জানি না।
জানিস ঠিকই। বলবি না।
লিলি কমনরুমে ঢুকতে গিয়েও ঢুকল না। স্বাতী এসেছে কি-না জানার জন্য কমনরুমে যেতে চাচ্ছিল। নীপার সঙ্গে দেখা হওয়ায় বোঝা গেল স্বাতী কমনরুমে নেই। স্বাতী কমনরুমে থাকবে আর নীপা কমনরুমের দরজায় দাঁড়িয়ে এসব কথা বলবে তা হয় না। নীপা বলল, চলে যাচ্ছিস না-কি?
হুঁ।
আমাকে এক কাপ চা খাওয়া না লিলি। টাকা ছাড়া চলে এসেছি। চা খেতে পারছি না। খাওয়াবি এক কাপ চা?
লিলি নিতান্ত অনিচ্ছায় নীপাকে চা খাওয়াতে নিয়ে গেল। যতক্ষণ চা খাবে ততক্ষণ নীপা আজেবাজে কথা বলবে। এক মুহূর্তের জন্যও থামবে না।
নীপা গলা নিচু করে বলল, তোর বান্ধবী না-কি পেট বাধিয়ে ফেলেছে? বিয়ে না করে গতিও ছিল না। তুই জানিস কিছু?
না।
জানিস ঠিকই। বলবি না। তবে এইসব খবর চাপা থাকে না। একসময় সবাই জানবে।
জানুক।
স্বাতীদের টিউটোরিয়াল গ্রুপের সবাই অবশ্যি জেনে গেছে। কী হয়েছে শুনবি?
না।
আহ্ শোন না। শুনতে অসুবিধা কি? টিউটোরিয়াল ক্লাসের মাঝখানে স্বাতী হঠাৎ উঠে দাঁড়াল। স্যারকে বলল, স্যার আমার শরীর খারাপ লাগছে। বলেই প্রায় ছুটতে ছুটতে বের হয়ে গেল। সোজা বাথরুমের দিকে। বাথরুমের বেসিনে হড়হড় করে বমি।
নীপার হাত থেকে উদ্ধার পেয়ে লিলি খানিকক্ষণ একা একা ঘুরে বেড়ালো। বাসায় যেতে ইচ্ছা করছে না। একা একা ঘুরতেও ভালো লাগেছ না। ইউনিভার্সিটি ফাঁকা হয়ে আসছে। তবে মাঠে প্রচুর ছেলেমেয়ে আছে। এরা সন্ধ্যা পর্যন্ত আড্ডা দেবে। আডডা নানান ভঙ্গিমায় চলছে। কোথাও দল বেঁধে, কোথাও জোড়ায় জোড়ায়। স্বাতী থাকলে এদের দেখিয়ে মজার মজার কথা বলত–
যখন দেখবি একটা মেয়ে দুজন ছেলের সঙ্গে গল্প করছে, তখন বুঝবি প্রেমের ডেভেলপিং স্টেজ চলছে। একটা ছেলে হচ্ছে ক্যাটালিস্ট। এই স্টেজে তৃতীয় ব্যক্তি লাগে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তৃতীয় ব্যক্তির মাধ্যমে কথাবার্তা চলে।
যখন দেখবি দুজন গল্প করছে, দুজন হাসিখুশি, তখন বুঝবি প্রাথমিক স্তর তারা। অতিক্রম করে এসেছে। প্রেম শুরু হয়ে গেছে।
যখন দেখবি দুজন আছে কিন্তু কেউ কোনো কথা বলছে না, মুখ গম্ভীর করে বসে আছে, তখন বুঝবি প্রেম পেকে গেছে। পেকে টসটস করছে। খসে মাটিতে পড়ল বলে।
লিলির খুব একা একা লাগেছ। স্বাতীদের বাসায় একটা টেলিফোন করে দেখবে। ইউনিভার্সিটি থেকে টেলিফোন করার নিয়ম-কানুনও স্বাতী তাকে শিখিয়ে দিয়েছে।
করবি কি শোন, যে-কোনো একটা অফিসে ঢুকে যাবি। অফিসের কেরানিকে বলবি স্যার একটা টেলিফোন করব। ওদের তো কেউ স্যার বলে না–স্যার শুনে খুশি হয়ে যাবে। নিজেই টেলিফোনের তালা খুলে দেবে। আর তা যদি না হয় তাহলে কোনো ইয়াং টিচারের কাছে যাবি। তাঁর দিকে তাকিয়ে মোটামুটি রহস্যময় ভঙ্গি করে হাসতে থাকবি। হাসবি, চোখ নামিয়ে নিবি। আবার চোখ তুলে হাসবি। আবার চোখ নামিয়ে নিবি। স্যার তখন বলবে, কী খবর তোমার? তুই বলবি, স্যার, বাসায় একটা টেলিফোন করব। আর দেখতে হবে না। স্যার টেলিফোনের ব্যবস্থা করে দেবে।
লিলি স্বাতীকে টেলিফোন করাই ঠিক করল। স্বাতীরশেখানো পদ্ধতিতে কেরানিকে স্যার বলে চট করে টেলিফোন পেয়ে গেল।
স্বাতী খুশি খুশি গলায় বলল, লিলি তুই? ঘুম ভেঙেছে?”
