স্বাতীকে বাবা কিছু বলেনি তো?
উহুঁ। আল্লাহর কাছে হাজার শুকুর বাইরের মেয়ের সামনে ইজ্জত রক্ষা হয়ে তুই সিগারেট খাচ্ছিলি কেন?
মজা করার জন্য খেয়েছি মা।
বাথরুমে দরজা বন্ধ করে খেলেই হতো। এখন কী যন্ত্রণার মধ্যে ফেলেছিস। দেখ তো!”
আমার ইউনিভার্সিটি তো যাওয়া তাহলে বন্ধ?
হুঁ।
আমি কী করব? দিনরাত ঘরে বসে থাকব?
ফরিদা হাই তুলতে তুলতে বললেন, তোর বাবা বলছিল তাড়াতাড়ি বিয়ের ব্যবস্থা করবে।
মতির মা বুয়া চা দিয়ে গেছে। লিলির চা খেতে ইচ্ছা করছে না। ফরিদা বললেন, তুই ঝুমুকে আজ আবার একটু ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবি? ওর ঠোঁট ফুলে কি হয়েছে। মুখটা হাঁসের মতো হয়ে গেছে। বলেই ফরিদা হাসতে শুরু করলেন।
লিলি, একদৃষ্টিতে মাকে দেখছে। কী অদ্ভুত মহিলা! তার এক মেয়ের ইউনিভার্সিটিতে পড়া বন্ধ হয়ে গেছে, তাতে কোনো বিকার নেই। যেন এটাই স্বাভাবিক। ঝুমুর ঠোঁট ফুলে হাঁসের মতো হয়ে গেছে এটাই তাঁকে বেশি আকৃষ্ট করছে।
চা ঠাণ্ডা হচ্ছে তো, খেয়ে ফেল।
খেতে ইচ্ছা করছে না।
না খেলে তোর বড় চাচাকে দিয়ে আয়। চা চেয়েছিল দিতে ভুলে গেছি।
লিলি কাপ হাতে উঠে গেল। আজহার উদ্দিন খাঁ খবরের কাগজ পড়ছিলেন। লিলিকে ঢুকতে দেখে কাগজ ভাঁজ করে রাখলেন। চোখের চশমা খুলে ফেলে গম্ভীর গলায় বললেন, লিলি তুই নাকি কাল সারারাত ছাদে ধূমপান করেছিস?
লিলি চুপ করে রইল।
.
সকালে নিয়ামত আমাকে বলল। এই ঘটনা বিশ্বাস করা কঠিন। আমি তাকে নিয়ে ছাদে গেলাম। নয়টা সিগারেটের টুকরো পেয়েছি। তোর কিছু বলার আছে লিলি?
না।
বোস এখানে। অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ বলে যে কথা আছে সেটাই হয়েছে। অসৎ সঙ্গে তোর সর্বনাশ হয়েছে। তুই এটা বুঝতে পারছিস না। মেয়েটার নাম কী?
কোন মেয়েটার?
তোকে যে ট্রেনিং দিচ্ছে। সিগারেট মদ এসব ধরচ্ছে।
মদের কথা আসছে কেন চাচা?
একটা যখন এসেছে অন্যটাও আসবে। কানের সাথেই মাথা আসে। কান আর মাথা তো আলাদা না। মেয়েটার নাম কী?এ
স্বাতী।
ওর সঙ্গ বিষবৎ পরিত্যাগ করবি। অসৎ সঙ্গ পরিত্যাগ করা যদিও খুব কঠিন। মন্দ জিনিসের আকর্ষণী ক্ষমতা থাকে প্রবল।
চাচা আমার কি তাহলে ইউনিভার্সিটিতে যাওয়া বন্ধ?
হ্যাঁ বন্ধ। তবে সাময়িকভাবে বন্ধ। তোর বাবাকে বলেছি দ্রুত তোর বিয়ের ব্যবস্থা করতে। বিয়ে হয়ে যাক। তারপর তোর স্বামী যদি মনে করে তোর পড়াশোনা করা উচিত তাহলে আবার যাবি। তখন আর আমাদের কোনো দায়িত্ব থাকবে না।
লিলি তাকিয়ে আছে। আজহার উদ্দিন খা আবার চশমা খুলে চোখে পরলেন। খবরের কাগজের ভাঁজ খুলতে খুলতে বললেন, অনেকক্ষণ আগে চা চেয়েছিলাম। চা দিচ্ছে না। ব্যাপার কী খোঁজ নিয়ে আয় তো।
চা আপনাকে দিয়েছি। আপনার সামনেই আছে।
ও আচ্ছা, থ্যাংকস। জানালার পাল্লাটা একটু খুলে দিয়ে যা। ডান দিকেরটা।
লিলি চাচার ঘর থেকে বের হলো। সে এখন কি করবে ঠিক বুঝতে পারছে না। নিজের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে শুয়ে থাকতে ইচ্ছা করছে। তাতে লাভ কী হবে?
