হাসনাত বলল, লিলি ঘরে মাখন আছে। রুটিতে মাখন লাগিয়ে দেব?
দিন।
রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তো খেতে পারবে না। আমার স্টুডিওতে চলে যাও। জাহিন দেখিয়ে দেবে। জাহিন শোনো, তুমি উনাকে আমার স্টুডিওতে নিয়ে যাও। তারপর তুমি গল্পের বই নিয়ে বসে।
জাহিন গম্ভীর গলায় বলল, তোমরা গোপন কথা বলবে?
গোপন কথা বলব না। এমন কিছু কথা যা ছোটদের শুনতে ভালো লাগবে না।
আমার সব কথাই শুনতে ভালো লাগে।
ভালো লাগলেও শোনা যাবে না।
স্টুডিও বিশাল কিছু না। মাঝারি আকৃতির ঘর। ঘরে জানালা বন্ধ বলে গুমোট গুমোট ভাব। কড়া তাৰ্পিন তেলের গন্ধ। ঘরময় রঙের বাটি। বেতের চেয়ার কয়েকটা আছে। চেয়ারের ধুলার আস্তর দেখে মনে হয় চেয়ারগুলো ব্যবহ্বর হয় না। এক কোনায় ক্যাম্প খাটে মশারি খাটানো। ঘুপচি ঘরের ক্যাম্প খাটে কে ঘুমায়?
লিলি চেয়ারে বসেছে। তার হাতে চায়ের কাপ। হাসনাত বসেছে মেঝের কার্পেটে। অনেকটা পদ্মাসনের ভঙ্গিতে। বন্ধ জানালা খুলে দেয়ায় গুমোট ভাবটা নেই। বাইরের ঠাণ্ডা হাওয়া আসছে। হাসনাতের হাতে সিগারেট। সে সিগারেটে টান দিয়ে বলল, স্বাতী তোমাকে তার ছবিটার জন্য পাঠিয়েছে, তাই তো?
হ্যাঁ।
ওর মনে ভয় ঢুকে গেছে আমি এই ছবি সবাইকে দেখিয়ে বেড়াব। তাই না?
হুঁ।
তুমি ওকে বুঝিয়ে বলবে যে, এ জাতীয় কাজ আমি কখনই করব না। আর্টিস্ট হিসেবে আমি পিকাসো না, কিন্তু মানুষ হিসেবে বড়। তুমি বরং এক কাজ করো আমি ছবিটা ভালোমতো র্যাপ করে দিচ্ছি। নিয়ে যাও, ওকে দিয়ে দেবে। তবে বড় ছবি নিতে তোমার হয়তো কষ্ট হবে।
কষ্ট হবে না। আমি নিতে পারব।
স্বাতী তোমার খুব ভালো বন্ধু, তাই না?
হ্যাঁ। আমার একজনই বন্ধু। আপনি বোধহয় ওর ওপর খুব রেগে আছেন।
আমি তার ওপর মোটেই রেগে নেই। আমার একটা ক্ষীণ সন্দেহ সব সময়ই ছিল যে, এই জাতীয় কিছু সে করে বসবে।
এ রকম সন্দেহ হবার কারণ কি?
হুট করে আসা আবেগ হুট করেই চলে যায়। স্বাতী বুদ্ধিমতী মেয়ে, সে শেষ মুহূর্তে হলেও ব্যাপারটা ধরতে পেরেছে। বোকা মেয়েগুলো ধরতে পারে না। স্বাতী না হয়ে অন্য কোনো মেয়ে হলে কি করত জানো? বিয়ে করে ফেলত তারপর নানান অশান্তি। আমি আমার মেয়েটাকে নিয়ে পড়তাম বিপদে।
বিয়ে ভেঙে গিয়ে আপনার জন্যও ভালো হয়েছে।
হ্যাঁ, আমার জন্য ভালো হয়েছে। আসলে একা থাকতে থাকতে আমার অভ্যাস হয়ে গেছে। নতুন করে সংসার শুরু করা আমার জন্য কষ্টকর হতো। আমার বিয়েতে রাজি হবার প্রধান কারণ কিন্তু আমার মেয়ে। ওর একজন মাদার ফিগার দরকার। মায়ের জন্য মেয়েটার ভেতর তৃষ্ণা জন্মেছে। যে-ই এ বাড়িতে আসে মেয়েটা তার মধ্যেই তার মাকে খোঁজে।
স্বাতীর কাছে এই ব্যাপারটা কখনও বলেছেন?