হ্যাঁ।
তুই যে এমন কুম্ভকর্ণের মতো ঘুমুতে পারিস তা তো জানতাম না। সকালে চলে আসার সময় তোর ঘুম ভাঙানোর এত চেষ্টা করলাম। তুই এখন করছিস কী?
টেলিফোন করছি।
সেটা বুঝতে পারছি। তুই কি আজ সারাদিন বাসায় থাকবি?
না। এখন আমি ইউনিভার্সিটিতে।
সে কি! তুই ক্লাস করছিস। তুই ক্লাসে যাবি জানতে পারলে আমিও চলে আসতাম। আমার অবশ্যি শরীর খারাপ করেছে।
বমি করছিস?
বমি করব কেন শুধু শুধু? প্রচণ্ড মাথা ধরেছে।
তোর নামে আজেবাজে সব কথা শোনা যাচ্ছে।
কে বলছে, নীপা? ওয়ান ডে আই উইল স্টিচ হার লিপস। বস্তা সেলাই করার উঁচ দিয়ে ওর ঠোঁট সেলাই করে দেব। নো কিডিং।
টেলিফোন রেখে দিচ্ছি স্বাতী।
পাগল, টেলিফোন রাখবি কেন? আমি তো কথাই শুরু করি নি।
লিলি টেলিফোন নামিয়ে রাখল। তার আর কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। ভালো লাগছে না। কিছু ভালো রাগছে না। রিকশা নিয়ে সারাদিন শহরে ঘুরলে কেমন হয়? রাত আটটার আগে আজ সে বাসায় ফিরবে না। বাসার সবাই দুশ্চিন্তায় আধমরা হয়ে যাক। সবচেয়ে ভালো হয় বাসায় ফিরে না গেলে। কয়েক দিন যদি কোথাও পালিয়ে থাকা যেত।
ইউনিভার্সিটি এখন প্রায় ফাঁকা। দারোয়ান ক্লাসরুমে তালাচাবি দিচ্ছে। করিডোর ফাঁকা। লিলি সিঁড়ি দিয়ে নামছে–আবারও নীপার সঙ্গে দেখা। এখন নীপার চোখে সানগ্লাস। চুলগুলোকে এর মধ্যেই কিছু করেছে কিনা কে জানে। তাকে অন্য রকম লাগছে। নীপা চাপা গলায় বলল, বোরকাওয়ালি এখন কোথায় জানিস?
লিলি কিছু বলল না। বোরকাওয়ালি হলো তাদের ক্লাসের নূরজাহান বেগম। ক্লাসের একমাত্র মেয়ে যে বোরকা দিয়ে শরীর ঢেকে আসে। বোরকার ফাঁক দিয়ে সুন্দর দুটি চোখ ছাড়া এই মেয়ের আর কিছুই দেখা যায় না। মেয়েদের কমনরুমেও বোরকাওয়ালি গা থেকে বোরকা খোলে না।
নীপা লিলির কানের কাছে মুখ এনে বলল, ববারকাওয়ালি এখন বোরকার নিচে খ্যামটা নাচ দিচ্ছে। বিশ্বাস না হয় ৬১১ নম্বর রুমে যা। ওরা ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে দিয়েছে। ওর গায়ে এখন বোরকা কেন, কিছুই নেই। কে জানে কি করছে।
