরিজি। ইংরিজিতে হলেই ওঁরা খুব খুশি হন। ছাপার অক্ষরে ইংরিজিতে নিজের নাম, বুঝলেন কিনা!
প্রীতি সব শুনে বলে উঠল, তা হোক। তারপরই হেসে বললে, দেখো, এবার ওর ব্যবসার চিঠিপত্র সব তোমাকে দিয়ে লেখাতে আসে।
ধ্রুবও হাসল।
মাকে গিয়ে বলল, আমরা চলে যাচ্ছি, ফ্ল্যাট পেয়ে গেছি।
মা অবাক হয়ে ওর মুখের দিকে তাকালেন। -সত্যি চলে যাবি?
মার মুখ দেখে মনে হল যত রাগারাগি করেই ও সেদিন বলে থাকুক, মা একটুও বিশ্বাস করেননি। দুমাস ধরে ও ফ্ল্যাট খুঁজছে বটে, কিন্তু ও-সব নিয়ে আর তো কথা হয়নি; তাই ভেবেছিলেন, ওটা রাগের কথা, সত্যি চলে যাবে না।
—ছোটখাটো ব্যাপার নিয়ে কোন সংসারে ঝগড়াঝাঁটি হয় না।
মা এসে প্রীতিকে ধরলেন, ছোটবৌমা, তুমিই একটু বুঝিয়ে বল।
প্রীতি কোনও কথা বলল না। ও তখন একটা সজারু হয়ে আছে, সর্বাঙ্গে কাঁটা ফুলিয়ে। কেউ না গায়ে হাত দিয়ে একটু আদর করে ফেলে।
শেষ পর্যন্ত মা বুঝতে পারলেন ও-সবে কিছু হবে না।
তাই ধীরে ধীরে বললেন, তোর বাবাকে একটা ভাল দিন দেখে দিতে বলিস। তোর সংসারের মঙ্গলও তো আমাকেই ভাবতে হবে।
অথাৎ পাঁজি দেখিয়ে দিনস্থির করতে হবে। ওসরে ধ্রুবর কোনও বিশ্বাস নেই, প্রীতিরও না। তবু মনটা কেমন নরম হল। বললে, তুমিই বল।
মা’র এ ইচ্ছেটা অন্তত রাখতে চাইল। না কি, নতুন বাড়িতে উঠে যাওয়ার আগে ওদেরও ভয়-ভয় করছিল। এতদিন ধরে এখানে আছে, মাথার ওপর বাবা-মা। পাড়াটাও রক্তমাংসের সঙ্গে মিশে গেছে।
এখন তো যেতে হবে একেবারে নতুন পরিবেশে। বিপদ-আপদ অসুখ-বিসুখে এখন আর কারও ওপর ভরসা করা চলবে না।
টিপুর হঠাৎ একদিন একেবারে একশ-তিন জ্বর। ধ্রুব বাড়ি ছিল না। প্রীতি এপাড়ার কোনও ডাক্তারকেই চিনত না। দাদা অফিস থিকে ফিরে যেই শুনল, পোশাক না বদলেই বেরিয়ে গিয়েছিল।
ডাক্তার নিয়ে এসেছিল। প্রীতি তখন উভ্রান্ত, ডাক্তারের কথায় ঠাণ্ডা জল নিয়ে টিপুর মাথা ধুইয়ে দিতে ব্যস্ত। ডাক্তারকে ফি দেওয়ার কথা মনে ছিল না।
