বাবা বলেছে।
কখন বলল?
পরশুদিন রাতে।
কথাটা কীভাবে বলল?
বাবা বলল, তোর স্বাতী আন্টি মেয়েটা কেমনরে? আমি বললাম, খুউল ভালো। তখন বাবা বলল, এই মেয়েটাকে আমাদের বাসায় রেখে দিলে কেমন হয়? আমি বললাম, খুব ভালো হয়। কীভাবে রাখবে? বাবা বলল, একদিন যখন বাসায় আসবে তখন দরজা-জানালা বন্ধ করে তাকে আটকে ফেলব আর যে দেব না। তখন আমি বুঝলাম বাবা তোমাকে বিয়ে করবে। বিয়ের কথা বলতে লজ্জা লাগছে তো এইজন্য ঘুরিয়ে বলছে। আমার বুদ্ধি বেশি তো এজন্য ধরে ফেলেছি।
বুদ্ধিমান কন্যা, এই নিন আপনার চা।
থ্যাংক য়্যু আন্টি।
আর এই নিন আপনার উপহার।
স্বাতী তার কাঁধে ঝুলানো ব্যাগ থেকে গল্পের বই বের করল। একটা না কয়েকটা। জাহিনের চোখ চকচক করছে। মনে হচ্ছে সে কেঁদে ফেলবে। স্বাতী বলল, উপহার আরও আছে, এক প্যাকেট চকলেট আছে। এই চকলেটের নাম কি জানিস?
না।
এর নাম সুইস গোল্ডবার আমার খুব প্রিয় চকলেট।
এখন তুই বই নিয়ে পড়তে বোস। এক পাতা পড়বি, চকলেটে একটা কামড় দিবি।
তুমি কি বাবার সঙ্গে গল্প করবে?
হ্যাঁ।
আজ তোমাকে দেখতে এত খারাপ লাগছে কেন?
আজ আমার মনটা খারাপ। মন ভালো করার জন্য তোদের কাছে এসেছি।
মন ভালো হয়েছে?
এখনও হয় নি।
বাবার কাছে গেলে মন আরও খারাপ হবে।
কেন?
বাবা খুব রেগে আছে। তার ছবি ভালো হচ্ছে না–এজন্য রেগে আছে। আমার সঙ্গেও গম্ভীর হয়ে কথা বলেছে।
সেটা অবশ্যি একদিক দিয়ে ভালো। দুজুন মন খারাপ লোক পাশাপাশি থাকলে মন খারাপ ব্যাপারটা চলে যায়।
.
স্বাতী দুকাপ চা নিয়ে স্টুডিওতে ঢুকল। স্টুডিও অন্ধকার। জানালা বন্ধ। ঘরে কোনো আলো নেই। ঘরের ভেতরে সিগারেটের ধোঁয়া। কুয়াশার মতো জমে আছে। স্বাতী বলল, তুমি কোথায়?
কোনো জবাব পাওয়া গেল না। স্বাতী বলল, চা এনেছি।
ঘরের এক কোনা থেকে ক্লান্ত গলায় হাসনাত কথা বলল, এদিকে এসো।
হাসনাত শুয়ে আছে ক্যাম্পখাটে। এই গরমেও তা্র গায়ে চাদর। স্বাতী বলল, তোমার কী হয়েছে?
প্রচণ্ড মন খারাপ।
কেন?”
তিন মাস ধরে একটা কাজ করলাম। দিনরাত কাজ করেছি। কাজটা নষ্ট হয়ে গছে।
নষ্ট হলো কীভাবে?
কাজে প্রাণ প্রতিষ্ঠা হয় নি। ছবি আঁকা হয়েছে। ছবিতে প্রাণ নেই।
প্রাণ নেই কেন?”
সেটা জানি না। জানতে পারলে তো কাজই হতো। তুমি দূরে দাঁড়িয়ে আছ। কেন? কাছে এসো।
স্বাতী ক্ষীণস্বরে বলল, আজ আমার জন্মদিন।
আমার কাছ থেকে কী উপহার চাও?
এখনও বুঝতে পারছি না। সুন্দর একটা ছবি এঁকে দিতে পারো, যে ছবিতে প্রাণ আছে।
প্রাণের ব্যাপারটা বাইরে থেকে আসে। আমি ইচ্ছা করলেই প্রাণ দিতে পারি না। তুমি কাছে আসছ না কেন? তোমার ভেতর কি এখনও কোনো দ্বিধা আছে?
