না, ভাঙবে না।
টিনের চালে শব্দ হচ্ছে। শব্দটা বৃষ্টির নয়। অন্যরকম। লিলি বলল, জাহিন শিলাবৃষ্টি হচ্ছে। শিল কুড়াবে?
তাহলে মাথায় একটা তোয়ালে জড়িয়ে আসো, আমরা শিল কুড়াব।
হুঁ।
বিপুল উৎসাহে লিলি শিল কুড়াচ্ছে। বাগানে ছোটাছুটি করছে। তার সঙ্গে আছে জাহিন। কাদায়-পানিতে দুজনই মাখামাখি। দুজনেরই উৎসাহের সীমা নেই। লিলির নিজের বাড়ির কথা মনে নেই, সে যে সম্পূর্ণ অচেনা একটা বাড়িতে কিশোরীদের মতো ছোটাছুটি করছে তাও মনে নেই। তার মনে হচ্ছে এত আনন্দ সে তার সারা জীবনে পায় নি। আম, গাছের ডালে মটমট শব্দ হচ্ছে-ডাল ভাঙছে বোধহয়। লিলি চেঁচিয়ে বলল, জাহিন ঘরে আয়, আয়। মেয়েটিকে সে তুই তুই করে বলছে। তা-ই তার কাছে স্বাভাবিক মনে হচ্ছে। দুজন ছুটে যাবার সময় একটা গর্তের ভেতর পড়ে গেল। যেখান অনেকখানি পানি। জাহিন এবং লিলি দুজই হি হি করে হাসছে। জাহিন কিছু ময়লা পানি খেয়েও ফেলেছে।
ভেজা শাড়ি লিলিকে শেষ পর্যন্ত পাল্টাতে হলো। কাদায় মাখামাখি হওয়া নোংরা শাড়ি গায়ে জড়িয়ে থাকা যায় না। জাহিন শাড়ি এনে দিল। পুরনো শাড়ি। জাহিনের মার শাড়ি। এমন একজনের যে বেঁচে নেই কিন্তু শাড়ির ভাঁজে ভাঁজে তার শরীরের গন্ধের কিছুটা হয়তো থেকে গেছে। লিলির অস্বস্তির সীমা রইল না।
.
ঝড়-বৃষ্টি থেমে গেছে। ইচ্ছে করলে লিলি চলে যেতে পারে। সেই ইচ্ছা করার উপায় নেই, মেয়েটি একা। বাবা যে এখনও ফিরছে না তা নিয়ে তার মাথা ব্যথাও নেই। মনে হচ্ছে সে নতুন পরিস্থিতিতে ভালোই আছে। বাবা একবারে না এলেই যেন ভালো। তাহলে নতুন আন্টিকে নিয়ে আরও অনেক মজা করা যায়।
লিলি বলল, ঠাণ্ডায় শরীর কাঁপছে। জাহিন, চা খেতে হবে।
জাহিন বলল, আন্টি আমি চা বানাতে পারি না।
তোকে চা বানাতে হবে না। আমি বানাব কোথায় চা কোথায় চিনি–এইসব দেখিয়ে দিলেই হবে।
এইসবও তো আমি জানি না।
আচ্ছা ঠিক আছে, আমরা খুঁজে বের করব।
আমিও চা খাব আন্টি।
ঠিক আছে। আমাকে রান্নাঘর দেখিয়ে দে।
রান্নাঘর দেখিয়ে দেবার আগেই হাসনাত এসে পড়ল। লিলিকে দেখে সে যতটা চমকালো তার চেয়ে বেশি বোধ করল স্বস্তি।
তুমি কখন এসেছ?
অনেকক্ষণ, ঝড়ের আগে।
বাঁচা গেছে। আমি কি যে দুশ্চিন্তা করছিলাম। জাহিনকে একা বাসায় ফেলে গেছি, শুরু হলো ঝড় বৃষ্টি।
একা ফেলে গেলেন কীভাবে?
আধ ঘণ্টার জন্য গিয়েছিলাম। সেটাও ঠিক হয় নি। উপায় ছিল না। আধ ঘণ্টার জন্য গিয়ে এই যে আটকা পড়লাম, আর বের হতে পারি না। ঝড়ে আটকা পড়ি নি, ঝড় কোনো ব্যাপারই না। অন্য ঝামেলায় আটকা পড়েছি।
লিলি খানিকটা বিস্ময়ের সঙ্গে বলল, আপনি আমাকে দেখে অবাক হন নি?
