ভদ্রলোক কী করেন?
বললাম না দিনে আনে দিনে খায়।
তার মানে কী?
স্বাতী হাসতে লাগল। হাসতে হাসতেই বলল, জ্বরটা আরও বেড়েছে না-কি দেখ তো। মনে হয় টেনশনের জ্বর। যত টেনশন হচ্ছে তত জ্বর বাড়ছে।
লিলি জ্বর দেখল না। তার হতভম্ব ভাব কাটছে না। কেমন ভয় ভয় লাগছে। মনে হচ্ছে স্বাতী ভয়ঙ্কর কোনো বিপদে পড়ছে, অথচ সে তা বুঝতে পারছে না। স্বাতী যদি জেনেশুনে কোনো বিপদে পড়ে, সেই বিপদ থেকে উদ্ধার করার ক্ষমতা লিলির নেই। স্বাতীকে ফেলে রেখে চলে যাবার ক্ষমতাও লিলির নেই।
কলাবাগানের এক গলির সামনে স্বাতী রিকশা থামাল। ভাড়া মিটাল। লিলির দিকে তাকিয়ে বলল, তুই ইচ্ছা করলে এই রিকশা নিয়েও চলে যেতে পারিস। চলে যাবি?
না।
জানতাম যাবি না। এ-রকম ভূতে-পাওয়া চেহারা করে আছিস কেন? সহজ হ দেখি। বিয়ে তো তোর হচ্ছে না। আমার হচ্ছে।
তারা গেট খুলে একতলা একটা বাড়ির সামনে দাঁড়াল। বাড়িটা শেওলা ধরা, উচু দেয়ালে ঘেরা। দেয়ালের ভেতরে গাছপালা জঙ্গল হয়ে আছে। ঘাস হয়েছে হাঁটু উচু। তবে বাড়ি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, ছিমছাম। সামনে প্রশস্ত বারান্দা। বারান্দা তারের জালি দিয়ে ঘেরা। লিলি বলল, বাড়িতে জনমানুষ নেই বলে মনে হচ্ছে। কত বড় তালা ঝুলছে দেখছিস!
স্বাতী বলল, এসে পড়বে। ও জানে আমি একটার সময় আসব। একটা এখনও বাজে নি। একটা বাজতে এখনও পনেরো মিনিট।
এতক্ষণ আমরা কী করব? বন্ধ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকব?
দাঁড়িয়ে থাকতে হবে না, আমার কাছে চাবি আছে।
স্বাতী হ্যান্ডব্যাগ থেকে চাবি বের করে দরজা খুলে বলল–আয়, ভেতরে আয়। লিলির বিস্ময়ের সীমা রইল না। চাবি সঙ্গে নিয়ে ঘুরছে। কত স্বাভাবিক ভঙ্গিতে তালা খুলেছে, যেন এটা তার নিজের ঘরবাড়ি। কতদিন থেকে সে স্বাতীকে চেনে। কিন্তু যাকে সে চেনে এই মেয়ে কি সেই মেয়ে!
লিলি, এটা হচ্ছে ওর বসার ঘর। এখানে বসবি, না ভেতরের বারান্দায় বসবি? ভেতরের বারান্দাটি খুব সুন্দর।
লিলি জবাব দিল না। তার ঘোর এখনও কাটছে না। স্বাতী বলল, আয় ভেতরে বারান্দায় গিয়ে বসি। না-কি চলে যাবি?
চলে যাব।
সত্যি চলে যাবি?
হুঁ।
আচ্ছা যা। তুই এত ভড়কে গেছিস কেন বুঝলাম না। যাই হোক, তোর নার্ভাস ভাব দেখে আমার নিজেরই খারাপ লাগছে। পনেরো মিনিট বসে যা না। ও আসুক, ওকে দেখে চলে যাবি।
আমি এখনই যাব।
যাকে বিয়ে করতে যাচ্ছি তাকে চোখের দেখাও দেখবি না?
আমার কাউকে দেখতে ইচ্ছা করছে না।
আচ্ছা, তাহলে যা। ধর এই নোটটা নে। তোর সঙ্গে এক শ টাকা বাজি ছিল।
কীসের বাজি?
