ইরতাজুদ্দিন খেতে বসেও খেতে পারছেন না। তিনি দুপুরে খাননি। প্রচণ্ড খিদে থাকা সত্ত্বেও তিনি প্লেট সরিয়ে উঠে পড়লেন। অথচ শাহানা শান্ত ভঙ্গিতে খেয়ে যাচ্ছে। যেন কিছুই হয়নি।
ইরাতাজুদ্দিন পুষ্পকে আনতে লোক পাঠিয়ে ঢুকলেন নীতুর ঘরে। নীতু শুয়ে শুয়ে বই পড়ছিল, সে উঠে বসল। দাদাজানের দিকে তাকিয়ে হাসল। ইরতাজুদ্দিন বসলেন তার পাশে।
কি বই পড়ছিস?
ভূতের বই দাদাজান। নিশিরাতের আতংক।
খুব ভয়ের?
খুব ভয়ের না, মোটামুটি ভয়ের?
ইরতাজুদ্দিন ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, পুষ্পকে আনতে লোক। পাঠিয়েছি।
থ্যাংক য়্যু দাদাজান।
ও এলে কি করতে হবে–তোর সামনে ক্ষমা চাইতে হবে?
আমার সামনে না চাইলেও হবে।
ইরতাজুদ্দিন পকেট থেকে সিগারেট বের করলেন। তিনি সিগারেট খান না। বললেই হয়। হঠাৎ হঠাৎ সিগারেট ধরান।
নীতু!
জ্বি।
পুষ্প মেয়েটা রাতে কোথায় ঘুমায়? তোর সাথে, না নিচে তার নিজের মাদুরের বিছানায়?
ও নিচে ঘুমায়।
ইরতাজুদ্দিন সিগারেটে লম্বা টান দিয়ে বললেন—মেয়েটা তোর হাত ধরে হাঁটছিল বলে আমি রাগ করেছিলাম। তোর কাছে মনে হল কাজটা খুব অন্যায় হয়ে গেছে। মানুষে মানুষে আমি প্রভেদ করে ফেলেছি। সেই প্রভেদটা তো তোর মধ্যেও আছে। তুই তো মেয়েটাকে পাশে নিয়ে ঘুমুচ্ছিস না? ওকে ঘুমুতে হচ্ছে মেঝেতে।
নীতু তাকিয়ে আছে। কিছু বলছে না।
ইরতাজুদ্দিন বললেন–যে ত্রুটি নিজের মধ্যে আছে সেই ত্রুটির জন্যে অন্যের উপর কি রাগ করা যায়?
নীতু বলল, না।
আমরা মুখে বলি–সব মানুষ সমান। মনে কিন্তু বিশ্বাস করি না। শুধুমাত্র মহাপুরুষরাই এই কাজটা পারেন। মনে যা বিশ্বাস করেন মুখে তাই বলেন। মহাপুরুষ চেষ্টা করে হওয়া যায় না। মহাপুরুষের বীজ ভেতরে থাকতে হয়। তোর ভেতর এই জিনিশটা নেই।
নীতু চুপ করে রইল। ইরতাজুদ্দিন বললেন–তোর ভেতর না থাকলেও শাহানার ভেতর এটা আছে।
কি করে বুঝলেন আপার আছে?
বোঝা যায়।
নীতু নিচু গলায় বলল–দাদাজান, আপনি ঠিকই ধরেছেন। আপার মধ্যে এটা আছে। আমাদের বাসায় কাজের মেয়েদের যখন অসুখ হয় তখন ভাত মেখে আপা তাদের মুখে তুলে খাওয়ায়। দেখেই আমার যেন কেমন কেমন লাগে। আমি এই কাজটা কখনো করতে পারব না।
ইরতাজুদ্দিন বললেন, আয়, খেতে আয়। নীতু সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়াল। ইরতাজুদ্দিন বললেন, আমি যদি ভাত মেখে তোর মুখে তুলে দেই তাহলে কি তোর কেমন কেমন লাগবে?
নীতু বলল, লাগবে।
খাবার টেবিলে ইরতাজুদ্দিন নীতুকে নিয়ে বসেছেন। নতুন করে মাছ ভাজা হচ্ছে। গরম গরম ভেজে পাতে তুলে দেবে। নীতু প্লেটে ভাত নিয়ে লজ্জিত ভঙ্গিতে অপেক্ষা করছে। ইরতাজুদ্দিন বললেন, কাল ভোরে মজার একটা ব্যাপার হবে। ভাবছিলাম তোদের বলব না, অবাক করে দেব। বলেই ফেলি–মিতু আসবে। সম্ভবত মোহসিনও আসবে।
বলেন কি?
