মেয়েটা বলল, আমাদের বাড়ি।
নাম্বার কত বাড়ির?
আমি তো জানি না নাম্বার কত।
জানো না কেন? তোমার এখন কঠিন শাস্তি হবে। আমি হচ্ছি বাড়ির ইন্সপেকটর।
আমি যে মজা করছি মেয়েটা চট করে বুঝে ফেলল। সে হাসিমুখে বলল, ভেতরে আসুন, আন্টি।
বাড়ি খুঁজতে খুঁজতে আমার তখন পানির পিপাসা পেয়ে গিয়েছিল। কোনো বড়িতে ঢুকে এক গ্লাস ঠাণ্ডা পানি খেতে পারলে ভালোই হয়। আমি বললাম, তোমাদের বাড়িতে কি ফ্রিজ আছে।
আছে।
সেই ফ্রিজে পানির বোতল আছে?
হ্যাঁ।
সেই পানির বোতলে পানি আছে?”
হ্যাঁ।
তাহলে পানি খাওয়ার জন্য যাওয়া যায়। তোমাদের বাড়িতে তুমি ছাড়া আর কে আছে।
বাবা আছে।
মা কোথায় গেল?
মা মারা গেছেন। আমার জন্মের সময় মারা গেছেন।
আমি একটু হকচকিয়ে গেলাম। মনটা খারাপ হয়ে গেল। কী ফুটফুটে একটা মেয়ে! মায়ের আদর কী জানে না। আমি বললাম, তাহলে এই সুন্দরবৗণ্ডিটাতে শুধু তুমি আর তোমার বাবা থাকো?
বুয়া ছিল। গত বুধবার বুয়া করেছে কি, বাবার মানিব্যআির আমার পানির বোতলটা নিয়ে পালিয়ে গেছে।
বলো কি! এখন রান্না করছে কে?
বাবা আর আমি আমরা দুজনে মিলে রান্না করছি।
সেটা তো ভালোই।
আসুন আন্টি। ভেতরে আসুন।
তোমার বাবা আবার রাগ করবেন নাতো?
বাবা রাগ করবে না। বাবা ছবি আঁকছে। বাবা কিছু বুঝতেই পারবে না।
আমি বাড়িতে ঢুকলাম। পানি খেলাম। জাহিন আমাকে তার বাবার স্টুডিওতে নিয়ে গেল। ভদ্রলোক ছবি আঁকছিলেন। কি ছবি জান মা, বিরাট সর্ষে ক্ষেতের মাঝখানে বাচ্চা একটা মেয়ে। পুরো হলুদ হয়ে আছে। সেই হলুদ মাঠে লাল ডুরে শাড়ি পরা বাচ্চা মেয়েটা কে জানো? উনার মেয়ে জাহিন। কী সুন্দর করে যে উনি ছবিটা এঁকেছেন!
তুই পছন্দ করেছিস বিপত্নীক একটা মানুষ?
হ্যাঁ।
স্বাতীর মা এই পর্যায়ে বিছানা থেকে উঠে বসবেন। হতভম্ব হয়ে মুখের দিকে তাকিয়ে থাকবেন। স্বাতী বলবে–তুমি এ-রকম করে তাকিয়ে আছ কেন? বিপত্নীক মানুষকে পছন্দ করা যাবে না। বাংলাদেশের সংবিধানে এমন নিয়ম নেই।
স্বাতীর মা থমথমে গলায় বলবেন, তুই ঐ মানুষটাকে বিয়ে করবি?
হুঁ।
মা চোখে পলক না ফেলে তাকিয়ে থাকবেন। তখন স্বাতী নিচু গলায় বলবে, বিয়ে না করে আমার উপায় নেই মা। আমি ভয়ানক একটা অন্যায় করে ফেলেছি।
লিলি আসে নি। কাজেই স্বাতীর পরিকল্পনা এলোমেলো হয়ে গেল। মেজাজও খারাপ হতে লাগল। সারাদিন মানুষ আসছে–ফুপা, ফুপু, মামারা। ফুল আসছে। টেলিফোন আসছে এবং সবাইকে নাজমুল সাহেব সন্ধ্যার পর আসতে বলেছেন। হোটেল সোনারগাঁওয়ে কেকের অর্ডার দেয়া হয়েছে। সন্ধ্যাবেলা কেক কাটা হবে। সন্ধ্যার আগে আগে স্বাতী বলল–মা আমি একটু ঘুরে আসি?