এর মধ্যে ভুলে গেলি? বাজি ছিল না–-তুই তিনটার ক্লাস করলে তোকে এক শ টাকা দেব। তুই ক্লাস করতে যাচ্ছিস। ইউ আর দ্য উইনার।
আমি ক্লাস করব না। বাসায় চলে যাব।
তাহলে তুই আমাকে এক শ টাকা দিয়ে যাবি। বাজি মানে বাজি.. .
স্বাতীর কথা শেষ হবার আগেই দরজার কড়া নড়ল। সামান্য কড়া নাড়ার শব্দ, অথচ লিলির মনে হচ্ছে তার বুকে কেউ হাতুড়ি পেটাচ্ছ। স্বাতী বলল, যাক ও এসে পড়েছে। তুই চলে গেলে একলা বাড়িতে আমার ভয় ভয় লাগত। এই বাড়িতে ভূত আছে। মেয়ে-ভূত। সব সময় ঘোমটা দিয়ে থাকে। আমি নিজে একদিন দেখেছি। ইন্টারেস্টিং স্টোরি, মনে করিয়ে দিস–তোকে বলব।
টিফিন কেরিয়ার হাতে এক ভদ্রলোক ঢুকলেন। লিলি তাঁকে কোনোদিন দেখেনি অথচ লিলির দিকে তাকিয়ে তিনি পরিচিত ভঙ্গিতে হাসলেন। সামান্যতম অবাকও হলেন না। যেন দুপুর একটায় এ বাড়িতে লিলি থাকবে, এটাই স্বাভাবিক।
ভদ্রলোক সহজ গলায় বললেন, খাবার আনতে দেরি হয়ে গেল। প্রেসক্লাবের সামনে এমন এক যানজট।
স্বাতী বলল, খাবার কোত্থেকে এনেছ? হোটেলের খাবার?
না। সেগুনবাগিচায় আমার এক খালা থাকেন। উনাকে বেঁধে রাখতে বলেছিলাম।
আচ্ছা শোনো, তোমার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেই। ও হচ্ছে লিলি, তোমাকে অসংখ্যবার তার কথা বলেছি।
হ্যাঁ বলেছ।
স্বাতী আনন্দিত গলায় বলল, লিলি সম্পর্কে তোমাকে কি বলেছি লিলিকে একটু বলো। ও শুনলে খুশি হবে।
ভদ্রলোক আবারও লিলির দিকে তাকিয়ে হাসলেন। আর ঠিক তখনই লিলি এই ভদ্রলোকের আকর্ষণী ক্ষমতার কারণ বুঝতে পারল। ভদ্রলোক অসম্ভব সুন্দর করে হাসেন। তিনি শুধু চোখে-মুখে হাসেন না, সমস্ত শরীর দিয়ে হাসেন।
আহা বল না আমি লিলি সম্পর্কে কি বলেছি।
তুমি বলেছ, লিলি কখনও মিথ্যা কথা বলে না।
এটা তো বলেছিই, এটা ছাড়া আর কী বলেছি?
বলেছ–লিলি হচ্ছে উপন্যাসের চরিত্রের মতো নিখুঁত ভালো মেয়ে।
স্বাতী বিরক্তস্বরে বলল, আসল কথাটা তুমি বলছ না। আসল কথাটা বলো যেটা শুনলে লিলি খুশি হবে। তুমি আসল কথা এড়িয়ে শুধু নকল কথা বলছ।
ও বলেছে, পৃথিবীতে নিখুঁত সুন্দর বলে যদি কোনো মেয়ে থাকে সে লিলি।
স্বাতী বলল, আমি ঠিক বলেছি না নিজের বন্ধু বলে বাড়িয়ে বলেছি?
ভদ্রলোক এই কথার জবাব দিলেন না। ব্যাপারটা লিলির পছন্দ হলো। লিলি যে অস্বস্তিবোধ করছে তা তিনি বুঝতে পেরেছেন। এই অস্বস্তি তিনি আর বাড়াতে চাচ্ছেন না। সাধারণত মানুষ নিজের অস্বস্তির দিকেই লক্ষ রাখে, অন্যদের অস্বস্তির দিকে না।
লিলি বলল, আমি এখন উঠব।
ভদ্রলোক খুবই বিস্মিত হলেন। হাসির মতো তাঁর বিস্ময়ও সারা শরীরে ধরা পড়ল।
তুমি চলে যাবে কেন? তোমার না এখানে দুপুরে খাবার কথা। তিনজনের খাবার এনেছি।