হয়েছি। তবে তেমন অবাক হই নি। তুমি আসবে সেটা ধরেই নিয়েছিলাম। স্বাতী দূত পাঠাবে। তুমি ছাড়া তার আর দূত কোথায়?
জাহিন বলল, বাবা আন্টি চা খাবে। আমিও খাব।
হাসনাত ব্যস্ত হয়ে বলল, চা বানিয়ে নিয়ে আসছি। তোমরা বসো। লিলি বলল, আমাকে জিনিসপত্র দেখিয়ে দিন আমি বানিয়ে আনছি।
না না, তুমি অতিথি। তুমি বসো। তুমি হলে ফরেন এ্যামবাসেডার। আমি ফরেন এ্যামবাসেডারকে দিয়ে চা বানাব, তা হয় না।
লিলি স্বস্তিবোধ করছে। হাসনাত সাহেব সহজ-স্বাভাবিক আচরণ করছেন। একজন সহজ হলে অন্যজনের সহজ হওয়া সমস্যা হয় না। লিলি বলল, আপনি চা বানানোর সময় আমরা দুজন যদি পাশে দাঁড়িয়ে দেখি তাহলে কি কোনো অসুবিধা আছে?
না অসুবিধা নেই। ভালো কথা, লিলি তুমি মনে হয় দুপুরে খাও নি।
দুপুরে খাই নি যে বুঝলেন কী করে?
আর্টিস্টের প্রধান কাজ হচ্ছে দেখা। একজন আর্টিস্ট যদি ক্ষুধার্ত মানুষের মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে না পারে সে ক্ষুধার্ত, তাহলে সে কোনো বেড আর্টিস্টই না।
আপনার ধারণা আপনি বড় আটিস্ট?
হাসনাত হাসতে হাসতে বলল, আমার সে-রকমই ধারণা। তবে অন্যদের ধারণা অবশ্যি তা না। লিলি শোনো, ঘরে খাবার কিছু নেই। পাউরুটি আছে টোস্ট করে দিতে পারি। ডিম আছে পেঁয়াজ-মরিচ দিয়ে ভেজে দিতে পারি। দেব?
দিন।
তুমি স্বাতীর হয়ে যেসব কথা বলতে এসেছ, তা কি জাহিনের সামনে বলতে পারবে নাকি তাকে দূরে সরিয়ে দেব?
ও বেচারি একা একা কোথায় বসে থাকবে?
ওকে গল্পের বই পড়তে পাঠিয়ে দেব। গল্পের বই ধরিয়ে দিলে ওর আর কিছুই লাগে না। আধ ঘণ্টার জন্য যে গিয়েছিলাম, জাহিনের হাতে গল্পের বই ধরিয়ে দিয়ে গিয়েছিলাম।
আপনার মেয়েটি খুব ভালো।
মেয়ে সম্পর্কে আমার নিজেরও তাই ধারণা। ও তার মার মতো হয়েছে। স্বভাব-চরিত্র অবিকল তার মার মতো। অন্যকে নিজের করতে তার পাঁচ মিনিট লাগে। তবে তার মা সুন্দর ছিল না। তার চেহারাটা সাদামাটা ছিল। নাক-মুখ ছিল ভোতা ভোতা। জাহিনের ফিচারস খুব শার্প। ওর চোখ যদি একটু বড় হতো তাহলে সতেরো/আঠারো বছর বয়সে সে সেরা রূপসীদের একজন হতো—তোমাকে ছাড়িয়ে যেত–
আপনারা আর্টিস্টরা মানুষের চেহারা খুব খুঁটিয়ে দেখেন, তাই না?
সবাই দেখে না। আমি দেখি। আমি পোর্ট্রেটের কাজ বেশি করি, আমাকে দেখতে হয়।
লিলি বেশ আগ্রহ নিয়েই হাসনাতের কাণ্ডকারখানা দেখছে। ভদ্রলোক বেশ নিপুণ ভঙ্গিতে ডিম ফেটলেন। চাকু দিয়ে পেঁয়াজ, কাঁচামরিচ কুচিকুচি করে কাটলেন। লবণ মিশিয়ে ফুটন্ত তেলে ডিম ভাজলেন। ডিম কড়াইয়ে লেগে গেল না, গোলাপি হয়ে ফুলে উঠল।
