মায়া-মুহব্বত বেশি থাকনই ভাল।
মনোয়ারা প্রায় অস্পষ্ট গলায় বললেন–দেখি যদি আল্লাহ পাকের ইচ্ছা হয়…
তিনি কথা শেষ করলেন না। ব্যাপার এখনই বলা ঠিক হবে না। মেয়ের মেজাজের ঠিক নেই। ফট করে উল্টে যেতে পারে। কি দরকার ঝামেলা বাড়ানোর। ভালয় ভালয় মেয়ে পার করতে পারলে আল্লাহর দরবারে হাজার শুকরিয়া।
কুসুম বলল, কথা তো মা শেষ করলা না।
তোর বাপজানের ইচ্ছা তোর সাথে বিবাহ দেয়।
ও আইচ্ছা।
আমরার ইচ্ছা-অনিচ্ছায় কিছুই হইব না। সবই আল্লাহপাকের উপরে। কার সাথে কার বিবাহ হইব এইটা আল্লার ঘরে সোনার কলম দিয়া লেখা থাকে। মানুষের করনের কিছু নাই–তবু একটা চেষ্টা।
কুসুম হাসছে। মনোয়ারার মনে হল সে খুশি হয়েই হাসছে। হাসলে এত সুন্দর লাগে তার মেয়েটাকে!
বিয়া কবে হইতাছে মা?
শ্রাবণ মাস বিয়ার জন্য ভাল–দেখি কি হয়। এক কথায় তো আর বিয়া হয়। জোগাড়যন্ত্র আছে।
জোগাড়যন্ত্রের কি আছে, মৌলবী ডাইক্যা আন–কবুল কবুল কবুল। বিয়া শেষ।
মনোয়ারা শংকিত চোখে মেয়েকে দেখছেন। মেয়ের কথাবার্তা সাধারণ মানুষের মত মনে হচ্ছে না, কথাবার্তা-হাবভাবে জ্বীনের ইশারা আছে। বিয়ে যত তাড়াতাড়ি হয় ততই ভাল।
মার পীড়াপীড়িতেই কুসুমকে তেল দিয়ে চুল বাঁধতে হল। দুই বেনীতে কুসুমকে ভাল লাগে। দুই বেনী করা হয়েছে। এক রঙের দুটা ফিতা থাকলে সুন্দর হত। দুই রঙের দুটা ফিতা। একটা লাল একটা সবুজ। তাতেও কুসুমকে সুন্দর লাগছে। চোখে কাজল দিয়েছে গাঢ় করে। কুসুমের সুন্দর চোখ আরো সুন্দর লাগছে। বাপের এবারে আনা এক রঙের সবুজ শাড়ি খুব ফুটেছে। কুসুম যেন ঝলমল করছে।
মোবারক ফিরেছেন শুনে মতি এসেছে দেখা করতে। ঘরের উঠানে কুসুমের সঙ্গে দেখা। মতি হকচকিয়ে গেল। ঝাটা হাতে উঠান ঝাট দিচ্ছে ফুটফুটে এক পরী। মতি কিছু বলার আগেই কুসুম বলল, আমরার গাতক ভাইয়েরাই ভাল?
হা শইল ভাল। এমন সাজ কেন কুসুম?
কুসুম হাসিমুখে বলল, বিয়ার কন্যা, না সাজলে কর?
বিয়ার কন্যা?
কুসুমের হাসি আরো বিস্তৃত হল। মাথার বেনী দুলিয়ে বলল, আফনে ভাবছিলেন কি জন্মে আমার বিবাহ হইব না? আমি কানাও না, লেংড়াও না। আমার চেহারা ছবি ভাল। এই দেহেন কত লম্বা চুল। আমার বিয়া হইব না ক্যান?
কি কও তুমি, বিয়া তো হইবই। বিয়া না হওনের কি আছে?
সবের তো হয় না। আল্লার ঘরে সোনার কলম দিয়া লেখা না থাকলে বিয়া হয় না।
পাত্র কে?
পাত্রের নাম ক্যামনে কই, পাপ হইব না? দিনে দুপুরে আসমানে যে জিনিশ থাকে সেই জিনিশের নামে তার নাম।
সুরুজ?