শাহানাকে কিছু বলার দরকার নেই। ওকে চমকে দেব।
আপাকে চমকে দেবার জন্যেই কি এটা করেছেন?
না। আমি কাজটা করেছি নিজের স্বার্থে। ওরা এলে তোরা হয়ত আরো কয়েকদিন বেশি থাকবি। বাড়িটা গমগম করবে। মানুষ খুব স্বার্থপর প্রাণী, তারা নিজের স্বার্থটা দেখে।
প্রকাণ্ড এক টুকরা ভাজা মাছ চলে এসেছে। ভাজা মাছের গন্ধে বাড়ি ম-ম করছে। নীতুর জিবে পানি চলে এসেছে। এরকম তার আগে কখনো হয়নি। ইরতাজুদ্দিন হাসিমুখে নীতুর খাওয়া দেখছেন।
নীতুর অনেকদিন পর আজ প্রথমৃশ–তার দাদাজান মানুষটাকে যতটা খারাপ ভাবা গেছে তত খারাপ না।
দাদাজান!
হুঁ।
আপনি কি কোন ভয়ংকর ভূতের গল্প জানেন?
জানি। শুনবি?
হ্যাঁ শুনব।
খাওয়া শেষ করে আয় আমার ঘরে।
পুষ্প যদি আসে তাকে কি সঙ্গে করে নিয়ে আসব?
নিয়ে আসিস।
পুষ্প এল না। আসবে কি করে? তার বাড়িতে আনন্দের সীমা নেই। বাপজান এসেছে এতদিন পর। বাপের সঙ্গে এসেছে সুরুজ ভাই। ভাবভঙ্গি থেকে মনে হচ্ছে, সুরুজ ভাইয়ের সঙ্গে কুসুম বুর বিয়ে হবে। বাপজান আর মার মধ্যে ফিসফাস কথা হচ্ছেই। নিন্দালিশের বড় খালা এসেছেন। ফিসফাসের সঙ্গে তিনিও যুক্ত হয়েছেন। কুসুম বু সেজেগুজে ঘুরঘুর করছে। রোজ রাতে নারকেল তেল দিয়ে তার চুল বেঁধে দেয়া হচ্ছে। নিন্দালিশের বড় খালা নীলরঙা একটা শাড়ি এনেছেন। সেই শাড়ি পরার পর কুসুমবুকে আর পৃথিবীর মেয়ে বলে মনে হয় না। মনে হয় সে আকাশের মেয়ে–এক্ষুণি উড়ে আকাশে গিয়ে মিশে যাবে। এত মজা ছেড়ে রাজবাড়িতে আসার তার ইচ্ছে হচ্ছে না। ইরতাজুদ্দিন সাহেবের সামনে পড়তেও তার ভয় লাগছে। রাজবাড়ি থেকে দূরে থাকাই ভাল।
নীতুর দাদাজানের খাটটা ফুটবল খেলার মাঠের মত বিশাল। নীতু সেই বিশাল খাটের মাঝামাঝি বসে আছে। তার সামনে বালিশে হেলান দিয়ে ইরতাজুদ্দিন ভূতের গল্প শুরু করলেন—
আমি তখন যুবক মানুষ। এলএলবি পাশ করেছি। ময়মনসিংহ কোটে এসেছি–হাবভাব বুঝব। বিলেতে গিয়ে ব্যারিস্টারী পড়ার কথা হচ্ছে। আমার বাবা ময়েজউদ্দিন চৌধুরী যেদিন বলবেন বিলেত যা, সেদিনই যাব। তার কথার উপর কথা বলার সাহস কারোর নেই। তিনি বলেছেন, কিছুদিন কোটে ঘোরাফিরা কর। তাই করছি। ময়মনসিংহে বিরাট একটা বাড়ি ভাড়া করা হয়েছে।একা থাকি। মাঝে মাঝে ময়মনসিংহ কোর্টের পেশকার ফখরুল আমিন সাহেবের বাড়িতে যাই দাবা খেলার জন্যে। আমার তখন দাবা খেলার খুব নেশা…
নীতু বলল, দাদাজান, এটা কি ভূতের গল্প।