বারান্দায় ঝুমু বসে আছে। লিলি তাকে দেখে আঁতকে উঠল। তার ঠোঁট অনেকখানি ফুলেছে। ভয়ঙ্কর দেখাচ্ছে, ঠিকই খানিকটা হাঁসের মতো লাগছে।
ব্যথা করছে ঝুমু?”
হুঁ।
চল যাই, ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাই। জামা পাল্টানোর দরকার নেই। স্যান্ডেল পরে আয়। ব্যথা কি খুব বেশি করছে?
হুঁ।
চা-নাশতা কিছু খেয়েছিস?
না।
যে অবস্থা–এই অবস্থায় কিছু খাওয়ার তো প্রশ্নই আসে না। তোকে দেখে তো আমারই ভয় লাগছে।
ডাক্তার সাহেব ঠোঁট ড্রেসিং করে দিলেন। এন্টিবায়োটিক ইনজেকশনের কোর্স শুরু করতে বললেন। সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, ভয়ের কিছু নেই, মুখের চামড়া খুব সেনসেটিভ তো অল্পতেই ফুলে যায়।
রিকশায় ফেরার পথে ঝুমু বলল, আপা কাল রাতে তুমি সিগারেট খেয়েছিলে, তাই না?
হুঁ।
যা কাণ্ড সকালে হয়েছে। বাবা মার সঙ্গে রাগারাগি করল। ধাক্কা দিয়ে সিঁড়িতে ফেলে দিল, মা গড়াতে গড়াতে নিচে পড়েছে, শাড়িটাড়ি উল্টে বিশ্রী অবস্থা। পরনের শাড়ি একেবারে উঠে গিয়েছিল।
বলিস কি!
আমাদের স্যার, কাজের বুয়া–সবাই দেখেছে। কি, যা লজ্জা পেয়েছে।
লজ্জা পাবারই তো কথা।
ঝুমু খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, সিপারট খেয়েছ ভালো করেছ। বাবার সামনে খেলে আরও ভালো হতো।
.
বাসার সামনে দুবোন রিকশা থেকে নামল। লিলি বলল, ঝুমু তুই বাসায় চলে যা। আমি যাব না। আমি ইউনিভার্সিটিতে যাব।
বাবা তোমাকে ইউনিভার্সিটিতে যেতে নিষেধ করেছে।
করুক।
দুটোর আগে ফিরে আসব। বাবা দুটোর সময় ফিরবে।
দেখি, তোর ব্যথা কি একটু কমেছে?
হুঁ।
মাকে বলিস আমি ইউনিভার্সিটিতে যাচ্ছি।
বই-খাতা কিছু নেবে না?
না।
দুটোর আগে চলে এসো, নয়তো মা আবার মার খাবে।
চলে আসব।
লিলি ক্লাসে পৌঁছল আর তাদের টিউটোরিয়াল শেষ হলো। স্যার বললেন, Young Lady you are too early for the next class.
লিলি অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে হাসল। আজ আর কোনো ক্লাস নেই। সে কি করবে বুঝতে পারছে না। স্বাতী তার টিউটোরিয়াল গ্রুপের না। সে অন্য গ্রুপে। সে কি আজ ইউনিভার্সটিতে এসেছে? বহস্পতিবারে তার কি ক্লাস আছে? মনে পড়ছে না। লিলি কমন রুমের দিকে এগুলো। কমন রুমের দরজায় নীপা দাঁড়িয়ে আছে। নীপা বিচিত্র সব সাজসজ্জা করে। আজ রঙচঙ্গা আলখাল্লার মতো কি একটা পরে এসেছে। নীপা বলল, এই লিলি, বাজারে একটা গুজব শোনা যাচ্ছে তোর জিগরি দোস স্বাতী না-কি পঞ্চাশ বছরের এক ম্যারিডম্যানকে বিয়ে করে বসে আছে। তার আগের স্ত্রী না-কি বিষটিষ খেয়ে হাসপাতালে দাখিল হয়েছে। ভদ্রলোকের বড় মেয়ে। জাহাঙ্গীরনগর ইউনিভার্সিটিতে ফার্স্ট ইয়ারে পড়ে।
