গুণ্ডামতো! কথাটা কানে বিস্বাদ লাগল ধ্রুবর। মনে হল যেন ইচ্ছে করেই বললে মেজবৌদি।
কিন্তু লোকটিকে চিনতে পারল। বেঁটেখাটো দারুণ ভাল স্বাস্থ্য লোকটির। কপালে একটা দাগ আছে, বাঁহাতের কনুই থেকে ফুল হাতা শার্টের হাতাটা ঝুলে থাকে। ওটুকুর জন্যেই লোকটিকে নিরাপদ মনে হয়। কিন্তু সব মিলিয়ে তাকে ধ্রুবরও অপছন্দ। কথাবার্তাতেও অশালীন।
ওই লোকটির সঙ্গে প্রীতি একা বেরিয়ে গেল? কোথায় কতদূরে নিয়ে যাবে কে জানে। এত তাড়াহুড়োর কি ছিল। ওকে তো সন্ধের পর কিংবা কাল সকালে আসতে বললেই হত।
বাড়িওয়ালা লোকগুলোকে এই দুমাসে হাড়ে হাড়ে চিনে নিয়েছে ধ্রুব। কথাবার্তার ধরনই অন্যরকম। এই আজ যেখানে যাবার কথা, দালাল ফোন করতেই ও বললে অফিস ছুটির পর যাবে। সে উত্তর দিলে, তা হলে উনি বেরিয়ে যাবেন, বলেছেন সাড়ে ছটার মধ্যে যেতে হবে। যেন ট্রেন ধরার ব্যাপার, ঘড়ি ধরে পৌছতে হবে। অবশ্য বলা যায় না, দালালটির নিজের ব্যগ্রতাও হতে পারে। একটা ফ্ল্যাট জুটিয়ে দিলেই তো একমাসের ভাড়া পাবে।
প্রীতির জন্যে খানিকটা উৎকণ্ঠা নিয়েই বেরিয়ে পড়ল ও।
বাস স্টপে পৌঁছতে দেখতে পেল ট্যাক্সি থেকে নামছে প্রীতি।
ধ্রুব কিছু প্রশ্ন করার আগেই প্রীতি হাসতে হাসতে বলে উঠল, দারুণ সুন্দর ফ্ল্যাট। এইমাত্র দেখে এলাম। কাছেই, বকুলবাগানে।
এমন স্বতঃস্ফূর্ত হাসি প্রীতির মুখে বহুদিন দেখেনি ও।
প্রীতি বললে, আজই, এখনই টাকা নিয়ে চলে যাও। তা না হলে, কাল সকালে একজন আসার কথা।
ধ্রুব বললে, কিন্তু দালাল লোকটা এল না কেন? কোথায় পাব ওকে?
প্রীতি ভুরু কুঁচকে বললে, কি যে বল, ওই গুণ্ডটাইপের লোকটাকে কি আমি ট্যাক্সিতে সঙ্গে নিয়ে আসব।
তারপরই বললে, ওর চেহারাটাই ওই রকম, লোকটা কিন্তু ভীষণ ভাল।
মেজবৌদি বলেছিল, গুণ্ডামত, তখন খুব খারাপ লেগেছিল। এখন প্রীতি বলছে। গুণ্ডাটাইপের। শুনতে অন্য কারণে খারাপ লাগল। একটা ভাল ফ্ল্যাট পাওয়া গেছে, অন্তত পাওয়ার আশা। ওই লোকটাই জোগাড় করে দিচ্ছে, তাই এখন ওকে গুণ্ডাটাইপ বলতেও খারাপ লাগছে।
ধ্রুব জিগ্যেস করল, কোন তলায়? ভাড়া কত?
