তোমার কি জ্বর নাকি?
বুঝতে পারছি না স্যার। রোল থার্টি টুকে বললাম দেখে দিতে। ও দেখল না।
স্বাতী করুণ ভঙ্গি করে কথা শেষ করল। সবাই আবারও হেসে উঠল। জহিরুল হক স্যারের মুখ রাগে ছাই বর্ণ হয়ে গেল। তিনি অনুভব করলেন কন্ট্রোল এই মুহূর্তে তার হাতে নেই, পরিস্থিতি দ্রুত সামলে নিতে না পারলে ভবিষ্যতে এই মেয়ে ক্লাসে অনেক যন্ত্রণা করবে। তিনি লিলির দিকে তাকিয়ে কঠিন গলায় বললেন–এই মেয়ে, দেখো, তোমার বান্ধবীর জ্বর দেখো। কপালে হাত দিয়ে দেখো ভালো মতো।
লিলি দারুণ অস্বস্তি নিয়ে স্বাতীর কপালে হাত দিল।
কি, জ্বর আছে?
জি স্যার।
বেশি না কম?
মোটামুটি।
জ্বর নিয়ে ক্লাস করতে হবে না। যাও, চলে যাও।
ক্লাস থেকে স্বাতী বই-খাত গুটিয়ে হাতে নিল। সে বেশ হাসিমুখে বের হচ্ছে। জহিরুল হক স্যার লিলির দিকে তাকিয়ে বললেন, তুমি দাঁড়িয়ে আছ কেন? তুমিও যাও। অসুস্থ বান্ধবীকে একা ছেড়ে দেবে, তা কি করে হয়।
স্বাতীর পেছনে লিলিকেও বের হতে হলো। স্বাতীর উপর রাগে লিলির গা জ্বলে যাচ্ছে। কী ভয়ানক অস্বস্তির মধ্যে স্বাতী তাকে ফেলে দিল। ওর সঙ্গে চলাফেরা করা মুশকিল হয়ে উঠছে।
স্বাতী বলল, যাক, অল্পের ওপর দিয়ে পার পাওয়া গেল। এখন কী করা যায়। বল দেখি? সামথিং হ্যাজ টু বি ডান। কিছু-একটা তো করা দরকার।
লিলি জবাব দিল না। তাদের পরের ক্লাস বিকাল তিনটায়। মাঝখানের আড়ই ঘণ্টা কিছুই করার নেই। স্বাতী বলল, আমার সঙ্গে চল এক জায়গায়।
আমি তোর সঙ্গে কোথাও যাব না।”
দারুণ একটা জায়গায় নিয়ে যাব।
বেহেশতে নিয়ে গেলেও যাব না।
এই আড়াই ঘণ্টা করবি কী?
যা-ই করি, তোর সঙ্গে যাব না।
আমি জ্বরে মরে যাচ্ছি আর তুই আমাকে পরিত্যাগ করছিস। এটা কি ঠিক হচ্ছে? আমার যে জ্বর সেটা তো মিথ্যা না।
জ্বর নিয়ে ঘোরাঘুরিরই-বা দরকার কী? বাসায় চলে যা।
স্বাতী নিশ্বাস ফেলে বলল, বাসাতেই যাব। জ্বর মনে হয় আরও বাড়বে। ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা লাগছে। তুই আমাকে বাসা পর্যন্ত এগিয়ে দে। না-কি তাও করবি না? বাসায় গিয়ে দুটো পারাসিটামল খেয়ে শুয়ে থাকব। তুই মার সঙ্গে গল্প করবি। ঘণ্টাখানেক রেস্ট নেয়ার পর আমার যদি শরীরটা ভালো লাগে তাহলে লাস্ট ক্লাসটা করব। কি, রাজি?
লিলি রাজি হলো। রিকশায় বসে হুড তুলতে তুলতে স্বাতী বলল, পথে আমি এক জায়গায় জাস্ট এক মিনিটের জন্য থামব। একজনের সঙ্গে দেখা করে দুটো কথা বলেই চলে আসব। তুই আমার সঙ্গে যেতে না চাইলে রিকশায় বসে থাকিস।
রিকশায় বসে থাকার ব্যাপারটা হচ্ছে কথার কথা। লিলি খুব ভালো করেই জানে তাকেও নামতে হবে। স্বাতীর হাত থেকে মুক্তি পাওয়া কঠিন ব্যাপার। তার মনে যা আসে তা করবেই। লিলির ক্ষীণ সন্দেহ হচ্ছে–আজকের পুরো ব্যাপারটাই স্বাতীর সাজানো। হয়তো সে এক সপ্তাহ আগেই ঠিক করেছে–আজ জহিরুল হক স্যারের ক্লাসে একটা নাটক করে লিলিকে নিয়ে বের হয়ে আসবে…হয়তো…
স্বাতী বলল, এ রকম মুখ ভোঁতা করে বসে আছিস কেন?