রওশন আরা অবাক হয়ে বললেন, এখন কোথায় যাবি? সন্ধ্যাবেলা সবাই আসবে।
সন্ধ্যার আগে আগে চলে আসব মা।
তাহলে গাড়ি নিয়ে যা।
গাড়ি লাগবে না।
.
কলিং বেলে হাত রাখার আগেই জাহিনের তীব্র ও তীক্ষ্ণ গলা শোনা গেল–আন্টি আন্টি আন্টি।
স্বাতী বলল, চেঁচাবি না। চেঁচিয়ে মাথা ধরিয়ে ফেলেছিস। বাবা আছে?
হুঁ।
কী করছে?
ছবি আঁকছে।
কীসের ছবি?
একটা বুড়ো লোকের ছবি।
ছবি আঁকার জিনিস পাচ্ছে না, বুড়ো লোকের ছবি আঁকতে হবে?
বুড়ো লোকটা ছাতা মাথায় বৃষ্টির মধ্যে হাঁটছে।
সুন্দর একটা মেয়ের ছবি আঁকবে যে বৃষ্টির ভেতর হাঁটবে—তা না…
আন্টি, আজ তুমি কিন্তু আমার সঙ্গে গল্প করবে। বাবার সঙ্গে না। এর আগের দুবার যে এসেছিলে আমার সঙ্গে কোন গল্প কর নি।
তোর সঙ্গে কী গল্প করব? তুইতো কোনো গল্পই জানিস না।
জাহিনের একটু মন খারাপ হলো, কারণ সে আসলেই কোনো গল্প জানে না। স্বাতী বলল, যারা দিনরাত গল্পের বই পড়ে তারা কোনো গল্প বলতে পারে না। যারা খুব জমিয়ে গল্প করে খোঁজ নিয়ে দেখবি তারা কোনো গল্পই জানে না।
আন্টি, তুমি কি আমার জন্য কিছু এনেছ?
হুঁ
কী এনেছ?
এখন বলব না। এখন আমি চা খাব।
আমিও তোমার সঙ্গে চা খাব।
ভেরি গুড। চল রান্নাঘরে যাই।
আন্টি, তুমি কি গান জানো?”
গান জানি না। নাচ জানি।
নাচ জানো? সত্যি?
সত্যি। ছোটবেলায় আমার নাম কি ছিল জানিস? লিটল ড্যান্সার। ছোট নর্তকী।”
সবাই তোমাকে ছোট নর্তকী ডাকত?
সবাই ডাকত না। শুধু বাবা ডাকত–এখনও ডাকে।
স্কুলে আমাকে কি ডাকে জানো?
না।
স্কুলে আমাকে ডাকে চার চোখ। চশমা পরি তো এইজন্য চার চোখ। স্কুলে আমাদের আরেকটা মেয়ে আছে তার নাম কাঁচা মরিচ। স্কুলে তোমাকে কী ডাকত আন্টি।
স্কুলে আমার নাম ছিল মিস গুণ্ডি। সবার সঙ্গে গুণ্ডামি করতাম এজন্য মিস গুণ্ডি নাম। শোন জাহিন, তোর সঙ্গে বকবক করে আমার মাথা ধরে গেছে। তুই আর কোনো কথা বলতে পারবি না। আমি চা বানাব তুই চুপচাপ পাশে দাঁড়িয়ে থাকবি।
ইশারায় কি কথা বলতে পারব?
হ্যাঁ, ইশারায় বলতে পারবি।
স্বাতী চা বানাচ্ছে। তিন কাপ চা হচ্ছে। তার জন্য, জাহিনের জন্য এবং জাহিনের বাবার জন্য। জাহিন বেচারি আসলেই চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। একবার শুধু ইশারায় বলেছে তাকে চিনি বেশি দিতে হবে। স্বাতীর মায়া লাগছে, সে বলল, আচ্ছা বল, তোকে আর তিন মিনিট কথা বলার সুযোগ দেয়া গেল।
জাহিন সঙ্গে সঙ্গে বলল, আন্টি, তোমার সঙ্গে কি বাবার বিয়ে হচ্ছে?
স্বাতী থতমত খেয়ে গেলেও সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, হুঁ। তুই বুঝলি কী করে?
