লিলি বলল, যা ইচ্ছা করুক।
প্লিজ, আয় একটু। তোর দেখা থাকলে আমার সুবিধা। আমার কথা কেউ বিশ্বাস করে না। শনিবার ক্লাসে এসে তুই যখন বলবি তখন সবাই বিশ্বাস করবে।
নীপা শোন, আমার কিছু দেখারও ইচ্ছা নেই, বলারও ইচ্ছা নেই। যার যা ইচ্ছা করুক।
লিলি রিকশা নিল।
রিকশায় উঠে রিকশাওয়ালাকে বলা যায় না আমি বিশেষ কোথাও যাব না। রাস্তায় রাস্তায় ঘুরব। অথচ লিলির কোনো গন্তব্য নেইঐআকাশের অবস্থা ভালো না। মেঘ জমতে শুরু করেছে। মেঘের ধরনধারণজলো না। বৃষ্টি শুধু না, ঝড় হবারও কথা। হোক, প্রচণ্ড ঝড়, সব লণ্ডভণ্ড করে দিক
আপা, যাইবেন কই?
কলাবাগান।
বাসস্ট্যান্ড?
বাসস্ট্যান্ড ছাড়িয়ে একটু ভেতরে।
দশ টাকা দেবেন।
চলো, দশ টাকাই দেব।
লিলি কলাবাগান যাচ্ছে কেন? কলাবাগান যাবার তার কোনো ইচ্ছা নেই। কলাবাগান বাসস্ট্যান্ড ছাড়িয়ে একটু ভেতরে গেলেই হাসনাত সাহেবের বাড়ি। ঐ বাড়িতে যাবার জন্য সে রিকশা নেয় নি। তার পরেও সে কলাবাগানের কথা কেন বলল? সবচেয়ে ভালো হতো আগামসি লেনে চলে গেলে। লিলির দুনম্বর দাদিজান আগামসি লেনে থাকেন। লিলিকে দেখলে অসম্ভব খুশি হবেন। রাত আটটা পর্যন্ত আগামসি লেনে থাকা যায়। একবারে রাতে খেয়ে-টেয়ে বাসায় ফেরা।
রিকশাওয়ালা প্রাণপণে রিকশা টানছে। তার মনের ইচ্ছা মনে হয় যাত্রীকে বৃষ্টি নামার আগে আগে গন্তব্যে পৌঁছে দেয়া। কারণ একটু পরপর সে আকাশে মেঘের অবস্থা দেখতে চেষ্টা করছে।
কোথাও যাবার কথা বলে রিকশায় ওঠার বেশ কিছুক্ষণ পর যদি গন্তব্যস্থল বদল করা হয় তখন রিকশাওয়ালারা খুবই বিরক্ত হয়। তারা ভদ্রতার ধার ধারে না। ভদ্রলোকের মতো তারা তাদের বিরক্তি লুকিয়ে রাখে না। প্রকাশ করে। লিলি ঠিক করল প্রথম সে কলাবাগানেই যাবে। সেখান থেকে আরেকটা রিকশা নিয়ে আগামসি লেন।
লিলির রিকশাওয়ালাকে বৃষ্টি ধরে ফেলেছে। বৃষ্টি নেমেছে হুড়মুড় করে। রিকশাওয়ালা বিরক্ত মুখে পিছন ফিরে বলল, পর্দা লাগব আফা?”
না।
ভিজতাছেন তো।
একটু ভিজলে অসুবিধা হবে না।
লিলি একটু না, অনেকখানি ভিজল। ভেজা শাড়ি শরীরের সঙ্গে লেপ্টে কি অবস্থা হয়েছে। সিনেমার নায়িকারাও এ-রকম করে বৃষ্টিতে ভিজে নাচগান করে না। শাড়িটা সুতির হলেও গায়ের সঙ্গে এতটা লেপ্টা তো না। লিলির পরনে জর্জেটের শাড়ি। জর্জেট বৃষ্টি পছন্দ করে।
গলির ভেতর রিকশাওয়ালা রিকশা টেনে নিয়ে যাচ্ছে। বৃষ্টি শুরু হয়েছে দশ মিনিট হয় নি, এর মধ্যেই গলিতে গলিতে হাঁটুর কাছাকাছি পানি। কোত্থেকে এল এত পানি?
রিকশাওয়ালা বলল, আফা কোন বাড়ি?
