না, ঠিক ভূতের গল্প না। এটা শুনে, তারপর ভূতের গল্প বলব। একদিন আমিন সাহেবের বাড়িতে দাবা খেলতে গেছি–গিয়ে শুনি উনি কি কাজে বিক্রমপুর গেছেন। তার বড় মেয়ে পর্দার আড়াল থেকে বলল, আপনি বসুন, চা খেয়ে যান। আমি বসলাম। মেয়েটা চা এনে দিল। নিজেই এনে দিল।
উনিই কি আমার দাদীজান?
ইরতাজুদ্দিন ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, হ্যাঁ।
তারপর?
মেয়েটাকে বিয়ে করলাম। বাবা খুব বিরক্ত হলেন। সামান্য পেশকারের মেয়েকে তাঁর ছেলে বিয়ে করবে এটা তিনি কিছুতেই মেনে নিতে পারলেন না। আমি আমার স্ত্রীকে নিয়ে বাড়িতে উঠলাম। বাবা মূল বাড়ির থেকে দূরে–এখানে যে কাঁঠালগাছটা আছে সেখানে ঘর বানিয়ে দিলেন। জোহরার থাকার জায়গা হল ঐ ঘরে।
উনার নাম জোহরা?
হুঁ।
আপনিও ঐ ঘরে থাকতে?
না। বাবা আমাকে বিলেত পাঠিয়ে দিলেন। ও একাই থাকত। বিলেত থাকার সময়ই খবর পাই ছেলে হতে গিয়ে ও মারা গেছে। ডাক্তার ছিল না, ওষুধপত্র ছিল না। অনাদর অবহেলায় তোর বাবার জন্ম হয়। তোর বাবা কি কখনো এইসব নিয়ে তোদের সঙ্গে গল্প করেছে?
না, তবে বাবা বলেছেন তিনি মানুষ হয়েছেন তার বড় মামা-মামীর কাছে।
এই বাড়িটা ছিল তোর বাবার কাছে এক দুঃস্বপ্নের বাড়ি। এখনো তাই আছে। সে কখনো আসে না–তার মেয়েদেরও আসতে দেয় না। এই বাড়িটা তার কাছে বন্দিশিবির।
আসলেই তো বন্দিশিবির।
বুবলি রে নীতু, এই বন্দিশিবিরে আমি সারা জীবন একা একা কাটিয়েছি। আমি কিন্তু দ্বিতীয়বার বিয়ে করিনি। ইচ্ছা করলেই বিয়ে করতে পারত ইচ্ছে হয়নি। এই ব্যাপারটা তোর বাবার চোখে পড়ল না। তোর বাবার শুধু চোখে পড়ল–আমার কারণে তার মা বন্দি হলেন রাজবাড়িতে। আমার কারণে তাঁর মৃত্যু হল।
আমার দাদীজান কি সত্যি সত্যি এই রাজবাড়িতে বন্দি হয়ে ছিলেন?
হ্যাঁ। আমার বাবা তাকে ঐ ঘর থেকে বের হতে দিতেন না। জোহরার মা বাবাভাই-বোন কারো সঙ্গে তাকে দেখা করতেও দেননি। বিলেত থাকার সময় আমি যেসব চিঠিপত্র তাকে লিখেছি সেসবও তাকে দেয়া হয়নি। তার কোন চিঠিও আমার কাছে পাঠানো হয়নি।
উনি কি খুব সুন্দরী ছিলেন দাদাজান?
হ্যাঁ।
উনার কোন ছবি আছে?
একটা আছে। দেখবি?
হ্যাঁ দেখব।
ইরতাজুদ্দিন খাট থেকে নামলেন। চাবি দিয়ে আলমারি খুলে ছবি বের করে। নীতুর হাতে দিলেন। কালো মেহগনি কাঠের ফ্রেমে বাধা ছবি। নীতু ছবি হাতে নিয়ে হতভম্ব গলায় বলল, এ তো অবিকল আপার ছবি!
ইরতাজুদ্দিন ক্লান্ত গলায় বললেন, হ্যাঁ, শাহানার সঙ্গে ওর সাংঘাতিক মিল।
ছবিটা আপনি সরিয়ে রাখেননি কেন দাদাজান? লুকিয়ে রেখেছেন কেন?
ইরতাজুদ্দিন জবাব দিলেন না। নীতু বলল, দাদীজানের কথা আরো বলুন, আমার খুব শুনতে ইচ্ছে করছে। উনি কি খুব হাসিখুশি মহিলা ছিলেন?