বলেছি। এও বলেছি জাহিন যে তার মাকে খোঁজে তাই না, আমি নিজেও তার ভেতর আমার স্ত্রীকে খুঁজছি। এখন বুঝতে না পারলেও একদিন বুঝবে। তখন সে কষ্ট পাবে।
ও বুঝতে চায় নি?
না, বুঝতে চায় নি। তোমাদের মতো বয়েসী মেয়েদের সাধারণ প্রবণতা হচ্ছে অন্যের যুক্তি ছোট করে দেখা। এই সময়ের মেয়েদের নিজেদের ওপর আস্থা থাকে খুব বেশি।
এটা কি খারাপ?
খারাপ না, ভালো। তবে শুধু নিজেদের ওপর আস্থা থাকবে অন্যদের ওপর থাকবে না এটা খারাপ। তুমি কি আরেক কাপ চা খাবে লিলি?
জি-না, সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে আমি এখন যাব। আপনি ছবিটা দেবেন বলেছিলেন দিয়ে দিন।
তুমিও দেখি আমার ওপর বিশ্বাস রাখতে পারছ না।
আমি পারছি।
তাহলে ছবিটা সঙ্গে নেয়ার জন্য এত ব্যস্ত কেন?
স্বাতী খুব মানসিক চাপের ভেতর আছে। ছবিটা পেলে চাপ থেকে মুক্ত হবে। ও খুব খুশি হবে।
ছবিটা দিয়ে তাকে খুশি করতে চাচ্ছ?
জি।
দিচ্ছি, ছবি দিয়ে দিচ্ছি। তুমি না এলেও তার ছবি আমি তাকে দিয়ে দিতাম। ছবিটা হয়েছে খুব সুন্দর। দেখতে চাও?
জি-না।
দেখতে পারো। নগ্নতা তো কোনো লজ্জার বিষয় হতে পারে না। লজ্জার বিষয় হলে প্রকৃতি আমাদের কাপড় পরিয়ে পৃথিবীতে পাঠাত। আমরা নগ্ন হয়ে পৃথিবীতে এসেছি। নগ্নতার জন্য লজ্জিত হবার বা অস্বস্তিবোধ করার আমি কোনো কারণ দেখি না।
লিলি নিচু গলায় বলল, আমি ছবিটা দেখতে চাচ্ছি না।
লজ্জা পাচ্ছ যখন আমার সামনে দেখার দরকার নেই কিন্তু স্বাতীর কাছ থেকে একবার দেখে নিও।
ওকে কি কিছু বলতে হবে?
ওকে শুধু বলব, ছবিটা যেন নষ্ট না করে। একদিন সে বুড়ো হয়ে যাবে। দাঁত পড়বে, চুলে পাক ধরবে, তখন যদি ছবিটা দেখে তীব্র আনন্দ পাবে। লোকে বলে যৌবন ধরে রাখা যায় না–এটা ঠিক না। আমি তার যৌবন ধরে রেখেছি। আলোর একটা খেলা ছবিটাতে আছে। এত সুন্দর কাজ আমি খুব কম করেছি। চলো তোমাকে রিকশায় তুলে দিয়ে আসি। এ-রকম বিশাল ছবি সঙ্গে করে নিয়ে যেতে অস্বস্তি লাগবে না তো?
না।
তুমি বললে স্বাতীদের বাড়ির গেট পর্যন্ত আমি ছবিটা পৌঁছে দিতে পারি। আমি গেট থেকে বিদায় নেব। গেট থেকে বাড়ি পর্যন্ত তুমি নিয়ে গেলে।
না না, আপনি থাকুন। জাহিনের সঙ্গে গল্প করুন। আপনার মেয়েটা অসম্ভব ভালো।
আগে একবার বলেছ।
আবারও বললাম। একটা মিথ্যা একবারের বেশি দুবার বলা যায় না। সত্য কথা অসংখ্যবার বলা যায়।
.
স্বাতী লিলিকে দেখে আকাশ থেকে পড়ল। ভর সন্ধ্যায় রিকশায় পাঁচ ফুট বাই চার ফুট ছবি নিয়ে লিলি একা একা উপস্থিত হবে এটা ভাবাই যায় না। লিলির মুখ শুকিয়ে এতটুকু হয়ে গেছে। হাত দিয়ে ছবি সামলাতে তার মনে হয় কষ্টও হয়েছে।