লিলি ভয়ে ভয়ে বলল, ভাই শুনুন, আপনি কি আগামসি লেনে যাবেন?
কই?
আগামসি লেন?”
এইটা মিরপুরের রিকশা। পুরান ঢাকায় যাব।
লিলিকে নেমে যেতে হবে। অন্য একটা রিকশা নিতে হবে, কিংবা কোনো দোকানের সামনে বারান্দায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হবে। সবাই মহা আনন্দ নিয়ে ভেজা জর্জেটের শাড়ির ভেতর দিয়ে লিলিকে দেখবে।
লিলি বলল, বায়ের ঐ বাড়িটা। লোহার গেটওয়ালা বাড়ি।
গেটের ভেতর রিকশা ঢুকল না। রিকশাওয়ালাকে দশ টাকার জায়গায় পনেরো টাকা দিয়ে লিলি লোহার গেট খুলে ঢুকে পড়ল। দরজায় হাত রাখতেই ফুটফুটে আট/নবছরের একটা মেয়ে দরজা খুলে বের হয়ে বলল, আপনি কাকে চান?
এটা কি হাসনাত সাহেবের বাসা?
হ্যাঁ। আমি উনার মেয়ে।
বাবা বাসায় নেই?
না, এসে পড়বে। আপনি ভিজে একেবারে কি হয়েছেন। ইশ। আসুন ভেতরে আসুন।
বাড়িতে কি তুমি একা?
হুঁ।
বলো কি, এতবড় একটা বাড়িতে তুমি একা? ভয় লাগছে না?
লাগছে। আপনি ভেতরে আসুন।
পা যে কাদায় মাখামাখি, এই পা নিয়ে ঢুকব?”
ঢুকে পড়ুন। বাথরুমে পা ধুয়ে ফেলবেন। আপনার তো শাড়ি বদলাতে হবে। ঘরে শুকনা শাড়ি আছে।
তোমার নাম কী?
জাহিন।
বাহ্, খুব সুন্দর নাম তো।
জাহিন নামের অর্থ হলো বিচক্ষণ।
কোন ক্লাসে পড়ো?
ক্লাস ফোর।
এই যে তুমি অজানা অচেনা একটা মানুষকে ঘরে ঢুকালে আমি একটা খারাপ লোকও তো হতে পারতাম।
জহিন হাসিমুখে বলল, আপনাকে আমি চিনি। বাবার যার সঙ্গে বিয়ের কথা হয়েছিল স্বাতী আন্টি আপনি উনার বন্ধু। আপনার নাম লিলি। স্বাতী আন্টি আপনার ছবি আমাকে দেখিয়েছে। দেখেই তুমি চিনে ফেললে?”
হুঁ। আমার স্মৃতিশক্তি খুব ভালো। আমি সব সময় পরীক্ষায় ফার্স্ট হই, আপনি জানেন?
না, জানি না তো।
স্বাতী আন্টি আমার কোনো কথা আপনাকে বলে নি
না।
আশ্চর্য তো! পরীর মতো বাচ্চা মেয়েটি খুবই অবাক হলো।
বাথরুমের দরজা খোলা, লিলি হাত-মুখ ধুচ্ছে। খোলা দরজার ধারে জাহিন দাঁড়িয়ে আছে।
শুকনা শাড়ি আপনার জন্য নিয়ে আসি?
না, লাগবে না। যতটুকু ভিজেছে শুকিয়ে যাবে। ভেজা কাপড় মানুষের গায়ে খুব তাড়াতাড়ি শুকায়।
কেন?
মানুষের গা তো গরম। এইজন্য।
আপনাকে কি আমি আন্টি ডাকব?
হ্যাঁ, ডাকো।
শুনতে পারছেন ঝড় হচ্ছে।
তাই তো দেখছি।
আপনি না এলে আমি ভয়েই মরে যেতাম।
তোমার মতো একটা বাচ্চা মেয়েকে একা রেখে তোমার বাবা যে চলে গেলেন, খুবই অন্যায় করেছেন। তোমার বাবা আসুন আমি তার সঙ্গে কঠিন ঝগড়া করব।
লিলি বাথরুম থেকে বের হয়েছে। আসলেই ঝড় হচ্ছে। প্রচণ্ড ঝড়। কালবোশেখি। বছরের প্রথম কালবোশেখি।
জাহিন বলল, আমাদের বাড়িটা ভেঙে পড়ে যাবে না তো আন্টি?