না। চুপচাপ থাকত। তবে ভয়ঙ্কর জেদ ছিল। যা বলবে তাই।
আমার মত?
হুঁ। খানিকটা তোর মত; যা নীতু, ঘুমুতে যা–রাত অনেক হয়েছে।
নীতু বলল, আজ আমি আপনার সঙ্গে ঘুমুব দাদাজান। যদি আপনার কোন আপত্তি না থাকে।
ইরতাজুদ্দিনের পাশে নীতু শুয়ে আছে। এক সময় তার মনে হল তার দাদাজান কাঁদছেন। নীতু ভয়ে ভয়ে একটা হাত তার দাদাজানের গায়ের উপর রাখল। ইরতাজুদ্দিন কাঁদছেন। তার শরীর কাপছে, সেই সঙ্গে কাঁপছে নীতুর ছোট্ট হাত।
যে হাত একজন নিঃসঙ্গ মানুষের প্রতি মমতায় আর্দ্র।
সুরুজ আলি অনেক রাতে খেতে বসেছে
সুরুজ আলি অনেক রাতে খেতে বসেছে। অন্দরবাড়িতেই তাকে খেতে দেয়া হয়। আজ বাংলাঘরে খাচ্ছে। পুষ্প ভাত-তরকারি এগিয়ে দিচ্ছে। দরজার বাইরে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছে কুসুম।
মনোয়ারার ব্যথা ওঠেছে। ব্যথায় কাটা মুরগির মত ছটফট করছেন। মনোয়ারার বড় বোন আনোয়ারা বোনের পাশে আছেন। আজ তার চলে যাবার কথা ছিল। মনোয়ারার ব্যথা ওঠার কারণে যেতে পারছেন না। আনোয়ারা এসেছিলেন কুসুমের বিয়ের ব্যাপারটা ফয়সালা করতে। তিনি মোটামুটিভাবে করেছেন। ছেলে তার খুব পছন্দ হয়েছে। তিনি কুসুমকে বলেছেন–অনাথ ছেলে হলেও সে যে উঁচু বংশের তা বোঝা যায়। কারণ ভাত খাওয়ার সময় এই ছেলে ছোট ছোট ভাতের নলা করে মুখে দেয়। ভাতের নলা যার যত ছোট তার বংশ তত উঁচু।
কুসুম তার উত্তরে বলেছে, তাহলে তো খালাজান মুরগির বংশ সবচাইতে উঁচা।
মুরগি একটা একটা কইরা ভাত খায়।
কুসুমের কথায় তিনি খুবই বিরক্ত হয়েছেন। তার ধারণা হয়েছিল, কুসুম বোধূয় এই বিয়েটা চাচ্ছে না। তিনি কুসুমকে আড়ালে ডেকে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করে নিশ্চিন্ত হলেন যে, কুসুমের কোন আপত্তি নেই। ছেলে কুসুমেরও পছন্দ।
তিনি কুসুমকে আশ্বস্ত করে বলেছেন–ছেলে কাজকাম করে না এইটা নিয়া তুই চিন্তা করিস না। রুটি-রুজির মালিক মানুষ না, আল্লাহপাক। আর পুরুষ মাইনষের ভাগ্য থাকে ইস্তিরির শাড়ির অঞ্চলে বান্দা।
আমার শাড়ির অঞ্চলে তো খালাজান কিছুই নাই।
আছে কি নাই এইটা তোর জানার কথা না। জাঞ্জেল্লাহপাক। আর আমরা তো আছি। বানে ভাইস্যা যাই নাই।
কুসুমের আত্মীয়স্বজনদের মধ্যে তার খালুজনই অবস্থাসম্পন্ন। কুসুমের বিয়ের খরচপাতির বেশিরভাগই তিনি করবেন কাজে তার কথাবার্তা গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হয়।
আড়াল থেকে কুসুম মানুষটার খাওয়া দেখছে। ভিতরবাড়িতে সে সামনে যায় কিন্তু বাংলাঘরে পুরুষের সামনে যাওয়া যায় না। সুম মনে মনে হাসছে। খালা এই মানুষটাকে যত বড় ঘরের মনে করছেন সে তত বড় ঘরের না। এই তো বিরাট বিরাট নলা করে মুখে দিচ্ছে। খিদে মনে হয় খুব লেগেছে। খাওয়া দিতে অনেক দেরি হল।
