বাইরে থেকে দেখল। তারপর বললে, ফ্ল্যাটটা আমি তো দেখিনি, একবার দেখলে হয়
না?
দারোয়ান বললে, চলিয়ে। লেকিন বাত্তি নেই।
সিঁড়িতে আলো ছিল। কিন্তু ফ্ল্যাটের ঘরগুলো একেবারে অন্ধকার। আগের ভাড়াটে ভদ্রলোক তাঁর বালবগুলো খুলে নিয়ে যেতে ভোলেনি।
দেশলাই জ্বেলে জ্বেলে যেটুকু দেখা যায় দেখল ধ্রুব। পছন্দ হল কি হল না নিজেও বুঝতে পারল না।
দালাল লোকটি বললে, বৌদির কিন্তু খুব পছন্দ হয়েছে।
লোকটার মুখে বারবার বৌদি কথাটা ভাল লাগছিল না।
আসলে ধ্রুবর চেয়েও দালালটির ব্যগ্রতা যেন বেশি।
ধ্রুব বললে, ঠিক আছে।
দরজায় তালাচাবি লাগল দারোয়ান।
গোঁপওয়ালা বিহারি দারোয়ানের পিছনে পিছনে ওরা নেমে এল।
দরজার বাইরে এসে দারোয়ান ওদের বললে, ঠহরিয়ে। অর্থাৎ অপেক্ষা করুন।
বলে আবার সিঁড়ি ভেঙে তিনতলায় উঠে গেল। যাবার আগে দরজাটা ভিতর থেকে বন্ধ করে দিয়ে গেল।
লোকটা খুবই সাবধানি। বিশ্বাস করে দরজাটা খুলে রেখেও গেল না। সঙ্গে করে ওপরেও নিয়ে গেল না।
বাড়িওয়ালার সঙ্গে দেখা করার জন্যে এভাবে অপেক্ষা করতে হলে বড় হীনম্মন্যতায় ভুগতে হয়। ধ্রুব সেজন্যে ভিতরে ভিতবে বিরক্তি বোধ করছিল। লেনদেনের ব্যাপার। তুমি ভাড়া দেবে, আমি ভাড়া নেব। দুজনেরই স্বার্থ। তুমি আমার উপকার করার জন্যে ভাড়া দিচ্ছ না। তুমি তিনতলার হাওয়া খেতে চাও, তাই নীচের তলা এবং দোতলা বানাতে হয়েছে। সুতরাং সেগুল খালি ফেলে রাখতে চাও না। হিসেব করে দেখেছ, ফেলে রাখলে লোকসান। তাই ভাড়া দিচ্ছ। দয়া করে নয়। অথচ ভাবটা এমন, যেন উনি জমিদার আর ধ্রুব প্রজা।
এভাবে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে ধ্রুবর খুবই খারাপ লাগছিল। অথচ মনের মধ্যে একটা উদ্বেগ! ওকে বাড়িওয়ালার পছন্দ হবে কি না, ভাড়া দিতে রাজি হবে কি না।
পছন্দ না হলে হয়তো এক কথায় বলে দেবেন, না মশাই দেব না। কিংবা ভদ্রতা করে বলবেন, আগে এলে না, একজনকে দিয়ে ফেলেছি।
দুমাস ধরে ঘুরে ঘুরে এদের চিনে ফেলেছে ধ্রুব।
কিছুক্ষণ পরেই গোঁপওয়ালা দারোয়ানটা ফিরে এল। বললে, চলিয়ে। ধ্রুব তার পিছনে পিছনে ওপরে উঠে গেল।
একটা দরজা দেখিয়ে ঘরের ভিতর ঢুকতে বলল দারোয়ান।
ধ্রুব পা বাড়াল।
সঙ্গে সঙ্গে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে অবাক গলায় বললে, আপনি!
ভদ্রলোকও চমকে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছেন। মুখে হাসি। বললেন, বসো, বসো।
ধ্রুব বসল। তাকিয়ে তাকিয়ে চারপাশ দেখে নিল। বেশ গোছানো বসার ঘর। দামি সোফা কৌচ, রবারের গদি। নীচে কার্পেট।
এ-সবে যত না অবাক তার চেয়ে বেশি ভদ্রলোকের পোশাক-আশাক দেখে।
সেই রাখালবাবু। ওদের বাড়ির সামনে হেমন্তবাবুর ধসে পড়া জরাজীর্ণ বাড়ির একতলার দেড়খানা ঘরে যিনি থাকতেন। তাঁকে তো লুঙ্গি আর ফতুয়া পরে বাজারে যেতে দেখে এসেছে, ধুতি পাঞ্জাবি পরে যখন কাজে বেরোতেন, কি কাজ কে জানে, ধুতিটা হাঁটু অবধি উঠে থাকত।
সেই রাখালবাবুর পরিধানে এখন ট্রাউজার্সের শোভা। অনভ্যস্ত বলে কেমন ঢিলেঢালা। গায়ে চকরবকর বুশশার্ট।
ধ্রুব হাসতে হাসতে বললে, আপনার বাড়ি! আমি ভাবতেই পারিনি।
রাখালবাবুও হাসলেন।–সবই লক্ষ্মীর কৃপা।
তারপর বললেন, তোমরা তাহলে এখনও ভাড়াবাড়ি খুঁজছ? কিছু একটা করলে না?
