লিলি বলল, নে তোর ছবি।
স্বাতী বলল, থ্যাংকস, থ্যাংকস, মেনি থ্যাংকস। থ্যাংকস ছাড়া আর কি চাস বল?
আর কিছু চাই না।
চাইতে হবে। কিছু-একটা চাইতে হবে। তোর মুখটুখ শুকিয়ে কি হয়ে গেছে খুব ঝামেলা গেছে, তাই না।
ঝামেলা হয় নি।
চাইতেই দিয়ে দিল?
হুঁ।
আয়, ঘরে এসে বোস। তোকে দেখে মনে হচ্ছে খুব টেনশনে আছিস।
সন্ধ্যা হয়ে গেছে আমি বাসায় চলে যাব।
পাগল হয়েছিস? তোকে আমি এখন ছাড়ব নাকি? গল্প শুনব না? তোর কোনো ভয় নেই, আমি তোকে গাড়ি করে বাসায় পৌঁছে দেব। আয়।
লিলির নিজেকে যন্ত্রের মতো লাগছে। বাড়ির কথা তার এতক্ষণ মনে হয় নি। এখন মনে হচ্ছে। বাড়িতে কোন নাটক হচ্ছে কে জানে। সে বাড়িতে পা দেয়ামাত্র নাটক কোন দিকে মোড় নেবে তাও জানে না।
স্বাতী বলল, এ রকম মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছিস কেন আয়।
লিলি ছোট্ট নিশ্বাস ফেলে রওনা হলো। স্বাতীর হাতে ফ্রেম করা ছবি। বিশাল দেখালেও তেমন ওজন নেই। নাজমুল সাহেব বসার ঘরের সোফায় বার্নিশ দিচ্ছিলেন। তার নাকে রুমাল বাঁধা। তিনি বললেন, লিলি সন্ধ্যাবেলা কোত্থেকে?
স্বাতী বলল, ও আমার জন্য একটা গিফট নিয়ে এসেছে বাবা। একটা পেইন্টিং। আমার জন্মদিনের উপহার। জন্মদিনে আসতে পারে নি। আজ উপহার নিয়ে এসেছে।
এত বড় পেইন্টিং?
হুঁ, বিশাল। এখন তোমরা দেখতে পাবে না। কোনো এক শুভক্ষণে শুভ উদ্বোধন হবে।
লিলি মা কি আজ থাকবে আমাদের বাসায়?
লিলি বলল, জি না চাচা।
থেকে যাও মা। থেকে যাও। হইচই করো। গল্পগুজব করো। বসয়সটাই তো হইচইয়ের। গল্পগুজবের। কিছুদিন পর হইচই করতেও ভাল লাগবে না। গল্পগুজব করতেও ভালো লাগবে না। সময় কাটবে রান্নাঘরে। রবীন্দ্রনাথের বিখ্যাত কবিতা আছে না–
রাধার পর খাওয়া
খাওয়ার পর রাধা
এই টুকুতেই জীবনখানি বাঁধা।
স্বাতী বলল, তোমাকে কবিতা আবৃত্তি করতে হবে না বাবা। তুমি বার্নিশ চালিয়ে যাও। আমরা অনেকক্ষণ গল্প করব। তারপর তুমি তোমার গাড়িটা ধার দেবে আমি লিলিকে পৌঁছে দেব।
স্বাতী ঘরে ঢুকেই দরজা বন্ধ করে দিল। ব্যস্ত ভঙ্গিতে ছবির ওপর ভাজ করে রাখা কাগজ সরাতে লাগল। খুশি খুশি গলায় বলল, তুই একটু দূরে গিয়ে দাঁড়া লিলি। দূর থেকে দেখ কত সুন্দর ছবি। একটু দূরে না দাঁড়ালে বুঝতে পারবি না। ঘরে আলো কম। আরেকটু আলো থাকলে ভালো হতো। তুই দরজার কাছে যা লিলি। দরজার কাছ থেকে দেখ।
লিলি দেখছে।
সে নড়তে পারছে না। মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে। নগ্ন মেয়েটিকে দেখতে মোটেই অস্বাভাবিক লাগছে না। মনে হচ্ছে এটাই স্বাভাবিক। খোলা জানালার আলো এসে মেয়েটির পিঠে পড়ছে। বই পড়তে পড়তে একটু আগে মনে হয় মেয়েটি একটি দীর্ঘনিশ্বাস ফেলেছে। মধ্যাহ্নের সেই দীর্ঘনিশ্বাস আটকে আছে ছবির ভেতর।
স্বাতী মুগ্ধ গলায় বলল, ছবি দেখে বুঝতে পারছিস আমি কত সুন্দর?
