লিলি যা ভেবেছিল তাই। তাকে এখানে নিয়ে আসা স্বাতীর পূর্বপরিকল্পনার অংশ। হুট করে এই ব্যাপারটা সে করে নি। ক্লাসের নাটকটা সে ইচ্ছে করেই করেছে।
ভদ্রলোক বললেন, লিলি, আমি এক্ষুনি খাবার দিয়ে দিচ্ছি। দুমিনিটের বেশি লাগবে না। সবই গরম আছে। খেয়ে যাও।
স্বাতী বলল, তুমি খাবার বেড়ে ফেলো। ও যাবে না। দুপুর একটার সময় ও গিয়ে করবেই-বা কি। ক্লাস হচ্ছে তিনটায়। কি রি লিলি, থাকবি কিছুক্ষণ?
আচ্ছা, থাকব।
প্লিজ থাক। তিনজন মিলে জমিয়ে আড্ডা দেব। দুজনে গল্প জমে না। গল্পের ন্য সব সময় তৃতীয় ব্যক্তির দরকার। তৃতীয় ব্যক্তি হলো প্রভাবক–দ্য ক্যাটালিস্ট।
ভদ্রলোক টেবিলে থালা-বাসন রাখছেন। লিলির বোধহয় সাহায্য করা উচিত। এই কাজগুলো সাধারণত মেয়েরাই করে। কিন্তু লিলি কিছু করল না। আগের মতোই চেয়ারে বসে রইল। তার হতভম্ব ভাব পুরোপুরি কাটে নি। সে সারাক্ষণই অবাক হয়ে স্বাতীকে দেখছে।
স্বাতী বলল, গরমে আমার গা ঘামছে। ঘামা-গা নিয়ে আমি কিছু খেতে পারব। আমি চট করে গোসল করে আসি। বেশিক্ষণ লাগবে না। তুমি এর মধ্যে লিলিকে তোমাদের বাড়ির ঘোমটা-ভূতের গল্পটা বলো। সুন্দর করে বলবে। এক লাইনে বলবে না।
লিলির মনে হলো–স্বাতী কি বাড়াবাড়ি করছে না? লোক-দেখানো বাড়াবাড়ি। লিলির চোখে আঙুল দিয়ে দেখানো যে এই বাড়ি এখন তার বাড়ি। সে এই বাড়িতে যা ইচ্ছা করতে পারে। করুক যা ইচ্ছা কিন্তু তাকে সামনে বসিয়ে কেন?
স্বাতী ভেতরের দিকে চলে গেল। ভদ্রলোক বসলেন স্বাতীর চেয়ারে। গম্ভীর গলায় বললেন–লিলি, তুমি কি ঘোমটা-ভূতের গল্পটা শুনতে চাও?
লিলি ক্ষীণস্বরে বলল, বলুন।
তোমার শুনতে ইচ্ছা করছে না বুঝতে পারছি। দুজন চুপচাপ বসে থাকার চেয়ে যে-কোনো বিষয় নিয়ে আলোচনা করা ভালো–শোনো তাহলে, এই বাড়িটা আমার বাবার। তিনি ছিলেন একটা গার্লস স্কুলের হেডমাস্টার। খুব নীরস ধরনের মানুষ ছিলেন। আমার যখন তিন মাস বয়স তখন আমার মা মারা যান। তিনি আর বিয়ে করেন নি। মার মৃত্যুর পর ৩০ বছর বেঁচে ছিলেন। একাকী বেঁচে থাকা। এই ধরনের মানুষদের একসময় নানান টাইপের সমস্যা দেখা দেয়। বাবারও দেখা দিলো। তিনি একসময় বলতে শুরু করলেন–ঘোমটা পরা একটা ভূত তাঁকে বিরক্ত করে। রাতে বাবা যখন ঘুমুতে যান তখন সে আসে। খুব সাবধানে মশারি তুলে বাবার দিকে তাকিয়ে থাকে। বাবা চিৎকার করে উঠলে মিলিয়ে যায়। শেষের দিকে এমন হলো যে বাবা একা ঘুমুতে পারতেন না, আমাকে তার সঙ্গে ঘুমুতে হতো। এই হলো ঘোমটা ভূতের গল্প।
এই ভূতটাকে শুধু আপনার বাবাই দেখেছেন?
না। আরও অনেকে দেখেছে। এ বাড়িতে যারা কিছুদিন থাকে তারাই বেশি করে দেখেছ। স্বাতীও না-কি দেখেছে।
আপনি ভূত-প্রেত এসব বিশ্বাস করেন না?
দেখি নি তো, এজন্য বিশ্বাস করি না। দেখলে হয়তো করব।
স্বাতীর সঙ্গে আপনার পরিচয় হলো কীভাবে?