এই তো পারছেন। লোকে আফনেরে বোকা কয় এইটা ঠিক না। আফনের বুদ্ধি আছে। অল্পবিস্তর হইলেও আছে।
কুসুম গভীর দুঃখের সঙ্গে লক্ষ্য করল, বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে এই খবরে মতি মোটেই বিচলিত হচ্ছে না। বরং তাকে দেখে মনে হচ্ছে সে খুশি হয়েছে। বেশ খুশি।
মতি আগ্রহের সঙ্গে বলল, বিয়ার তারিখ হইছে?
না হয় নাই, তয় শ্রাবণ মাসেই হইব। শ্রাবণ মাস বিয়াশাদীর জন্য ভাল।
তোমার বিয়ার দিন বড় কইরা একটা গানের আসর করব কুসুম।
কইরেন।
ধুম বাদ্য-বাজনা হইব।
আমার শুননের উপায় নাই। আমি হইলাম বিয়ার কইন্যা।
মোবারক চাচা কই?
জানি না কই। পাড়া ঘুরতে গেছে।
উনারে বলবা খুঁজ নিতে আসছিলাম।
বলব, অবশ্যই বলব।
তোমার বিবাহ, এইটা শুইন্যা মনে বড় আনন্দ হইতাছে কুসুম। বড় আনন্দ!
আমারো আনন্দ হইতাছে। বাপ-মার গলার মধ্যে কই মাছের কাঁটা হইয়া বিন্দা ছিলাম। কাটা হওনের দুঃখু আছে। আছে না?
অবশ্যই আছে। অবশ্যই আছে। তোমারে আইজ বড়ই সৌন্দর্য লাগতাছে কুসুম। বড়ই সৌন্দর্য।
সৌন্দর্য মাইনষের চউক্ষে। যার চউখ সুন্দর তার সব সুন্দর। আফনের চউখ সুন্দর।
মতি কুসুমের বাড়ি থেকে বিষণ্ণ মুখে ফিরল। কুসুমের বিয়ে শ্রাবণ মাসে ঠিক হয়ে গেলে সমস্যা আছে। হাত একেবারে খালি। গানের আসর করার কথা দিয়ে ফেলেছে। আসরটা সে করবে কি ভাবে?
ইরতাজুদ্দিন খেতে বসেছেন
রাত নটা। ইরতাজুদ্দিন খেতে বসেছেন। তাঁর সামনে শাহানা বসেছে। সহজ ভঙ্গিতেই বসেছে। সে তার দাদাজানের দিকে প্লেট এগিয়ে দিল। ইরতাজুদ্দিন গম্ভীর গলায় বললেন, নীতু খাবে না?
শাহানা বলল, না।
সে কাল রাতে খায়নি। আজ সারাদিনেও না। শাহানাকে তা নিয়ে মোটেও। বিচলিত মনে হচ্ছে না। ইরতাজুদ্দিনের বিস্ময়ের সীমা রইল না। মেয়ে দুটি আশ্চর্য স্বভাবের।
ইরতাজুদ্দিন বললেন, তুই ওকে সাধাসাধি করিসনি?
করলে লাভ হবে না। কঠিন মেয়ে।
না খেয়ে কদিন থাকবে?
আরো তিনদিন।
এতো মারা পড়বে।
শাহানা শান্ত গলায় বলল, না, মারা পড়বে না। পানি খাচ্ছে, চা খাচ্ছে। চায়ে চিনি আছে–শর্করা। ক্যালোরি খানিকটা চিনি থেকে পাবে।
তোর কাছ থেকে ডাক্তারিবিদ্যা শুনতে চাচ্ছি?
কি শুনতে চাচ্ছেন তা তো জানি না দাদাজান।
কিছুই শুনতে চাচ্ছি না। আমি ওর মুখ হা করে ধরব–তুই দুধ ঢেলে দিবি।
শাহানা সহজ গলায় বলল, সেটা ঠিক হবে না দাদাজান। শ্বাসনালীতে দুধ চলে যেতে পারে। ফোর্স ফিডিং যদি করাতেই হয় টিউব দিয়ে করাতে হবে।
তোর কি মোটেই দুঃশ্চিন্তা লাগছে না?
দুঃশ্চিন্তা করার এখনো কিছু হয়নি।
বাড়িতেও কি সে এ রকম করে?
না, হাঙ্গার স্ট্রাইক এই প্রথম করল।
ইরতাজুদ্দিন কঠিন গলায় বললেন, তোদের খুব বেশি হয়ে গেছে। এত তেজ হবার কারণটা কি?
কারণটা জেনেটিক। বংশসূত্রে পাওয়া।