লিলি জবাব দিল না। সে এখনও চোখ ফেরাতে পারছে না।
কি রে, ছবিটা কেমন তাতো বলছিস না।
সুন্দর!
শুধু সুন্দর? আর কোনো বিশেষণ ব্যবহার করবি না?”
লিলি মুগ্ধ গলায় বলল, ছবিটা উনার কাছ থেকে আনা ঠিক হয় নি। উনি ছবিটা খুব মমতা দিয়ে একেঁছেন।
স্বাতী বলল, তুই কি চাস তোর এ-রকম একটা ছবি আঁকা হোক?
চুপ কর।
আচ্ছা যা চুপ করলাম। যদিও তোর চোখে তার ছায়া দেখতে পাচ্ছি। তোর মন বলছে, আহারে আমার যদি এ-রকম একটা ছবি থাকত। বুঝলি লিলি, মানুষের পুরো জীবনটাই হলো এক গাদা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অপূর্ণ তৃষ্ণার সমষ্টি। A collection of unfulfilled desires. অধিকাংশ তৃষ্ণা মেটানো কিন্তু কঠিন না। মেটানো যায়। সাহসের অভাবে আমরা মিটাতে পারি না।
বেশি বেশি সাহস কি ভালো?
সাহস হলো মানুষের প্রধান কিছু গুণের একটি।
স্বাতী আমি বাসায় যাব। আমাকে বাসায় পৌঁছে দিয়ে আয়। সন্ধ্যা হয়ে গেছে। আমি একা একা বাসায় যেতে পারব না।
দেব, বাসায় পৌঁছে দেব। এত ব্যস্ত হচ্ছিস কেন? তুই আরাম করে একটু বোস। গুছিয়ে বলত শুনি ছবির ব্যাপারটা ওকে কিভাবে বলেছিস।
সাধারণভাবে বলেছি। তোরা দুজনে মিলে কি অনেকক্ষণ গল্প করেছিস?
হ্যাঁ।
মানুষটাকে ইন্টারেস্টিং মনে হয়েছে না?”
হ্যাঁ।
ইন্টারেস্টিং কেন মনে হয়েছে বলত?
জানি না। আমি তোর মতো এত বিচার বিশ্লেষণ করি না।
স্বাতী গম্ভীর গলায় বলল, লোকটাকে ইন্টারেস্টিং মনে হয়েছে কারণ তার মধ্যে একটা গৃহী ভাব আছে। অধিকাংশ পুরুষমানুষের মুখের দিকে তাকালে মনে হয় এদের মন পড়ে আছে বাইরে। হাসনাতের বেলায় উল্টোটা মনে হয়। ওকে বিয়ে করলে জীবনটা ইন্টারেস্টিং হতো।
তা হলে বিয়ে করলি না কেন?
স্বাতী জবাব দিল না। হাসতে লাগল। হাসি থামিয়ে হঠাৎ গম্ভীর হয়ে বলল, বুধবার বিয়ে হবার কথা মঙ্গলবার রাতে হঠাৎ মনে হলো আসলে আমাকে ও ভালোবাসে না। ও আমার মধ্যে অন্য কাউকে খুঁজছে প্রবলভাবেই খুঁজছে। ওকে বিয়ে করলে সুখী একটা পরিবার তৈরি হতো। এর বেশি কিছু না।
লিলি বলল, সুখী পরিবার তুই চাস না? স্বাতী লিলির দিকে ঝুঁকে এসে বলল, আমাদের পরিবারটা দেখে তোর মনে হয় না, কি সুখী একটা পরিবার? মনে হয় কি-না বল?
হয়।
বাবাকে দেখে মনে হয়, বাবা মার জন্য কত ব্যস্ত। মাকে দেখে মনে হয় স্বামী অন্তঃপ্রাণ। স্বামী কী খেয়ে খুশি হবে এই ভেবে এটা রাধছে, ওটা রাঁধছে। তার ডায়াবেটিস বেড়ে যাবে এইজন্য চা খেতে দিচ্ছে না। আসলে পুরোটাই ভান।