স্বাতী হোমাকে বলে নি?
জি না।
ওকে জিজ্ঞেস করলে ও তোমাকে সুন্দর করে বলবে। অবশ্যি সুন্দর করে বলার কিছু নেই আমার মেয়ের মাধ্যমে ওর সঙ্গে পরিচয়।
আপনাদের বিয়ে কবে হচ্ছে?
সামনের সপ্তাহে–বুধবার।
ও আচ্ছা।
তোয়ালে দিয়ে মাথা মুছতে মুছতে স্বাতী বের হয়ে বলল, দারুণ খিদে লেগেছে, এসো খেতে বসি। লিলি, তুই হাত-মুখ ধুবি?
লিলি বলল, না।
স্বাতীর চুল ভেজা। শাড়ি অগোছালোভাবে পরা। সে খালি পায়ে দাঁড়িয়ে আছে। তাকে কী সুন্দর বউ-বউ লাগছে! এই নির্জন ছায়া ছায়া বাড়িটায় তাকে সুন্দর মানিয়ে গেছে।
তোর খুব ক্ষিধে লেগেছে, তাই না?
হ্যাঁ। কিন্তু আমি কিছু খাব না। আমি চলে যাব।
এই না বললি—থাকবি।
এখন আর থাকতে ইচ্ছা করছে না।
আর পাঁচটা মিনিট থেকে খেয়ে গেলে এমন কী মহাভারত অশুদ্ধ হয়?
মহাভারত অশুদ্ধ হয় না। মহাভারত ঠিকই থাকে কিন্তু আমি এখন চলে যাব।
যা, চলে যা। রাগ করেছিস?
কথা বাড়াবার দরকার নেই–তুই চলে যা। তুমি ওকে রিকশায় তুলে দিয়ে এসো।
লিলি দরজার দিকে রওনা হলো।
ভদ্রলোক লিলির সঙ্গে সঙ্গে আসছেন। রিকশা চলছে। রাস্তা খানা-খন্দে ভরা। খুব ঝাঁকুনি হচ্ছে। লিলির মনে হচ্ছে থেকে গেলেই হতো। স্বাতী খুব মন খারাপ করেছে। তা ছাড়া বাসায় ফিরতেও তার ইচ্ছে করছে না। তাদের বাড়িটা কুৎসিত ধরনের বাড়ি। এই বাড়িতে বারবার ফিরে যেতে ইচ্ছা করে না। লিলির মনে হচ্ছে তার নিজেরও জ্বর আসছে। স্বাতীর জ্বরটাই চলে এসেছে তার গায়ে।
স্বাতীর ঘরের দরজা জানালা বন্ধ
স্বাতীর ঘরের দরজা জানালা বন্ধ। পর্দা টানানো। ঘর অন্ধকার, যে সন্ধ্যার পর বাতি জ্বালায় নি। নাজমুল সাহেব ব্যাপারটা লক্ষ করলেন। তিনি স্বাতীর ঘরের বান্দারার সামনে দিয়ে কয়েকবার হাঁটাহাঁটি করলেন। একবার ডাকলেন, স্বাতী কী করছিস মা?
স্বাতী জবাব দিল না। নাজমুল সাহেব জবাবে জবাবের জন্য কান পেতে ছিলেন। তিনি শুনলেন ভেতরে মিউজিক হচ্ছে। ট্রাম্পেট। স্বাতীর প্রিয় বাজনা। ট্রাম্পেট আনন্দময় সঙ্গীত। মার্শাল মিউজিক, যে মিউজিক উৎসবের কথা মনে করিয়ে দেয়। দরজা জানালা বন্ধ করে, বাতি নিভিয়ে আনন্দময় বাজনা শুনতে হবে কেন? নাজমুল সাহেব চিন্তিত মুখে একতলায় নামলেন।
রওশন আরা রান্নাঘরে। তিনি বই দেখে একটা চাইনিজ স্যুপ তৈরি করছেন। তী বিকেলে বলেছে তার শরীর ভালো লাগছে না, রাতে কিছু খাবে না। দুপুরেও ভালোমতো খায় নি। ভাত নাড়াচাড়া করে উঠে পড়েছে। নাজমুল সাহেবকে রান্নাঘরে দেখে তিনি চোখ তুলে তাকালেন। ব্লেন্ডারে হাড় ছড়ানো মুরগির মাংস দেয়া হয়েছে। ব্লেন্ড করতে হবে। কড়াইয়ে সয়া সস মেশানো সবজি ফুটছে। ব্লেড করা মাংস কড়াইয়ে ছেড়ে দিতে হবে। তাঁর হাতে সময় নেই। তিনি বিরক্ত চোখে স্বামীর দিকে তাকালেন।