প্রীতি বললে, ওকে সঙ্গে নিয়ে ট্যাক্সিতে আসব না বলেই বুদ্ধি করে বললাম, আধ ঘণ্টা পরে আসতে।
ধ্রুব আগের প্রশ্নগুলো আবার করল।
প্রীতি বললে, দোতলায়, সাড়ে চারশো। শুধু এক মাসের অ্যাডভান্স।
সাড়ে চারশো। প্রীতির দাদার কথাটা মনে পড়ল। বাড়ি ভাড়াতেই অত বেরিয়ে গেলে খাবে কি? কথাটা সেদিন বুকে গিয়ে লেগেছিল, কিন্তু কথাটা তো সত্যি। তা হোক। ধ্রুব ভাবল, যেমন করে হোক চালিয়ে নেব। এই একটা দিক নিয়ে কারও কোনও ভাবনা নেই। না সরকারের, না কোম্পানিগুলোর। মাইনে দিয়েই দায়দায়িত্ব শেষ। তার অর্ধেক যে বাড়িওয়ালার গর্ভে চলে যাবে সে খেয়ালই নেই। অর্থাৎ কলকাতায় থাকার তোমার অধিকারই নেই, আহা, ডেলি প্যাসেঞ্জারি করো। সেখানেও ঘন ঘন ট্রেন লেট, মানে হাজরি-খাতায় লাল দাগ। বড় সাহেব, মেজ সাহেবের লাল চোখ।
ওদের তো কোনও চিন্তা নেই, অফিসের খরচায় ভাল-ভাল ফ্ল্যাট। গাড়ি। ব্যাটাবা পাংচুয়েলিটির বড়াই করে।
ওদের জন্যে কোম্পানিগুলো বেশি বেশি টাকা দিয়ে ভাল ফ্ল্যাটগুলো নিয়ে যাচ্ছে বলেই তো সাধারণ মানুষের এই হাল।
পকেটে টাকাটা নিয়ে ধ্রুব অপেক্ষা করল বাড়িতে ফিরে। দালাল লোকটা কখন আসে। আসবে তো!
—দক্ষিণ খোলা?
প্রীতি অবাক হয়ে তাকাল। বললে, তা তো জানি না। রান্নাঘরটা বেশ বড়। বাথরুম ছিমছাম, পরিষ্কার।
দক্ষিণ খোলা কি না তা দেখার প্রয়োজন বোধ করেনি ও। তাই স্তোক দেবার মতো করে বললে, দক্ষিণে আর কতটুকু হাওয়া আসে।
–বাড়িওয়ালার সঙ্গে দেখা হল?
–না। বাড়িতে একটা ইয়া গোঁপওয়ালা দারোয়ান আছে, সেই দেখাল ফ্ল্যাটটা। দালালটা বললে, বাড়িওয়ালার সঙ্গে তোমাকে দেখা করতে হবে। কোন কোম্পানি, কত মাইনে, আরও কি সব জানতে চাইবে। এর আগে একজনকে দেয়নি। একজন মাদ্রাজি আজই দেখে গেছে, কাল আসবে সকালে।
ধ্রুব বললে, তা হলে আর গিয়ে লাভ কি, ইন্টারভিউয়ে ফেল করে যাব। একজন মাদ্রাজি ক্যান্ডিডেট যখন আছে..বাড়িওয়ালারা আজকাল খুব মাদ্রাজি পছন্দ করে।
প্রীতি হেসে বললে, না এখন আর তা নেই; এখন ওরা মাদ্রাজিদেরই বেশি ভয় পায়। বাঙালিকে ফ্রায়িংপ্যান ভাবত, এখন ফায়ার কি বস্তু বুঝতে পারছে। দালালটা অবশ্য সে-রকমই বললে।
দালালটা, দালালটা। ধ্রুবর শুনতে ভাল লাগছিল না। ব্রোকার বললেই তো হয়। কারণ, ওই একজন এতকাল পরে একটু আশার আলো দেখিয়েছে। ও তো হতাশ হয়ে পড়েছিল। হতাশ এবং ক্লান্ত।
লোকটা এল। পকেটে টাকা নিয়ে ধ্রুব বেরিয়ে গেল।
রাস্তা হাঁটতে হাঁটতে লোকটা কেবলই বলছে, ওই তো আর একটু। বাড়িটা এত চমৎকার, ফাস্টক্লাশ ফ্ল্যাট, বৌদির খুব পছন্দ হয়েছে।
সামনেই একটা ঝকঝকে চমৎকার বাড়ি, দোতলায় ব্যালকনি আছে। একেবারে ছবির মতো সুন্দর। ধ্রুব ভাবলে, ওই বাড়িটাই। বাইরে থেকে দেখে ফ্ল্যাটটা ভারী ভাল লেগে গেল। ধ্রুব ভাবলে ওটাই হবে হয়তো। বেশ খুশি হয়ে উঠল।
কিন্তু না। ওটা নয়। লোকটা ও বাড়ি পার হয়ে এগিয়ে চলেছে। আরেকটা বেশ ভাল বাড়ি। ঝকঝকে নতুন। এটাই হয়তো, ধ্রুব ভাবলে।
না , ওটাও নয়।
শেষে আরেকটা বাঁক নিয়ে সরু গলিটার মধ্যে ঢুকল। গলিটা দেখেই ওর পছন্দ হয়নি। কিন্তু বাড়িটা ভাল লেগে গেল। আগে যে দুটো চমৎকার বাড়ি ওর মন কেড়েছিল, সুন্দর লেগেছিল, তেমন ভাল নয় এটা। তবু মনকে বোঝাল, খারাপই বা কি!