স্বাতী চায়ের কাপ নামিয়ে রাখল। ছোট্ট নিশ্বাস ফেলে সে এগুচ্ছে। ভয়ঙ্কর একটা অন্যায় করতে যাচ্ছে। তার পেছনে ফেরার পথ নেই।
স্বাতী ফিসফিস করে বলল
স্বাতী ফিসফিস করে বলল, এই, গায়ে হাত দিয়ে দেখ তো আমার জ্বর কি-না। স্বাতীর যত উদ্ভট কথা। জহিরুল হক স্যারের ক্লাস চলছে। মাছিদের যেমন এক লক্ষ চোখ, স্যারেরও তেমনি। স্যারের মনে হয় দুলক্ষ চোখ। কোথায় কি হচ্ছে সবই তিনি দেখেন। শুধু দেখেই ক্ষান্ত হন না, ক্যাট ক্যাট করে কথা বলেন। লিলি জ্বর দেখতে যাবে আর স্যার দারুণ অপমানসূচক কোনো কথা বলবেন না, তা কখনও হবে না। গত সপ্তাহে, দুলালী তার ক্লাসে হাই তুলছিল। তিনি দুলালীর দিকে তাকিয়ে বললেন–এই মেয়ে, হাই তোলার সময় মুখের সামনে বই-খাতা কিছু ধরবে। তুমি যে রকম বড় করে হাই তোলো মুখের ভেতর দিয়ে একেবারে পাকস্থলী পর্যন্ত দেখা যায়।
ক্লাসের সব ছেলেমেয়ে হো হো করে হেসে উঠল। হাসিতে ব্যাপারটার ইতি হলে কথা ছিল–ইতি হয় নি। কয়েকটা ছেলে দুলালীকে মিস পাকস্থলী ডাকা শুরু করেছে। যতবার ডাকছে ততবারই দুলালীর চোখে পানি চলে যাচ্ছে। কাজেই ছেলেরা এই ডাক সহজে ছাড়বে না। ইউনিভার্সিটিতে দুলালীকে আরও তিন বছর থাকতে হবে। এই তিন বছরে তার মিস পাকস্থলী স্থায়ী হয়ে যাবার সম্ভাবনা। কী ভয়াবহ সম্ভাবনা!
স্বাতী আবারও বলল, এই লিলি, দেখ, আমার জ্বর আসছে কি না।
লিলি ফিসফিস করে বলল, এখন পারবনুর। ক্লাস শেষ হোক। তখন দেখব।
স্বাতী বলল, ক্লাস শেষ হতে হতে আমার জ্বর কমে যেতে পারে, এখনি দেখ। নাও অর নেভার।
আর তখনই জহিরুল হক স্যার পড়া বন্ধ করে গম্ভীর গলায় বললেন–এই টু উইম্যান, দুজনই উঠে দাঁড়াও।
লিলির বুক ধড়ফড় করছে। স্যার কী বলেন কে জানে। ছাত্ররা সবাই খুব আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছে। স্যারের কাউকে দাঁড় করানো মানে মজাদার কিছু সময়। বিড়াল যেমন ইঁদুর মারার আগে ইঁদুর নিয়ে কিছুক্ষণ খেলা করে, তিনিও করেন। সেই খেলা দেখতে ভালো লাগে। লিলির চোখ-মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেলেও স্বাতী বেশ স্বাভাবিক। সে দাঁড়িয়েছে হাসি হাসি মুখে।
স্যার বললেন, তোমরা কী নিয়ে গল্প করছিলে?
লিলির দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করা হলেও জবাব দিল স্বাতী। সহজ স্বাভাবিক গলায় বলল, স্যার, আমরা গল্প করছিলাম না। আমি লিলিকে বলছিলাম আমার গায়ে হাত দিয়ে দেখতো জ্বর আসছে কি-না। ও রাজি হচ্ছিল না।
ও-টা কে?
ও হচ্ছে লিলি, রোল থার্টি টু।
সবাই হেসে উঠল। জহিরুল হক স্যারের মুখ আরও গম্ভীর হয়ে গেল। যে রসিকতা তার করার কথা সেই রসিকতা অন্য একজন করছে, এটা হজম করা তাঁর পক্ষে মুশকিল।