অর্থাৎ বাড়ি।
ধ্রুব বললে, কই আর হল। তবে ওঁদের জন্যে নয়, আমি খুঁজছি আমার নিজের জন্যে।
রাখালবাবু বললেন, সেই ভাল, ওই জয়েন্ট ফ্যামিলি শুধু শুনতেই ভাল, যত দূরে থাকবে তত শন্তি।
ধ্রুব শুধু হাসল। ভদ্রলোক তা হলে সবই বুঝে ফেলেছেন।
ও পকেট থেকে টাকাটা বের করলে। বললে, এই নিন সাড়ে চারশো।
রাখালবাবু যাতে দোমনা হবার সুযোগ না পান সেজন্যেই, নাকি তাঁর গলার স্বরেই বুঝে নিয়েছে ফ্ল্যাট ও পেয়ে গেছে, তাই বৃথা বাক্যব্যয় না করে ধ্রুব টাকাটা এগিয়ে দিল।
রাখালবাবু হাত বাড়িয়ে টাকাটা নিলেন। ধীরে সুস্থে বুকপকেটে রাখলেন, তারপর হাসতে হাসতে বললেন, লক্ষ্মী আর সরস্বতীর মিল হয় না, বুঝলে কি না। তোমরা এখনও সেই ভাড়াটে।
বলে উঠে গিয়ে রসিদ বইটা নিয়ে এলেন। বললেন, তুমি আমার একটা উপকার করেছিলে একবার, আমি ভুলিনি।
রসিদটা লিখতে গিয়ে পকেট থেকে টাকাটা বের করলেন। গুনেগুনে পাঁচটা দশ টাকার নোট ফেরত দিয়ে বললেন, তুমি চারশোই দিয়ো, পাশের ফ্ল্যাটও তাই দেয়।
একমুখ হেসে ধ্রুবর মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, ভেবেছিলাম ভাড়া বাড়াব, পঞ্চাশ টাকা বেশি নেব। থাক, ওই চারশোই দিয়ে।
কড়কড়ে পাঁচখানা দশটাকার নোেট ফেরত পেয়ে খুব তখন খুশিতে ডগমগ। বারবার খোঁচা দিয়ে ভাড়াটে ভাড়াটে বলছিলেন বলে যেটুকু তিক্ততার সৃষ্টি হয়েছিল মনের মধ্যে নিমেষে তা মিলিয়ে গেল। না, ইচ্ছে করে বলেননি। তা হলে কি উপকারের কথা তুলতেন।
ফেরার পথে ও যেন বাতাসে ভাসতে ভাসতে চলেছে।
আর তখনই মনে হয়েছে, মানুষের উপকার করলে কখনো-সখনো বড় কাজে লেগে যায়।
অথচ ও তো উপকার করতে চায়নি। বরং বিরক্ত হয়েছিল। নিতান্তই বাধ্য হয়ে, ভদ্রতার খাতিরে অভিনন্দনপত্র লিখে দিয়েছিল।
আশ্চর্য, রাখালবাবু কিন্তু সেকথা মনে রেখেছেন। মনে করে রেখেছেন বলেই বোধহয় পঞ্চাশ টাকা ভাড়া কমিয়ে দিলেন। ইচ্ছে করলেই তো নিতে পারতেন।
০৩. ধ্রুব যেন যুদ্ধ জয় করে ফিরছে
ধ্রুব যেন যুদ্ধ জয় করে ফিরছে এমন একটা আনন্দ নিয়ে হাঁটছিল। ওদের দোতলা বাড়িটার সামনে রাস্তার ওপারে বিশাল চারতলা ফ্ল্যাটে বাড়িটা মাথা তুলে দাঁড়ানোর পর থেকে ওদের দক্ষিণ চাপা পড়ে গেছে, হাওয়া ঢোকে না। ধ্রুবর ঘরে তো একেবারেই না। জানালা আছে, সামনের দিকে বেশ খানিকটা ফাঁকা, তবু বাতাসের নামগন্ধ নেই। জানালা তো আর হাত ধরে দখিনা বাতাসকে আসুন আসুন বলে ডেকে আনতে পারে না। সে আসার আগে বেরোনোর রাস্তা আছে কিনা দেখে নেয়। কোথায় যেন পড়েছিল, চোর এবং হাওয়া একই চরিত্রের, পালানোর পথ না থাকলে ঢোকে না।