ভালো লাগছে না।
পৃথিবীতে কোন বাক্যটি সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় জানিস লিলি? সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত বাক্য হচ্ছে–ভালো লাগছে না। ভালো লাগছে এ-রকম কথা আমরা প্রায় বলিই না।
ভালো লাগার মতো কিছু ঘটে না, তাই বলি না।
ভালো লাগার মতো অনেক কিছুই ঘটে। তারপরও আমরা বলি না এই যে আজ জহিরুল হক স্যারকে কোণঠাসা করে ফেললাম—তোর খুব ভালো লাগছিল কিন্তু তুই কি বলেছিস ভালো লাগছে?
লিলি চুপ করে রইল। স্বাতী উৎসাহের সঙ্গে বলল, আজ তিনটার ক্লাসটা যে আমরা করব না এটা ভেবেও তোর ভালো লাগছে। কিন্তু মুখ ফুটে তুই তা বলবি না।
তিনটার ক্লাস করছি না?
না?
তুই না করলে না করবি। মরে গেলেও আমি ক্লাস মিস দেব না।
স্বাতী হাসিমুখে বলল, তোর সঙ্গে এক শ টাকা বাজি, তুই আজকের ক্লাস মিস করবি। আমি তোকে আটকে রাখব না বা কিছু করব না। তুই নিজ থেকেই বলবি–আজকের ক্লাস করব না। রাজি?
আমি তোর কথাবার্তা কিছু বুঝতে পারছি না।
বুঝতে পারছিস না কেন? আমি কখনও জটিল কথা বলি না। সহজ কথা বলি। যারা মানুষ হিসেবে খুব জটিল তারা খুব সহজ জীবনযাপন করে, খুব সহজ কথা বলে। আমি খুব জটিল মেয়ে, এজন্যই আমার জীবনযাত্রা সহজ।
লিলি বলল, তোর ধারণা তুই জটিল মেয়ে, আসলে জটিল না। তুই সহজ ধরনের মেয়ে।
তোকে যে বাসায় নিয়ে যাচ্ছি সে-বাসায় পা দেয়া মাত্র তুই বুঝবি, আমি জটিল মেয়ে। সে-বাসায় একজন ভদ্রলোক থাকেন। বুড়ো বুড়ো টাইপের একটা লোক। বেঁটে-খাটো গাট্টাগোট্টা ধরনের। যার কোনো ফিক্সড ইনকাম নেই–দিনে-আনি দিনে-খাই টাইপ মানুষ। বিপত্নীক। একটা মেয়ে আছে যে ক্লাস ফোর কিংবা ফাইভে পড়ে। মেয়ে অবশ্যি বাবার সঙ্গে থাকে না, নানার বাড়িতে থাকে। মাঝেমধ্যে বাবার কাছে আসে।
লিলি বিরক্ত গলায় বলল, ঐ ভদ্রলোকের বাসায় তুই আমাকে নিয়ে যাবি এবং সেই কারণেই তুই জটিল মেয়ে?
না, আমি জটিল মেয়ে, কারণ ঐ ভদ্রলোককে আমি বিয়ে করতে যাচ্ছি। মোটেই ঠাট্টা করছি না। সত্যি কথা বলছি। ক্রশ মাই হার্ট।
লিলি তাকিয়ে রইল। স্বাতী যে সত্যি কথা বলছে এটা সে ধরতে পারছে। স্বাতী ঠোঁট সরু করে কাম সেপ্টেম্বরের মিউজিক আনার চেষ্টা করছে। আসছে না। সে শিস বন্ধ করে গম্ভীর গলায় বলল–বিয়ে কোথায় হবে, কিভাবে হবে সেটা উনি ঠিক করবেন। আজ আমাকে তা জানানোর কথা। দুপুরে ওখানে আমার খাওয়ার। দাওয়াত। তুই ইচ্ছা করলে আমার সঙ্গে থাকতে পারিস, ইচ্ছা করলে আমাকে নামিয়ে দিয়ে তিনটার ক্লাস করতে পারিস।
